রাজনীতি

পাবনায় গুলি ছোড়া যুবক জামায়াত কর্মী, পাল্টাপাল্টি মামলায় গ্রেপ্তার ৫

Advertisement

পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলায় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের সময় প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে নিয়ে গুলি ছোড়া যুবকটি জামায়াতের কর্মী বলে জানিয়েছে পুলিশ। ঈশ্বরদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আ স ম আব্দুর নূর রবিবার (৩০ নভেম্বর) সন্ধ্যায় এই তথ্য নিশ্চিত করেন। গুলি ছোড়া সেই যুবকের নাম তুষার মন্ডল, যার ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর পুলিশ তাঁর পরিচয় শনাক্ত করেছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দায়ের করা পাল্টাপাল্টি দুটি মামলায় উভয় দলের পাঁচজন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার জেরে ঘটে যাওয়া এই সংঘর্ষের পর ঈশ্বরদী উপজেলার চর গড়গড়ি গ্রামে এখনও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

গুলি ছোড়া যুবকের পরিচয় ও অবস্থান

ঈশ্বরদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আ স ম আব্দুর নূর নিশ্চিত করেছেন যে, সংঘর্ষের দিন প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে গুলি ছোড়া যুবক তুষার মন্ডল জামায়াতে ইসলামীর একজন সক্রিয় কর্মী। তুষার মণ্ডল ঈশ্বরদী পৌরসভার ভেলুপাড়া এলাকার তাহের মণ্ডলের ছেলে। পুলিশ জানিয়েছে, তুষারকে গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান চালানো হচ্ছে, তবে সংঘর্ষের পর থেকেই সে পলাতক রয়েছে।

স্থানীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে, তুষার পাবনা জেলা জামায়াতের আমির এবং পাবনা-৪ আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থী অধ্যাপক আবু তালেব মণ্ডলের ভাতিজা মামুন মণ্ডলের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত। এই তথ্যটি রাজনৈতিক সংঘর্ষে জামায়াত প্রার্থীর ঘনিষ্ঠজনের সম্পৃক্ততাকেই তুলে ধরে। প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন এবং গুলি ছোড়ার ঘটনায় স্থানীয় জনগণের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।

সংঘর্ষের সূত্রপাত ও ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ

গত বৃহস্পতিবার (২৭ নভেম্বর) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে ঈশ্বরদী উপজেলার চর গড়গড়ি গ্রামে জামায়াত প্রার্থীর একটি নির্বাচনী প্রচারণাকে কেন্দ্র করে জামায়াত ও বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। স্থানীয় পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, দুই পক্ষের মধ্যে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়, যা এক পর্যায়ে সহিংস রূপ নেয়।

সংঘর্ষে উভয় পক্ষের কমপক্ষে অর্ধ শতাধিক নেতাকর্মী ও সমর্থক আহত হন। লাঠিসোঁটা, ধারালো অস্ত্র এবং প্রকাশ্যে গুলির ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এই সংঘর্ষটি আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দুই দলের মধ্যে বিদ্যমান তীব্র রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে স্পষ্ট করেছে। ঘটনার পর থেকে এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

পাল্টাপাল্টি মামলা ও আসামিদের বিবরণ

সংঘর্ষের ঘটনায় উভয় পক্ষই পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে পাল্টাপাল্টি দুটি মামলা দায়ের করেছে।

১. বিএনপির মামলা: সাহাপুর ইউনিয়ন কৃষকদলের আহ্বায়ক মক্কেল মৃধার ছেলে ও ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক বাঁধন হাসান আলিম বাদী হয়ে ঈশ্বরদী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। এই মামলায় ৩২ জন জামায়াত নেতার নাম উল্লেখ করা হয় এবং ১৫০ থেকে ২০০ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। এই মামলার প্রধান আসামি করা হয়েছে পাবনা জেলা জামায়াতের আমির এবং পাবনা-৪ আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থী আবু তালেব মণ্ডলকে

২. জামায়াতের মামলা: অপরদিকে, ঈশ্বরদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি সাইদুল ইসলাম বাদী হয়ে একই থানায় পাল্টা মামলা দায়ের করেন। এই মামলায় ৩৮ জন বিএনপির নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ করা হয় এবং ১০০ থেকে ১৫০ জন অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। মামলার প্রধান আসামি করা হয়েছে সাহাপুর ইউনিয়ন কৃষকদলের আহ্বায়ক মক্কেল মৃধাকে। জামায়াতের অভিযোগ, এই মামলায় যাদের আসামি করা হয়েছে, তাদের বেশিরভাগই পাবনা-৪ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও জেলা বিএনপি’র আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান হাবিবের আত্মীয় এবং অনুসারী।

পুলিশের অবস্থান ও গ্রেপ্তার অভিযান

ওসি আ স ম আব্দুর নূর জানান, দুই পক্ষই পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে মামলা করেছে এবং পুলিশ উভয় পক্ষের মামলার বিষয়ে তদন্ত করছে। পুলিশ আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুযায়ী আসামিদের গ্রেপ্তার করছে। শনিবার (২৯ নভেম্বর) রাতে অভিযান চালিয়ে জামায়াতের দু’জন এবং বিএনপি’র তিনজন কর্মীকে আটক করা হয়। রবিবার (৩০ নভেম্বর) বিকেলে আদালতের মাধ্যমে তাঁদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

ওসি আরও বলেন, ‘পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলাকায় পুলিশি টহল জোরদার করা হয়েছে।’ গ্রেপ্তার এড়াতে বিএনপি ও জামায়াতের অনেক নেতাকর্মী এলাকা থেকে পালিয়ে গেছেন। এই ধরনের সহিংসতা রোধে পুলিশ এলাকায় কড়া নজরদারি অব্যাহত রেখেছে।

রাজনৈতিক সংঘাত ও নির্বাচনকেন্দ্রিক উত্তেজনা

পাবনা-৪ আসনটি দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক সংঘাতের জন্য পরিচিত। এই সংঘর্ষটি ইঙ্গিত দেয় যে, স্থানীয় পর্যায়ে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যেকার সম্পর্কের টানাপোড়েন কতটা তীব্র। যদিও এই দুই দল বৃহত্তর পরিসরে সরকার বিরোধী আন্দোলনে মিত্র ছিল, স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হওয়ার পর তাদের মধ্যেকার বিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, নির্বাচনের আগে এই ধরনের সহিংসতা স্থানীয় রাজনীতিতে আরও অস্থিরতা বাড়াতে পারে এবং সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত তাদের কর্মীদের সহিংসতা থেকে বিরত রাখা এবং আইনি প্রক্রিয়ায় বিশ্বাস রাখা। এই ঘটনা দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

আইনের শাসনের প্রয়োজনীয়তা

ঈশ্বরদীর চর গড়গড়ি গ্রামের ঘটনাটি কেবল একটি রাজনৈতিক সংঘর্ষ নয়, এটি একটি গুরুতর আইনি ও সামাজিক সমস্যা। প্রকাশ্যে গুলি ছোড়ার ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার এবং রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে শক্তি প্রয়োগের প্রবণতা এখনও বিদ্যমান। পুলিশ গুলি ছোড়া যুবক তুষার মন্ডলকে দ্রুত গ্রেপ্তার করতে না পারায় জনগণের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। দুই দলের প্রধান প্রার্থীদের আত্মীয় এবং অনুসারীদের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি মামলায় নাম আসার ঘটনা প্রমাণ করে যে, এই সংঘর্ষটি ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের লড়াই। এই ধরনের সহিংসতা বন্ধ করতে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে তুষার মন্ডলসহ সকল অভিযুক্তকে দ্রুত আইনের আওতায় আনা জরুরি।

এম আর এম – ২৪৩১,Signalbd.com

মন্তব্য করুন
Advertisement

Related Articles

Back to top button