বিশ্ব

সীমান্তে পচছে ভারতের পেঁয়াজ, বিক্রি হচ্ছে ২ রুপি কেজি দরে

Advertisement

বাংলাদেশ পেঁয়াজ আমদানি কমিয়ে দেওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন ভারতীয় পেঁয়াজ চাষি ও রপ্তানিকারকরা। পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলায় বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রায় ৩০ হাজার টন পেঁয়াজ পচে যাওয়ার পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ এখন লোকসানের ভয়ে ব্যবসায়ীরা পানির দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। সরেজমিনে দেখা গেছে, মালদহের মাহাদিপুর-সোনামসজিদ সীমান্ত ক্রসিং এলাকায় প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ২ রুপিতে (বাংলাদেশি মুদ্রায় ২ টাকা ৭৩ পয়সা), যেখানে স্থানীয় বাজারে পেঁয়াজের দাম ২০ থেকে ২২ রুপি। পেঁয়াজ রপ্তানি নিয়ে ভারতের হঠকারী সিদ্ধান্ত এবং বাংলাদেশের আমদানি স্থগিতাদেশের কারণেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বাণিজ্য বিশ্লেষকরা। এই ঘটনা দু’দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কে একটি নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে।

সীমান্ত এলাকায় পেঁয়াজ পচার করুণ চিত্র

বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মালদহ জেলার মাহাদিপুর-সোনামসজিদ সীমান্ত এলাকায় হাজার হাজার টন পেঁয়াজ এখন বিক্রির অভাবে পচে নষ্ট হচ্ছে। এই পেঁয়াজগুলো মূলত ইন্দোর এবং নাসিক (ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যের দুই জেলা) থেকে বাংলাদেশে রপ্তানির জন্য আনা হয়েছিল।

রপ্তানি বন্ধ থাকায় এই পেঁয়াজগুলো খোলা আকাশের নিচে বা গুদামে পড়ে আছে এবং পচন শুরু হয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বাধ্য হয়ে বিপুল ক্ষতির মুখে এগুলো বিক্রি করে দিচ্ছেন। ৫০ কেজির এক-একটি বস্তা বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১০০ রুপিতে (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৩৬ টাকা)। এই পরিস্থিতি মালদহের পেঁয়াজ ব্যবসায়ীদের জন্য ‘অকল্পনীয় লোকসান’ নিয়ে এসেছে। এই দৃশ্য শুধু ব্যবসায়ীদের জন্য নয়, স্থানীয় বাজারের অর্থনীতির জন্যও হতাশাজনক।

বাংলাদেশের আমদানি স্থগিতাদেশ এবং ব্যবসায়ীদের অভিযোগ

ভারতের পেঁয়াজ রপ্তানিকারকরা অভিযোগ করেছেন, বাংলাদেশের আমদানিকারক ব্যবসায়ীদের মৌখিক প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে তারা বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ মজুত করেছিলেন। কিন্তু এখন বাংলাদেশি আমদানিকারকরা সেই পেঁয়াজ নিচ্ছেন না।

মালদহের পেঁয়াজ ব্যবসায়ী এবং রপ্তানিকারক সিরাজুল শেখ বলেছেন, ‘বছরের এই সময়ে সাধারণত বাংলাদেশে পেঁয়াজের চাহিদা বেশি থাকে। এই দিক আমলে নিয়ে আমরা ৫০ থেকে ৭০ ট্রাক পেঁয়াজ মজুত করেছি। কিন্তু এখন সেগুলো পচছে এবং ২, ৬, ৮ অথবা ১০ রুপিতে স্থানীয় বাজারে প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছি।’ পশ্চিমবঙ্গের রপ্তানিকারকদের সংস্থা ওয়েস্ট বেঙ্গল এক্সপোর্টার্স কো-অর্ডিনেশন কমিটির মহাসচিব উজ্জল সাহা জানান, গত ১৬ নভেম্বর বাংলাদেশি আমদানিকারক-ব্যবসায়ীরা একটি নোটিশ জারি করে জানিয়েছেন যে, বাংলাদেশের কৃষি মন্ত্রণালয়ের অন্তর্ভুক্ত কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সাময়িকভাবে ভারত থেকে পেঁয়াজ রপ্তানিতে স্থগিতাদেশ দিয়েছে। তারপর থেকেই এই অচলাবস্থা চলছে।

হঠকারী সিদ্ধান্তের পুনরাবৃত্তি ও বাণিজ্যিক ক্ষতি

বাণিজ্য বিশ্লেষকরা মনে করেন, পেঁয়াজ রপ্তানি নিয়ে ভারত বারবার হঠকারী সিদ্ধান্ত নেওয়ায় বাংলাদেশের আমদানিকারকরা আস্থা হারিয়েছেন। অতীতে ভারত কোনো প্রকার পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই পেঁয়াজ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল, যার ফলে বাংলাদেশের বাজার অস্থির হয়ে ওঠে। এই কারণে বাংলাদেশ এখন পেঁয়াজ আমদানির উৎস বৈচিত্র্যময় করার দিকে মনোযোগ দিয়েছে এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।

এবারের স্থগিতাদেশে, ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি নিষিদ্ধ না করলেও বাংলাদেশ আমদানি কমিয়ে বা স্থগিত করে দিয়েছে, যা ভারতীয় ব্যবসায়ীদের জন্য বড় ধাক্কা। আরেক রপ্তানিকারক জাকিরুল ইসলাম বলেন, ‘দুই মাস আগেও যখন আমদানি-রপ্তানি স্বাভাবিক ছিল—সেসময় আমি প্রতিদিন ৩০ থেকে ৩৫ ট্রাক পেঁয়াজ বাংলাদেশে পাঠাতাম। এখন আমার ট্রাকগুলোর পেঁয়াজ পচে যাচ্ছে।’ এই ঘটনা দু’দেশের সীমান্ত বাণিজ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

সীমান্ত বাণিজ্য ও স্থানীয় অর্থনীতির চিত্র

পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলায় অবস্থিত মাহাদিপুর-সোনামসজিদ সীমান্ত ক্রসিং দিয়ে পেঁয়াজসহ বিভিন্ন পণ্য ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এই অঞ্চলের অর্থনীতি মূলত এই বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল। হিলি সীমান্ত দিয়েও প্রতিদিন প্রচুর পেঁয়াজ বাংলাদেশে আসত। আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই সীমান্ত এলাকার হাজার হাজার ব্যবসায়ী, শ্রমিক এবং পরিবহন খাত এখন সরাসরি ক্ষতির মুখে।

মালদহ জেলার মাহদিপুর সীমান্তের ব্যবসায়ী মোহম্মদ রুবেল হোসেন জানান, ‘বাংলাদেশ থেকে পেঁয়াজ রপ্তানির বরাত পেয়েই আমরা মহারাষ্ট্রের নাসিক থেকে পেঁয়াজ নিয়ে আসি। কিন্তু বন্দরে আসার পরেই হঠাৎ জানতে পারি, বাংলাদেশে আর পেঁয়াজ রপ্তানি করা যাবে না।’ এই পরিস্থিতি স্থানীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং ব্যবসায়িক বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

বাংলাদেশের কৌশলগত পরিবর্তন ও দেশীয় বাজারের স্থিতিশীলতা

ভারতের বাজারে পেঁয়াজের এই করুণ চিত্র তৈরি হলেও, বাংলাদেশের বাজারে এর তেমন কোনো বড় প্রভাব পড়েনি। কারণ, বাংলাদেশ সরকার দেশীয় পেঁয়াজের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি তুরস্ক, মিশর, চীনসহ অন্যান্য দেশ থেকে আমদানি বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে, দেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে।

বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ এই সংকটের মাধ্যমে প্রমাণ করেছে যে তারা এখন পেঁয়াজের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের জন্য কোনো একক দেশের ওপর আর নির্ভরশীল নয়। এটি বাংলাদেশের বাণিজ্যিক কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা এবং অভ্যন্তরীণ বাজারের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।

বাণিজ্য সম্পর্ক ও পারস্পরিক আস্থা

ভারতের পেঁয়াজ ব্যবসায়ীদের এই লোকসান এবং বাংলাদেশে আমদানি কমে যাওয়ার ঘটনাটি দু’দেশের বাণিজ্য সম্পর্কের মধ্যে পারস্পরিক আস্থার প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরে। ভবিষ্যতে এই ধরনের সংকট এড়াতে ভারত সরকারের উচিত পেঁয়াজ রপ্তানির ক্ষেত্রে একটি দীর্ঘমেয়াদী ও নির্ভরযোগ্য নীতি গ্রহণ করা। অন্যদিকে, বাংলাদেশের উচিত হবে এই আমদানি স্থগিতাদেশের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের রপ্তানিকারকদের সাথে আলোচনা করা। দ্রুত সীমান্ত খুলে দেওয়া না হলে, মালদহ ও হিলির ব্যবসায়ীরা আরও বড় ক্ষতির মুখে পড়বেন, এবং এর ফলে সীমান্ত বাণিজ্য আরও সংকুচিত হতে পারে।

এম আর এম – ২৪৩৫,Signalbd.com

মন্তব্য করুন
Advertisement

Related Articles

Back to top button