তারেক রহমানের দেশে ফেরা কোন বাধায় আটকে আছে? রাজনৈতিক, আইনগত ও নিরাপত্তা বাস্তবতার গভীরে অনুসন্ধান
বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রধান আলোচ্য বিষয়— বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফেরা। দলীয় নেতৃত্ব, নির্বাচনী প্রস্তুতি, খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা এবং দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝে তার ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কিন্তু তিনি নিজে দেশে ফিরতে পারছেন না— অথবা ফিরতে চাইলেও সিদ্ধান্তটি এককভাবে তার হাতে নেই— এমন একটি ইঙ্গিত তিনি নিজেই সম্প্রতি প্রকাশ করেছেন।
২০২৫ সালের ২৯ নভেম্বর নিজের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে দেওয়া পোস্টে তারেক রহমান লেখেন,
‘আমি এই কঠিন সময়ে আমার অসুস্থ মায়ের পাশে থাকতে চাই। কিন্তু দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত পুরোপুরি আমার হাতে নেই।’
তার এই বক্তব্যের পর থেকেই রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা। প্রশ্ন উঠছে— এমন কোন বাধা বা পরিস্থিতি রয়েছে যে দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতারাও তা প্রকাশ্যে বলতে চান না?
এই প্রতিবেদনে সেই সম্ভাব্য বাধাগুলো বিশ্লেষণ করা হলো বিভিন্ন রাজনৈতিক সূত্র, দলীয় বক্তব্য ও বিশেষজ্ঞ মতামতের ভিত্তিতে।
তারেক রহমানের বক্তব্যে ‘বাধা’ কোনটি — রহস্য কি আরও গভীরে?
তারেকের ফেসবুক পোস্ট প্রকাশের পর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন, এই বাধার অর্থ কী?
উত্তরে তিনি বলেন,
‘এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। তিনি (তারেক) নিজেই লিখেছেন। এর পর আমার কিছু বলার নেই।’
ফখরুলের বক্তব্যে বোঝা যায়— বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল, যার প্রকাশ্য ব্যাখ্যা দল দিতে চাইছে না।
অন্যদিকে আন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, তারেক রহমান দেশে ফিরতে চাইলে সরকারের কোনো আপত্তি নেই।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম তার ফেসবুক পোস্টে স্পষ্ট করে লিখেছেন,
‘সরকারের পক্ষ থেকে তারেক রহমানের দেশে ফেরায় কোনো বাধা নেই।’
তাহলে বাধা কোথায়?
বিএনপি নেতাদের গোপন উদ্বেগ: নিরাপত্তা ঝুঁকি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও অনিশ্চয়তা
বিএনপির কয়েকজন শীর্ষ নেতা নাম প্রকাশ না করে বলেছেন,
তারেক রহমানের দেশে ফেরা এখন শুধু ব্যক্তিগত ইচ্ছার বিষয় নয়—
এটি সম্পর্কিত নিরাপত্তা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতি–র সঙ্গে।
একজন স্থায়ী কমিটির সদস্য বলেন,
‘এখন দেশে বিভিন্ন উগ্রবাদী গোষ্ঠী মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। বিভিন্ন মব ভায়োলেন্সও দেখা যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অবস্থাও খুব স্থিতিশীল নয়। এসব পরিস্থিতিতে তাকে দেশে আনা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।’
আরেকজন বলেন,
‘তারেক রহমানকে কেন্দ্র করে কোনো অঘটন ঘটলে বাংলাদেশের রাজনীতির বড় ক্ষতি হবে। বিএনপির ভবিষ্যৎ নেতৃত্বে তাকেই সবাই ভরসা করে। তাই হিসাব–নিকাশ ছাড়া শুধুই আবেগ দিয়ে সিদ্ধান্ত নিলে বিপর্যয় ঘটতে পারে।’
সেলিমা রহমান বলেন,
‘তার বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন— নানা ধরনের বাধা সামনে আছে। সবকিছু খোলাসা করা সম্ভব নয়।’
আইনগত প্রেক্ষাপট: সব মামলা থেকে অব্যাহতি, তবু কেন শঙ্কা?
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর তারেক রহমানের বিরুদ্ধে থাকা সব মামলা আইনগতভাবে নিষ্পত্তি হয়। ফলে তার দেশে ফেরার পথে আইনগত কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।
এমনকি তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানও একবার দেশে এসেছিলেন।
তবুও বিএনপি ও তারেক রহমানের পক্ষ থেকে দেশে ফেরার কোনো নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা হয়নি।
এর প্রধান কারণ— রাজনৈতিক পরিবেশের অনিশ্চয়তা।
নির্বাচন সামনে: বগুড়া–৬ এ মনোনয়ন পেয়েছেন তারেক
অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বিএনপি ইতিমধ্যেই বেশ কিছু আসনে প্রার্থী ঘোষণা করেছে।
বগুড়া–৬ আসনে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন তারেক রহমান।
এই আসনটি ঐতিহ্যগতভাবে তার রাজনৈতিক ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ফলে নির্বাচনের আগে দেশে ফেরার জোরালো প্রত্যাশা ছিল।
তবে এখন বিএনপির অনেকেই বলছেন, তিনি প্রার্থী হবেন কি না— সেটিও নির্ভর করছে চলমান পরিস্থিতির ওপর।
নিরাপত্তা ইস্যু: বুলেটপ্রুফ গাড়ি ও অস্ত্র লাইসেন্সের আবেদন
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে জানা গেছে—
খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দুটি বুলেটপ্রুফ গাড়ি কেনা হচ্ছে,
এবং অস্ত্রের লাইসেন্সের জন্য আবেদন করা হয়েছে।
এসব ইঙ্গিত দেয়—
বিএনপি শীর্ষ নেতৃত্ব নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন: বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত নয়, রয়েছে আঞ্চলিক–বৈশ্বিক হিসাবও
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন,
‘তারেক রহমানের দেশে ফেরা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক বিষয়। এটি শুধু পরিবারগত সিদ্ধান্ত নয়। দলের কৌশল, দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি, আঞ্চলিক ভূরাজনীতি— সব মিলিয়ে অত্যন্ত সংবেদনশীল সময়।’
তিনি আরও বলেন,
‘বাংলাদেশের মতো দেশে নেতৃত্ব পরিবর্তন বৈশ্বিক শক্তিগুলোর কূটনৈতিক অবস্থানের ওপরও নির্ভর করে। তাই তারেক রহমান এককভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না— এটি স্বাভাবিক।’
তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিয়ে যে তিনটি মূল বাধা সবচেয়ে স্পষ্ট
১. নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার অনিশ্চয়তা
দেশে বিভিন্ন উগ্রবাদী গোষ্ঠীর সক্রিয়তা, মব সহিংসতা বৃদ্ধি, আইনশৃঙ্খলার চ্যালেঞ্জ— এসব কারণে ঝুঁকি রয়েছে।
২. দলীয় কৌশল ও নির্বাচনী অবস্থান
তার উপস্থিতি বিএনপির ভিত্তি মজবুত করবে, তবে কোনো ঝুঁকি হলে দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব সংকটে পড়বে— তাই দল কৌশলী।
৩. আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক সমীকরণ
তার ফেরা বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক, পশ্চিমা দেশের নীতি, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা— এসব দিক থেকে বিবেচিত হচ্ছে।
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা: কেন তার সিদ্ধান্ত এককভাবে নেওয়া যাচ্ছে না?
তারেক রহমান বহু বছর ধরে লন্ডনে অবস্থান করছেন। সেখান থেকেই দল পরিচালনা করছেন। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশে নেতারা মনে করছেন—
একটি ভুল সিদ্ধান্ত বড় ধরনের রাজনৈতিক বিপর্যয় তৈরি করতে পারে।
তাই তারেক রহমান বা বিএনপি কেউই এখনই সুনির্দিষ্ট ঘোষণা দিতে চাইছে না।
তারেক রহমান কি নির্বাচন আগে দেশে ফিরবেন?
এটি এখনো অনিশ্চিত।
তবে দলীয় সূত্র বলছে—
তিনি ফিরবেন কি না, কখন ফিরবেন— সব কিছু নির্ভর করবে:
- রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা
- নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়া
- আন্তর্জাতিক মহলের অবস্থান
- নির্বাচনের পরিবেশ
- দলের অভ্যন্তরীণ কৌশল
তারেক রহমানের দেশে ফেরা — মানবিক, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক তিন স্তরের সমীকরণ
তারেক রহমানের দেশে ফেরা দেশের রাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মুহূর্ত। ব্যক্তিগতভাবে তিনি তার মায়ের পাশে থাকতে চান। রাজনৈতিকভাবে তিনি বিএনপির ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের মূল কেন্দ্রবিন্দু। আবার কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে তার দেশে আসা আঞ্চলিক সমীকরণে প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই বলা যায়—
তার দেশে ফেরা কেবল একটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি জটিল, বহুমাত্রিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া,
যা সময়, পরিস্থিতি এবং নিরাপত্তার ভারসাম্য দেখে নির্ধারিত হবে।
MAH – 14067 I Signalbd.com


