বিশ্ব

গাজায় ত্রাণকর্মীদের ওপর ইসরায়েলি হামলা, ভিডিও প্রকাশ

গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বাহিনীর সাম্প্রতিক হামলায় ১৫ জন মানবিক সহায়তা কর্মীর মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। এই ঘটনায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে জাতিসংঘসহ একাধিক মানবাধিকার সংস্থা। ফিলিস্তিন রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি (পিআরসিএস) সম্প্রতি নিহত এক সাহায্যকর্মীর মোবাইল ফোন থেকে উদ্ধার করা একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে, যা ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর দায় অস্বীকারের বিপরীতে একটি শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবে উঠে এসেছে।

২০২৫ সালের ৫ এপ্রিল প্রকাশিত ভিডিওটি ২৩ মার্চ সংঘটিত সেই মর্মান্তিক ঘটনার বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছে। এতে দেখা যায়, একটি চলন্ত অ্যাম্বুল্যান্স ও ফায়ারট্রাক রাতের অন্ধকারে রাস্তায় চলছে, যার গায়ে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত জরুরি সেবা চিহ্ন ও জ্বলজ্বল করা হেডলাইট রয়েছে। ভিডিওটি মূলত একটি সাহায্যকর্মীর মোবাইল ফোনে ধারণ করা হয়েছিল, যিনি পরবর্তীতে ইসরায়েলি হামলায় প্রাণ হারান।

ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, গাড়িগুলো রাস্তার পাশে একটি স্থানে থামে এবং দুজন ইউনিফর্মধারী ব্যক্তি গাড়ি থেকে নামার কিছুক্ষণের মধ্যেই হঠাৎ প্রবল গুলির শব্দে চারপাশ কেঁপে ওঠে। একজন চিকিৎসকের গলা শোনা যায়, যিনি আতঙ্কের কণ্ঠে বলেন, ‘গাড়ি, গাড়ি’। অপরজন জানান, ‘এটি একটি দুর্ঘটনা মনে হচ্ছে’। এর কয়েক সেকেন্ড পরেই গুলির শব্দে দৃশ্য অন্ধকার হয়ে যায়।

সবচেয়ে হৃদয়বিদারক অংশটি আসে যখন একজন সাহায্যকর্মী মৃত্যুর আশঙ্কায় বারবার শাহাদাহ পাঠ করতে থাকেন:
“আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই, মোহাম্মদ (সা.) তার বার্তাবাহক।”
তাঁর কণ্ঠে স্পষ্ট ভয় ও আতঙ্ক প্রতিফলিত হচ্ছিল। তিনি বলতে থাকেন, “আমাকে ক্ষমা করুন মা, আমি এই পথ বেছে নিয়েছি মানুষকে সাহায্য করার জন্য। হে আল্লাহ, আমার শাহাদাত কবুল করুন।”
ভিডিওর শেষ অংশে তাকে বলতে শোনা যায়, “ইহুদিরা আসছে, ইহুদিরা আসছে।”

এই ফুটেজ প্রকাশের পর জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক একে অত্যন্ত উদ্বেগজনক হিসেবে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, “সম্প্রতি ১৫ জন চিকিৎসা ও মানবিক সহায়তা কর্মীকে হত্যার ঘটনায় আমি আতঙ্কিত। এই হামলাগুলো আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন এবং যুদ্ধাপরাধ হতে পারে।”
তিনি একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানান এবং বলেন, দায়ীদের অবশ্যই বিচারের আওতায় আনতে হবে।

উল্লেখ্য, নিহত ১৫ জনের মধ্যে ৮ জন ছিলেন ফিলিস্তিন রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির কর্মী, ৬ জন গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্য এবং ১ জন ছিলেন জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তু সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএর একজন কর্মী। তাঁদের মরদেহ রাফাহ এলাকায় সমাহিত করা হয়। জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় কার্যালয় (ওসিএইচএ) ওই স্থানটিকে “গণকবর” হিসেবে অভিহিত করেছে।

পিআরসিএস জানায়, তারা নিহত কর্মী রিফাত রাদওয়ানের মোবাইল থেকে ভিডিওটি উদ্ধার করেছে। এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানায়,
“ইসরায়েল দাবি করেছে, তারা একটি সন্দেহজনক যানবাহনে থাকা সন্ত্রাসীদের লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছে। কিন্তু আমাদের প্রকাশিত ভিডিও থেকে স্পষ্টতই বোঝা যায় যে অ্যাম্বুল্যান্সগুলো চিহ্নিত অবস্থায় ছিল, এবং কোনো ধরনের অস্ত্রধারী বা সন্ত্রাসী তৎপরতার প্রমাণ ছিল না। বরং এটি একটি স্পষ্ট মানবিক মিশনে পাঠানো গাড়িবহর ছিল।”

ওসিএইচএর তথ্যমতে, ইসরায়েলি বাহিনী প্রথমে গাজার রাফাহ এলাকায় একটি উদ্ধারকারী দলকে লক্ষ্যবস্তু করে। পরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে আরও কয়েকটি উদ্ধার ও সাহায্য দলকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়, যারা আহত সহকর্মীদের খোঁজে সেখানে গিয়েছিল।

এই ঘটনার পর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো একযোগে ক্ষোভ প্রকাশ করে। বিশেষ করে, যুদ্ধক্ষেত্রে চিকিৎসা ও উদ্ধারকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের একটি মৌলিক নীতি হলেও, ইসরায়েলি বাহিনীর এই হামলা সেই নিয়মের সম্পূর্ণ লঙ্ঘন বলে মনে করছে বিশেষজ্ঞরা।

অন্যদিকে, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর একজন মুখপাত্র বলেছেন, “আমরা কোনো অ্যাম্বুল্যান্সে ইচ্ছাকৃতভাবে গুলি চালাইনি। সন্দেহজনক একটি যানবাহনে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের উপস্থিতির তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয়েছে।”
তবে সমালোচকরা বলছেন, প্রকাশিত ভিডিও, নিহতদের ইউনিফর্ম ও গ্লাভস পরা দেহ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এসব দাবিকে ভিত্তিহীন প্রমাণ করে।

একজন ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তা দাবি করেন, উদ্ধার তৎপরতার জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের ব্যবস্থা না থাকায় মরদেহগুলো বালি ও কাপড়ে ঢেকে রাখা হয়েছিল যাতে ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা করা যায়।

বিষয়টির গুরুত্ব ও ভবিষ্যৎ প্রভাব:

এই হামলার পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে মানবিক সংস্থাগুলোর ভবিষ্যৎ কার্যক্রম, বিশেষ করে যুদ্ধক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা বজায় রেখে কাজ করা কতটা নিরাপদ তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অনেক সাহায্য সংস্থা ইতোমধ্যেই গাজায় তাদের কার্যক্রম সীমিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংগঠন এই ঘটনার তদন্তের পাশাপাশি যুদ্ধাপরাধের সম্ভাব্য মামলা করার কথাও বিবেচনা করছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতে (আইসিসি) মামলা করার আহ্বান জানিয়েছে।

গাজার রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি বলেছে, “এই হামলা কেবল আমাদের সাহায্যকর্মীদের ওপর নয়, এটি মানবতার ওপর হামলা। আমাদের কর্মীরা জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছেন তারা নির্ভীকভাবে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন। আমরা দায়ীদের বিচার দাবি করি।”

এই ঘটনার গভীরতা, এর মানবিক দিক এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের লঙ্ঘনের বহুমাত্রিক দিকসমূহ আগামী দিনে এই সংঘাতের হিসাবনিকাশে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।গাজা, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত, মানবিক সহায়তা, যুদ্ধাপরাধ, জাতিসংঘ

মন্তব্য করুন

Related Articles

Back to top button