বাংলাদেশ তাবলীগ জামাতের নতুন আমির হিসেবে মনোনীত হয়েছেন জ্যেষ্ঠ মুরুব্বি সৈয়দ ওয়াসিফুল ইসলাম। রোববার (৩০ নভেম্বর) ইন্দোনেশিয়ার ইজতেমা চলাকালে তাবলীগ জামাতের বিশ্ব আমির মাওলানা সাদ কান্ধলভী আলমী মাশওয়ারা বা বিশ্ব পরামর্শ সভায় তাঁকে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে নির্বাচন করেন। তাঁর এই মনোনয়নকে ঘিরে তাবলীগের সাথীদের মাঝে আনন্দের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে সৈয়দ ওয়াসিফুল ইসলাম তাবলীগ জামাত বাংলাদেশের আহলে শূরা ও কাকরাইল মসজিদের শীর্ষ মুরুব্বি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। এই নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের তাবলীগ জামাত সাংগঠনিকভাবে নতুন নেতৃত্বের অধীনে এলো।
ইন্দোনেশিয়া ইজতেমা ও আমির নির্বাচন
বাংলাদেশ তাবলীগ জামাতের আমির নির্বাচনের এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়েছে ইন্দোনেশিয়াতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ইজতেমার সমাপনী দিনে। তাবলীগের বিশ্বব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরামর্শ সভা আলমী মাশওয়ারা নামে পরিচিত। এই আলমী মাশওয়ারায় বিশ্ব আমির মাওলানা সাদ কান্ধলভী কয়েকটি দেশের তাবলীগ জামাতের নতুন আমিরদের নাম ঠিক করেন। সেখানেই তিনি বাংলাদেশের আমির হিসেবে সৈয়দ ওয়াসিফুল ইসলামের নাম ঘোষণা করেন।
এই মাশওয়ারায় অংশ নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১ হাজার ৫০০ তাবলীগের বিভিন্ন স্তরের দায়িত্বশীলগণ বর্তমানে ইন্দোনেশিয়ায় উপস্থিত ছিলেন। উল্লেখ্য, বিশ্বব্যাপী এই মাশওয়ারা ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ইজতেমায় আয়োজিত হতো। কিন্তু মাওলানা সাদ কান্ধলভীর বিরোধীতার মুখে তিনি বাংলাদেশে আসতে না পারায়, আলমী মাশওয়ারা এবার ইন্দোনেশিয়া ইজতেমায় অনুষ্ঠিত হলো।
নবনির্বাচিত আমিরের পরিচিতি ও অভিজ্ঞতা
নবনির্বাচিত আমির সৈয়দ ওয়াসিফুল ইসলাম তাবলীগ জামাত বাংলাদেশের অন্যতম জ্যেষ্ঠ ও শীর্ষস্থানীয় মুরুব্বি। তিনি দীর্ঘকাল ধরে এই ধর্মীয় আন্দোলনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তিনি ১৯৯৯ সাল থেকে তাবলীগ জামাত বাংলাদেশের আহলে শূরা (পরামর্শদাতা পরিষদ) ও কাকরাইল মসজিদের শীর্ষ মুরুব্বি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।
ওয়াসিফুল ইসলাম দেশ-বিদেশে একজন বিশ্ব নন্দিত দাঈ (ইসলামের দাওয়াতদাতা) হিসেবে সর্বমহলে ব্যাপক পরিচিত। তিনি তাবলীগের কাজে বিশ্বের শতাধিক দেশ সফর করেছেন। তাঁর গভীর ধর্মীয় জ্ঞান, দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং সাংগঠনিক প্রজ্ঞা তাঁকে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন করেছে। তাঁর এই মনোনয়ন তাবলীগ জামাতের কর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা ও ঐক্য সৃষ্টিতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
শূরা সদস্যদের নতুন সংযোজন ও সাংগঠনিক কাঠামো
নতুন আমির নির্বাচনের পাশাপাশি, মাওলানা সাদ কান্ধলভীর আলমী মাশওয়ারায় সাংগঠনিক কাঠামোতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন করা হয়েছে। আমিরকে সহযোগিতার জন্য কাকরাইলের মাওলানা মনির বিন ইউসুফ সাহেব ও হাফেজ ওজিউল্লাহকে শূরা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এছাড়াও, বাংলাদেশের শুরা হযরত প্রফেসর ইউনুস সিকদার নবনির্বাচিত আমিরের অধীনে শুরা হিসেবে তাঁর দায়িত্বে বহাল থাকবেন। এই সিদ্ধান্তটি তাবলীগ জামাতের কেন্দ্রীয় শূরা বা পরামর্শদাতা পরিষদকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করার একটি প্রচেষ্টা। আমিরকে শুরা সদস্যদের সঙ্গে পরামর্শ করে এবং সকলের সমন্বয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়, যা তাবলীগের সাংগঠনিক পদ্ধতির মূল ভিত্তি।
মাওলানা সাদ কান্ধলভীর নেতৃত্ব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের তাবলীগ জামাতে বিভাজন ছিল। তাঁর অনুসারী এবং তাঁর বিরোধী হিসেবে পরিচিত আরেকটি অংশের মধ্যে এই বিভেদ দেশের বিশ্ব ইজতেমাসহ তাবলীগের বিভিন্ন কার্যক্রমে প্রভাব ফেলেছিল। মাওলানা সাদ কান্ধলভী বিরোধীতার কারণে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারেননি, যার ফলে বিশ্ব মাশওয়ারাও ইন্দোনেশিয়াতে অনুষ্ঠিত হলো।
সৈয়দ ওয়াসিফুল ইসলামকে আমির মনোনীত করার ঘটনাটি মাওলানা সাদ কান্ধলভীর অনুসারীদের মধ্যে সুদৃঢ় নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করল। তবে এই মনোনয়ন তাবলীগের দুটি অংশের মধ্যে ঐক্য ফিরিয়ে আনবে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। নতুন আমিরের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো, বিভেদ দূর করে দেশের তাবলীগ জামাতকে আবার একটি একক প্ল্যাটফর্মে আনা।
ধর্মীয় আন্দোলন ও বিশ্ব ইজতেমার ভবিষ্যৎ
তাবলীগ জামাত একটি অরাজনৈতিক ধর্মীয় আন্দোলন, যার প্রধান উদ্দেশ্য ইসলামের দাওয়াত মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। বাংলাদেশ এই আন্দোলনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র এবং এখানে প্রতি বছর বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়। নতুন আমির নির্বাচনের ফলে বাংলাদেশের তাবলীগের কার্যক্রম এবং বিশ্ব ইজতেমার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সৈয়দ ওয়াসিফুল ইসলামের নেতৃত্বে বাংলাদেশের তাবলীগ জামাত বিশ্ব ইজতেমাসহ অন্যান্য ধর্মীয় কার্যক্রমে কী ধরনের পরিবর্তন আনে, সেদিকে সবার নজর থাকবে। আশা করা হচ্ছে, নতুন নেতৃত্বের অধীনে তাবলীগ জামাতের সাংগঠনিক গতিশীলতা বৃদ্ধি পাবে এবং এটি ইসলামের শান্তিপূর্ণ দাওয়াতকে আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হবে।
নেতৃত্বে নতুন দিগন্ত
দীর্ঘদিন পর তাবলীগ জামাত বাংলাদেশের জন্য একজন নতুন আমির পেল। সৈয়দ ওয়াসিফুল ইসলামের এই মনোনয়ন কেবল নেতৃত্বের পরিবর্তন নয়, এটি তাবলীগ জামাতের সাংগঠনিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। তাঁর বিশ্বব্যাপী অভিজ্ঞতা এবং জ্যেষ্ঠতা এই নেতৃত্বকে শক্তিশালী করবে। তবে তাঁকে দেশের অভ্যন্তরে বিদ্যমান বিভাজন সামাল দিয়ে সকল সাথীকে একই পতাকাতলে আনতে হবে। এই নির্বাচন ধর্মীয় আন্দোলনের গতিশীলতা বাড়াবে এবং ভবিষ্যতে বিশ্ব ইজতেমাসহ তাবলীগের অন্যান্য কার্যক্রমকে নতুন পথে পরিচালিত করবে বলে প্রত্যাশা করা যায়।
এম আর এম – ২৪৩৪,Signalbd.com



