আঞ্চলিক

নেশার টাকা না পেয়ে বাবাকে হত্যা, ছেলের ফাঁসির আদেশ

Advertisement

টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলায় নেশার টাকার জন্য নিজের বাবাকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যার দায়ে ছেলেকে মৃত্যুদণ্ড (ফাঁসির আদেশ) দিয়েছেন আদালত। টাঙ্গাইলের জেলা ও দায়রা জজ মো. হাফিজুর রহমান রবিবার দুপুরে এই রায় ঘোষণা করেন। দণ্ডিত ব্যক্তির নাম ওয়াহেদ আলী ওরফে ওয়াহেদুজ্জামান, যিনি সখীপুর উপজেলার দাড়িপাকা পশ্চিম পাড়া গ্রামের আব্দুস সামাদের ছেলে। আদালত একই সাথে তাঁকে ২০ হাজার টাকা জরিমানাও করেছেন। রায় ঘোষণার পর দণ্ডিত ওয়াহেদ আলীকে কঠোর নিরাপত্তা মধ্যে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এই ঘটনা সমাজে মাদকাসক্তি এবং পারিবারিক সহিংসতার ভয়াবহ পরিণামকে আবারও সামনে এনেছে।

মর্মান্তিক হত্যার ঘটনার বিস্তারিত

টাঙ্গাইলের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) মোঃ শফিকুল ইসলাম (রিপন) মামলার বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটেছিল গত বছর ২০২৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি। নেশাগ্রস্ত ওয়াহেদ আলী ওই দিন দুপুরে প্রথমে নেশার টাকার জন্য তাঁর মাকে মারপিট করেন। পরিবারের কলহ এড়াতে ওয়াহেদের বাবা আব্দুস সামাদ (৬৫) তাঁর স্ত্রীকে এক আত্মীয়ের বাড়িতে পাঠিয়ে দেন।

সন্ধ্যায় বাবা আব্দুস সামাদকে বাড়িতে একা পেয়ে ওয়াহেদ আলী তাঁকে লক্ষ্য করে সহিংস হয়ে ওঠেন। এক পর্যায়ে ওয়াহেদ আলী লাঠি দিয়ে তাঁর বাবা আব্দুস সামাদকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করেন। মাদকাসক্ত সন্তানের হাতে বাবার এমন করুণ পরিণতিতে পুরো এলাকায় শোক ও স্তম্ভিত অবস্থা বিরাজ করে।

মামলা দায়ের ও তদন্ত প্রক্রিয়া

বাবা আব্দুস সামাদকে হত্যার পরদিন অর্থাৎ ২৬ ফেব্রুয়ারি, নিহত আব্দুস সামাদের ভাই আব্দুস রশীদ মিয়া বাদী হয়ে ঘাতক পুত্র ওয়াহেদ আলীকে আসামি করে সখীপুর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। ঘটনার পরপরই পুলিশ অভিযুক্ত ওয়াহেদ আলীকে গ্রেপ্তার করে।

মামলার তদন্ত শেষে সখীপুর থানার তৎকালীন উপ-পরিদর্শক (এসআই) সুকান্ত রায় দ্রুততার সাথে ২০২৪ সালের ৩০ মে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। অভিযোগপত্রে ওয়াহেদ আলীর বিরুদ্ধে তাঁর বাবাকে হত্যার সুস্পষ্ট প্রমাণ ও সাক্ষ্য উপস্থাপন করা হয়। মামলার তদন্ত প্রক্রিয়া স্বল্প সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ায় বিচারের পথ দ্রুত উন্মোচিত হয়।

বিচারিক প্রক্রিয়া ও সাক্ষ্য গ্রহণ

আদালতে বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হয় চলতি বছরের ১ জানুয়ারি, যখন আদালত ওয়াহেদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করেন। মামলার সুষ্ঠু বিচারের জন্য আদালতে মোট ১২ জন সাক্ষী তাঁদের সাক্ষ্য দেন। সাক্ষ্য এবং প্রমাণাদির ভিত্তিতে আদালত নিশ্চিত হন যে, দণ্ডিত ওয়াহেদ আলী নেশার টাকার জন্য তাঁর বাবাকে হত্যা করেছেন।

রাষ্ট্র পক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন সরকারি কৌঁসুলি মোঃ শফিকুল ইসলাম (রিপন)। বাদী পক্ষের আইনজীবী হিসেবে মামলাটি পরিচালনা করেন মোঃ রাসেল রানা। অন্যদিকে, আসামী ওয়াহেদ আলীর পক্ষে রাষ্ট্র কর্তৃক নিয়োজিত আইনজীবী আইনি সহায়তা প্রদান করেন। উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে আদালত ওয়াহেদ আলীর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন।

আদালতের রায় ও দণ্ডাদেশ

টাঙ্গাইলের জেলা ও দায়রা জজ মো. হাফিজুর রহমান সাক্ষ্য-প্রমাণ ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা করে রবিবার দুপুরে ওয়াহেদ আলী ওরফে ওয়াহেদুজ্জামানকে তাঁর বাবা আব্দুস সামাদকে হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ড এবং ২০ হাজার টাকা জরিমানার আদেশ দেন। রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক সমাজের ওপর মাদকাসক্তির ভয়াবহ প্রভাব এবং পারিবারিক সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দেন।

সরকারি কৌঁসুলি মোঃ শফিকুল ইসলাম (রিপন) আদালতের এই রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এই রায় মাদকাসক্তিজনিত অপরাধের বিরুদ্ধে সমাজে একটি শক্তিশালী উদাহরণ তৈরি করবে এবং নেশাগ্রস্তদের মাঝে একটি সতর্কবার্তা পৌঁছাবে। রায়ের পরই দণ্ডিত ব্যক্তিকে পুলিশি পাহারায় টাঙ্গাইল জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।

এই ঘটনাটি সমাজে মাদকাসক্তি এবং এর ফলে সৃষ্ট পারিবারিক সহিংসতার চরম রূপকে তুলে ধরে। মাদকাসক্তি কেবল ব্যক্তির জীবনকেই ধ্বংস করে না, এটি পরিবার এবং সামাজিক বন্ধনকেও ছিন্ন করে দেয়। মাদকাসক্ত সন্তানের হাতে পিতা হত্যার মতো ঘটনায় সমাজে নৈতিক অবক্ষয় এবং হতাশা সৃষ্টি করে।

মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, মাদকাসক্ত ব্যক্তির মধ্যে তাৎক্ষণিক চাহিদা মেটানোর জন্য সহিংসতা, রাগ এবং আবেগের নিয়ন্ত্রণ হারানোর প্রবণতা দেখা যায়। এই ধরনের ঘটনা প্রমাণ করে যে, কেবল মাদক নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং মাদকাসক্তদের চিকিৎসা এবং পুনর্বাসনও একটি সামাজিক জরুরি বিষয়। সমাজের নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধে পরিবারের সদস্যদের আরও সচেতন এবং সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

সামাজিক অবক্ষয় ও বিচারের দৃষ্টান্ত

টাঙ্গাইলের এই রায় সমাজের জন্য একটি দৃষ্টান্তমূলক বার্তা দিয়েছে যে, পারিবারিক বন্ধন ছিন্ন করে নেশার টাকার জন্য সংঘটিত অপরাধকে কোনোভাবেই লঘু করে দেখা হবে না। ওয়াহেদ আলীর মৃত্যুদণ্ডাদেশ প্রমাণ করে, আদালত এই ধরনের জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এই রায় সমাজে মাদকাসক্তিজনিত অপরাধের বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টি করবে এবং পারিবারিক মূল্যবোধ রক্ষায় সহায়ক হবে। তবে একই সাথে এই ঘটনাটি সমাজের অবক্ষয়, পারিবারিক সহিংসতা এবং মাদকাসক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রয়োজনীয়তা স্মরণ করিয়ে দেয়।

এম আর এম – ২৪৩৩,Signalbd.com

মন্তব্য করুন
Advertisement

Related Articles

Back to top button