অর্থনীতি

বেড়েছে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম

Advertisement

দেশে ভোক্তা পর্যায়ে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। প্রতি লিটার ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম ২ টাকা করে বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়। নতুন এই দাম সোমবার (১ ডিসেম্বর) থেকে কার্যকর হবে। স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য ওঠানামার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। বছরের শেষ মাসে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি দেশের পরিবহন খাত এবং সাধারণ জনগণের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

নতুন মূল্য নির্ধারণ: প্রতি লিটারে ২ টাকা বৃদ্ধি

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় রবিবার (৩০ নভেম্বর) এক বার্তায় নতুন এই মূল্য ঘোষণা করেছে। মূল্য সমন্বয়ের পর প্রতি লিটার জ্বালানি তেলের নতুন দাম:

জ্বালানি তেলের ধরনপূর্বের মূল্য (প্রতি লিটার)নতুন মূল্য (প্রতি লিটার)মূল্য বৃদ্ধি
ডিজেল১০২ টাকা১০৪ টাকা২ টাকা
অকটেন১২২ টাকা১২৪ টাকা২ টাকা
পেট্রোল১১৮ টাকা১২০ টাকা২ টাকা
কেরোসিন১১৪ টাকা১১৬ টাকা২ টাকা

মন্ত্রণালয়ের বার্তায় বলা হয়, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য হ্রাস/বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে দেশে ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি মাসে জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণের লক্ষ্যে সংশোধিত প্রাইসিং ফর্মুলার আলোকে ডিসেম্বর মাসের জন্য এই মূল্য পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত সোমবার (১ ডিসেম্বর) থেকে সারাদেশে কার্যকর হবে।

মূল্য সমন্বয়ের পদ্ধতি ও উদ্দেশ্য

জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যের ওঠানামার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশে জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণের জন্য একটি স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি বা ‘প্রাইসিং ফর্মুলা’ সংশোধন করা হয়েছে। এই ফর্মুলার আলোকেই প্রতি মাসে একবার মূল্য সমন্বয় করা হয়। এই পদ্ধতির উদ্দেশ্য হলো দেশের বাজারে তুলনামূলক সাশ্রয়ী মূল্যে জ্বালানি তেল সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং একইসাথে রাষ্ট্রীয় সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) লোকসান কমানো।

অক্টোবর ও নভেম্বরের শুরুতে জ্বালানি তেলের দাম কমানো হলেও, ডিসেম্বর মাসে বিশ্ববাজারে দাম কিছুটা বেড়ে যাওয়ায় সরকার সেই অনুপাতে মূল্য সমন্বয় করেছে। এই স্বয়ংক্রিয় মূল্য সমন্বয় পদ্ধতি আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে স্থানীয় দামের ব্যবধান কমিয়ে আনতে সাহায্য করে।

পরিবহন খাত ও ভোক্তা পর্যায়ে প্রভাব

ডিজেল ও কেরোসিনের মূল্যবৃদ্ধি দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলে, কারণ ডিজেল মূলত পরিবহন ও কৃষি খাতে ব্যবহৃত হয়। ২ টাকা মূল্যবৃদ্ধি হলেও এর সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের সামগ্রিক পরিবহন ব্যয়ের ওপর। বাস, ট্রাক, লঞ্চসহ বিভিন্ন গণপরিবহনের ভাড়া বাড়তে পারে। পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সমিতিগুলো প্রায়শই জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পরপরই ভাড়া বাড়ানোর দাবি তোলেন।

বিশেষ করে, শীতকালে কৃষি খাতে সেচের জন্য ডিজেলের ব্যবহার বাড়ে। এই সময়ে ডিজেলের দাম বাড়ায় কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়বে, যার ফলে বাজারে কৃষিপণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা থাকে। অন্যদিকে, অকটেন ও পেট্রোলের দাম বাড়ানোয় ব্যক্তিগত গাড়ির মালিকদের ব্যয় বাড়বে। সামগ্রিকভাবে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি দেশের মুদ্রাস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেবে।

মূল্যবৃদ্ধির পূর্বপটভূমি ও স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতির সূচনা

বাংলাদেশে অতীতে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় ছিল একটি দীর্ঘ ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেও সরকার ভর্তুকি দিয়ে দীর্ঘদিন মূল্য ধরে রাখত, ফলে বিপিসিকে বড় অঙ্কের লোকসান গুনতে হতো। এই লোকসান মেটাতে সরকারকে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হতো, যা দেশের অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করত।

এই সমস্যা এড়াতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার স্বয়ংক্রিয় মূল্য সমন্বয় পদ্ধতি প্রবর্তন করে। এই পদ্ধতির ফলে বিশ্ববাজারে দাম কমলে স্থানীয় বাজারেও দাম কমানো হয় এবং দাম বাড়লে সামান্য বাড়ানো হয়। এই পদ্ধতি প্রবর্তনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল জ্বালানি খাতের সংস্কার এবং সরকারী কোষাগারের ওপর থেকে ভর্তুকির বোঝা কমানো। এই পদ্ধতি চালু হওয়ার পর থেকে দেশে বেশ কয়েকবার জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে, কখনও বেড়েছে আবার কখনও কমেছে।

অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণ ও জনগণের প্রতিক্রিয়া

অর্থনীতিবিদরা স্বয়ংক্রিয় মূল্য সমন্বয় পদ্ধতিকে দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক সংস্কারের জন্য একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, এতে জ্বালানি খাতে শৃঙ্খলা আসবে এবং ভর্তুকির বোঝা কমে দেশের অন্যান্য উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হবে। তবে এই পদ্ধতির সঠিক বাস্তবায়ন জরুরি, যাতে বিশ্ববাজারে দাম কমলে ভোক্তারা দ্রুত তার সুবিধা পায়।

অন্যদিকে, সাধারণ ভোক্তা ও শ্রমিক সংগঠনগুলো এই মূল্যবৃদ্ধিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, মূল্যবৃদ্ধি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করবে। পরিবহন ভাড়ার সমন্বয় যেন যৌক্তিক হয় এবং কৃত্রিমভাবে কেউ যেন দাম বাড়িয়ে না দেয়, সেদিকে সরকারের নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।

অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ ও বাজার নিয়ন্ত্রণ

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি দেশের অর্থনীতির জন্য একটি অনিবার্য চ্যালেঞ্জ। স্বয়ংক্রিয় প্রাইসিং ফর্মুলা জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আনলেও, এর প্রভাব সাধারণ মানুষের ওপর পড়ে। সোমবার থেকে কার্যকর হতে যাওয়া নতুন এই মূল্য দেশের পরিবহন, কৃষি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে কী ধরনের প্রভাব ফেলে, তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। সরকারের জন্য এই মুহূর্তে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে যেন কৃত্রিম বাজার অস্থিরতা সৃষ্টি না হয় এবং দ্রব্যমূল্যের লাগাম যেন নিয়ন্ত্রণে থাকে।

এম আর এম – ২৪৩২,Signalbd.com

মন্তব্য করুন
Advertisement

Related Articles

Back to top button