বাংলাদেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হতে যাচ্ছে ১ ডিসেম্বর থেকে। বছরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই পরীক্ষাকে সামনে রেখে গোটা শিক্ষা ব্যবস্থায় যখন ব্যস্ততা, ঠিক সেই মুহূর্তে প্রাথমিক শিক্ষকদের বড় একটি অংশ ঘোষণা দিয়েছে পরীক্ষাবর্জনের। একাংশের কর্মবিরতি, অন্য অংশের পরীক্ষা নেওয়ার ঘোষণা—ফলে মাঠপর্যায়ে সৃষ্টি হয়েছে জটিলতা ও অনিশ্চয়তা।
এই পরিস্থিতি শুধুমাত্র শিক্ষক কর্তৃপক্ষের মধ্যে বিভক্তি নয়, বরং দেশের কোটি শিক্ষার্থীর নিয়মিত শিক্ষাজীবন ও পরীক্ষার ধারাবাহিকতাকেও ঝুঁকিতে ফেলছে। দাবি-দাওয়া, আন্দোলন, সরকারি আশ্বাস—সব মিলিয়ে প্রাথমিক শিক্ষা খাত এখন নজিরবিহীন আলোচনার কেন্দ্রে।
নিচে বর্তমান পরিস্থিতির পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ, প্রেক্ষাপট, দাবির বিস্তারিত, উভয় পক্ষের বক্তব্য এবং সরকারের অবস্থান তুলে ধরা হলো।
১১তম গ্রেডসহ তিন দফা দাবি : কোন দাবিতে আন্দোলন চলছে?
প্রাথমিক সহকারী শিক্ষকদের বড় অংশ ‘প্রাথমিক শিক্ষক দাবি বাস্তবায়ন পরিষদ’র ব্যানারে আন্দোলনে নেমেছেন। তাদের প্রধান দাবি তিনটি—
১. সহকারী শিক্ষকদের বেতন গ্রেড ১৩ থেকে বাড়িয়ে গ্রেড ১১ করা
বর্তমানে সহকারী শিক্ষকেরা জাতীয় বেতন স্কেলের ১৩তম গ্রেডে আছেন, যেখানে শুরুর মূল বেতন ১১ হাজার টাকা। দাবি হলো, তাদের বেতন অন্তত ১১তম গ্রেডে উন্নীত করতে হবে।
শিক্ষকদের মতে—
- একই যোগ্যতা নিয়ে দেশের অন্যান্য সরকারি খাতে যারা চাকরি করছেন, তারা ভালো গ্রেড পাচ্ছেন।
- প্রাথমিক শিক্ষকদের দায়িত্ব ও কাজের পরিমাণ অনেক বেশি; কিন্তু বেতন সেই তুলনায় কম।
- দীর্ঘদিন ধরে এ দাবি ঝুলে আছে, বাস্তবায়ন হয়নি।
২. ১০ বছর ও ১৬ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার নীতিমালা সংশোধন
উচ্চতর গ্রেড পাওয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সমস্যায় আছেন হাজারো শিক্ষক। অনেক ক্ষেত্রে ফাইল আটকে থাকে, বা স্পষ্ট নীতিমালা না থাকায় শিক্ষকরা হয়রানির শিকার হন।
৩. শতভাগ পদোন্নতি নিশ্চিত করা
পদোন্নতিতে অসাম্য ও জটিলতা দূর করার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষকরা।
একাংশের কর্মবিরতি: “দাবি পূরণ না হলে পরীক্ষা বর্জন”
‘প্রাথমিক শিক্ষক দাবি বাস্তবায়ন পরিষদ’–এর নেতা মোহাম্মদ শাসছুদ্দীন জানিয়েছেন—
“রবিবারের মধ্যে দাবি পূরণের ঘোষণা না এলে সোমবার থেকে শুরু হওয়া বার্ষিক পরীক্ষা বর্জন করা হবে।”
কর্মসূচির আওতায় তারা—
- বিদ্যালয়ে ক্লাস না নেওয়া
- পরীক্ষায় অংশ না নেওয়া
- ব্যানার–ফেস্টুনসহ দাবি আদায়ের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া
এই কর্মসূচিগুলো অব্যাহত রেখেছেন।
তাদের দাবি, সরকার আগেরবার আশ্বাস দিয়েছিল কিন্তু বাস্তবায়নের কোনো সুনির্দিষ্ট গতি দেখা যায়নি। তাই তারা বাধ্য হয়েই আবার কর্মবিরতিতে ফিরেছেন।
অন্য অংশ বলছে — পরীক্ষা হবে, শিক্ষার্থীদের ক্ষতি করা যাবে না
এরই মধ্যে সহকারী শিক্ষকদের আরেকটি সংগঠন ‘সহকারী শিক্ষক সংগঠন ঐক্য পরিষদ’ জানিয়েছে, তারা নিয়মমাফিক বার্ষিক পরীক্ষা নেবেন।
তাদের বক্তব্য—
- শিক্ষার্থীদের স্বার্থে পরীক্ষা বন্ধ রাখা উচিত নয়।
- দাবি-দাওয়া রয়েছে, কিন্তু পরীক্ষার মতো জাতীয় গুরুত্বের জায়গায় অচলাবস্থা তৈরি করা সমাধান নয়।
- তারা ২৩–২৭ নভেম্বর কর্মবিরতি পালন করেছেন, সেখানে দাবি জানিয়েছেন।
- দাবি বাস্তবায়নের জন্য ১১ ডিসেম্বর থেকে তারা অনশন করবেন।
তবে তারা আন্দোলনরত অন্য অংশের প্রতি “নৈতিক সমর্থন” আছে বলে উল্লেখ করেছেন।
এ অবস্থায় শিক্ষক সমাজ কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত এবং এই বিভক্তির প্রভাব পড়বে শিক্ষার্থীদের ওপর।
বাংলাদেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবস্থা : পরিসংখ্যান যা বলছে
বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে দাঁড়িয়ে আছে শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি। এখানে রয়েছে—
- সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়: ৬৫,৫৬৯টি
- শিক্ষার্থী: এক কোটির বেশি
- শিক্ষক: প্রায় সাড়ে তিন লাখ
- সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত পদ: ৩,৬৯,২১৬টি
- বর্তমানে কর্মরত: ৩,৫২,২০৮ জন
এ বিশাল কর্মশক্তির মধ্যে যখন বিভক্তি তৈরি হয়, তখন তা জাতীয় পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে।
আগের আন্দোলন, সরকারি বৈঠক এবং আশ্বাস
নভেম্বরের শুরুতে শিক্ষকরা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছিলেন। বিদ্যালয়েও কর্মবিরতি চলে।
পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠলে সরকার আলোচনা শুরু করে।
অর্থ বিভাগের সচিব এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের বৈঠক হয়। সেখানে জানানো হয়—
- সহকারী শিক্ষকদের গ্রেড উন্নীত করার প্রস্তাব জাতীয় বেতন কমিশনে পাঠানো হয়েছে।
- কমিশন বিষয়টি বিবেচনা করছে, এবং সুপারিশ পাওয়ার পর অর্থ বিভাগ ব্যবস্থা নেবে।
- শিক্ষকরা ১০ ও ১৬ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব পাঠালে অর্থ বিভাগ তা পর্যালোচনা করবে।
- শতভাগ পদোন্নতি বিদ্যমান বিধিমালার আলোকে বিবেচনা করা হবে।
এই ঘোষণার পর আন্দোলন স্থগিত করেছিলেন শিক্ষকরা। কিন্তু আবার নতুন করে বিভক্তি তৈরি হয়েছে।
কেন শিক্ষকরা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে গেলেন?
শিক্ষক নেতাদের মতে—
- আগের আশ্বাসে নিশ্চিততার অভাব ছিল।
- কোনো সময়সীমা উল্লেখ করা হয়নি।
- বেতন কমিশনে পাঠানো মানেই যে দ্রুত সিদ্ধান্ত হবে, তা বলা যাচ্ছে না।
- অনেকে মনে করছেন, শুধু “বিবেচনায় আছে” বলে আন্দোলন স্থগিত করা ভুল ছিল।
- আবার অনেকে মনে করেন, শিক্ষার্থীদের ক্ষতি করা যায় না।
এই দুই অবস্থানের মধ্যে ফাঁটল তৈরি হয়েছে।
মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা : বিদ্যালয়গুলোতে কী পরিস্থিতি?
ঢাকার বিভিন্ন বিদ্যালয় ছাড়াও নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, রংপুরসহ বিভিন্ন জেলার প্রধান শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে—
- কোথাও শিক্ষকরা কর্মবিরতিতে, তাই ক্লাস বন্ধ।
- কোথাও আবার শিক্ষকরা নিয়মমাফিক প্রস্তুতি নিচ্ছেন বার্ষিক পরীক্ষার।
- অভিভাবকেরা উদ্বিগ্ন—শিশুরা পরীক্ষা দিতে পারবে কি না, তা অনেক জায়গাতেই নিশ্চিত নয়।
- অনেক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের সংখ্যা কমে গেছে; ফলে যারা দায়িত্ব নিচ্ছেন তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ছে।
- পরীক্ষার প্রশ্নপত্র, দায়িত্ব বণ্টন, হল তত্ত্বাবধান—এসব বিষয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
যে পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীরা বার্ষিক পরীক্ষায় মনোযোগী হওয়ার কথা, সেখানে তারা বিভ্রান্ত ও উদ্বেগে রয়েছে।
সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে?
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন—
- সরকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
- বার্ষিক পরীক্ষা জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তাই পরীক্ষা স্বাভাবিকভাবে সম্পন্ন করার চেষ্টা চলছে।
- শিক্ষক সংগঠনগুলোর সঙ্গে আবারও আলোচনা হতে পারে।
তবে শিক্ষকরা সুস্পষ্ট ঘোষণা ছাড়া কর্মসূচি প্রত্যাহারে রাজি নন বলে জানিয়েছে আন্দোলনরত সংগঠন।
অভিভাবক ও শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতামত
অভিভাবকদের বক্তব্য:
- বছরের শেষে পরীক্ষা বন্ধ হলে শিশুরা মানসিক চাপে পড়ে।
- সারাবছরের প্রস্তুতির মূল্যায়ন ব্যহত হয়।
- শিক্ষক–সরকার উভয়ের উচিত সমাধানে পৌঁছানো।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য:
- প্রাথমিক শিক্ষক সমাজ দেশের শিক্ষার প্রথম ধাপকে বহন করেন।
- তাদের বেতন–ভাতা, পদোন্নতি যথাযথ না হলে শিক্ষকতার পেশা আকর্ষণ হারায়।
- সরকার ও আন্দোলনকারী উভয় পক্ষের সমন্বিত আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সমাধান জরুরি।
শিক্ষার্থীর স্বার্থেই জরুরি সমাধান
বার্ষিক পরীক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আন্দোলন ও পরীক্ষাবর্জনের ঘোষণা দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে। শিক্ষক সমাজের দাবি দীর্ঘদিনের, এবং যুক্তিযুক্ত বলেই অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন।
তবে আন্দোলনের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এক কোটি শিক্ষার্থী।
তাই এখন সময়—
- সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ,
- উভয় পক্ষের গঠনমূলক আলোচনা,
- দাবি–দাওয়া ও শিক্ষার্থীর স্বার্থ—দুই দিককে সমন্বয় করে সমাধানে পৌঁছানো।
শিক্ষকদের ন্যায্য দাবি পূরণ হলে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে—এমনটিই আশা শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সবাই।
MAH – 14064 I Signalbd.com



