ভারত মহাসাগরে সর্বাধুনিক বি-২ স্টেলথ যুদ্ধবিমানের বহর পাঠাল যুক্তরাষ্ট্র

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন ভারত মহাসাগরের কৌশলগত গার্সিয়া দ্বীপে ছয়টি সর্বাধুনিক বি-২ স্টেলথ যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই মোতায়েনকে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির প্রক্ষেপণ এবং রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেই দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা।
বি-২ স্টেলথ বোমারু বিমান: আধুনিক যুদ্ধকৌশলের প্রতীক
বি-২ ‘স্পিরিট’ স্টেলথ বোমারু বিমান হলো যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তির সমরযানগুলোর একটি, যা শত্রুপক্ষের রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম। প্রায় ১১ হাজার কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রমে সক্ষম এই বিমান পারমাণবিক ও প্রচলিত অস্ত্র বহনে সক্ষম। এদের ঘনিষ্ঠভাবে নজরদারি করা হয় এবং সাধারণত কৌশলগত উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়।
গার্সিয়া দ্বীপে এই বিমানের মোতায়েন একদিকে যেমন মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সংকটে যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় উপস্থিতি নির্দেশ করে, অন্যদিকে এটি একটি শক্ত বার্তা বহন করছে বলেও ধারণা করছেন সামরিক বিশ্লেষকরা।
উত্তেজনার কেন্দ্রে মধ্যপ্রাচ্য: হুতি ও ইরানকে বার্তা
সম্প্রতি ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরব এবং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। একইসঙ্গে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্কেও দেখা দিয়েছে নতুন করে উত্তেজনা। এই পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হ্যাগসেথ ইরান ও হুতি মিত্রদের বিরুদ্ধে কড়া বার্তা দিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বি-২ বিমান মোতায়েন সরাসরি কোনো যুদ্ধ প্রস্তুতির ইঙ্গিত না দিলেও তা ইরান ও ইয়েমেনের হুতিদের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে।
স্যাটেলাইট চিত্রে বিমানের অবস্থান
১ এপ্রিল, ২০২৫ তারিখে বেসরকারি স্যাটেলাইট ইমেজিং কোম্পানি প্ল্যানেট ল্যাবস একটি ছবি প্রকাশ করে, যেখানে ভারত মহাসাগরের দিয়েগো গার্সিয়া ঘাঁটির টারমাকে ছয়টি বি-২ যুদ্ধবিমানকে স্পষ্টভাবে দেখা যায়। ছবিতে আরও দেখা গেছে, সেখানে বেশ কয়েকটি শেল্টার হ্যাঙ্গার নির্মাণ করা হয়েছে যা থেকে বোঝা যায়, সেখানে আরও বিমান থাকতে পারে যেগুলো দৃশ্যমান নয়।
এছাড়া ঘাঁটিটিতে বিভিন্ন প্রকার জ্বালানি ট্যাংকার ও মালবাহী কার্গো বিমানও উপস্থিত রয়েছে। এতে স্পষ্ট হয় যে, শুধু বিমান নয়, গোটা অপারেশন চালানোর মতো অবকাঠামো ইতিমধ্যে সেখানে প্রস্তুত।
গার্সিয়া ঘাঁটি: যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সামরিক কেন্দ্র
দক্ষিণ ভারত মহাসাগরে ব্রিটিশ মালিকানাধীন দিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি বহুদিন ধরেই মার্কিন নৌ ও বিমানবাহিনীর একটি কৌশলগত কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া এবং আফ্রিকার মিলিত অঞ্চলের কাছাকাছি হওয়ায় এটি একটি নিখুঁত সামরিক অবস্থান হিসেবে বিবেচিত।
১৯৭০-এর দশক থেকে এই ঘাঁটিকে যুক্তরাষ্ট্র ব্যবহার করছে। আফগানিস্তান, ইরাক এবং পারস্য উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় এই ঘাঁটি থেকে সরাসরি বিমান হামলা পরিচালনা করা হয়েছে।
সামরিক ও কূটনৈতিক বার্তার সমন্বয়
বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, শুধু সামরিক দিক থেকেই নয়, এই মোতায়েন একটি সুস্পষ্ট কূটনৈতিক বার্তাও বহন করে। মার্কিন প্রশাসন ইরানকে জানিয়ে দিচ্ছে, যদি তাদের মিত্রদের বিরুদ্ধে হামলা অব্যাহত থাকে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত রয়েছে দ্রুত এবং দূর থেকে পাল্টা জবাব দিতে।
এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্র ইসরায়েল ও সৌদি আরবের প্রতিও এক ধরনের আশ্বাস দিচ্ছে যে, হুতি বা অন্য কোনো প্রক্সি গোষ্ঠীর হুমকি থাকলে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিরক্ষা দিতে পিছপা হবে না।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
এই মোতায়েন দক্ষিণ এশিয়া এবং ভারত উপমহাদেশেও কূটনৈতিক দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বিশেষত ভারত ও চীন এই পদক্ষেপের প্রতি নিবিড় নজর রাখছে। ভারত, যেহেতু গার্সিয়া ঘাঁটির খুব কাছাকাছি অবস্থান করে, তাই আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও কৌশলগত ভারসাম্যের বিষয়েও বিভিন্ন প্রশ্ন উঠে আসছে।
চীন, যাদের ভারত মহাসাগরে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে, তারাও এই অবস্থানকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাধান্য বিস্তারের নতুন উদ্যোগ হিসেবে দেখছে।
উপসংহার: ভবিষ্যতের বার্তা কী?
যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ থেকে বোঝা যায়, বিশ্ব রাজনীতিতে স্ট্র্যাটেজিক বার্তা এখন শুধু কূটনৈতিক ভাষায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমেও প্রতিফলিত হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ ও সামরিক প্রস্তুতি আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে, এই অঞ্চল বিশ্বশক্তিগুলোর জন্য এখনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব হবে উত্তেজনা প্রশমন এবং কূটনৈতিক সমাধানে উৎসাহ দেয়া—যাতে এমন সামরিক মোতায়েন ভবিষ্যতে সংঘাতের দিকে না গড়ায়।