বিশ্ব

পশ্চিমাদের খুশি করতে আফগানিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ করছেন অসীম মুনির: ইমরান খান

Advertisement

পশ্চিমাদের খুশি করতে আফগানিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ করছেন আসিম মুনির: কারাগার থেকে ইমরান খানের বিস্ফোরক অভিযোগ

পাকিস্তানে রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট, সন্ত্রাসবাদ উত্থান এবং প্রতিবেশী আফগানিস্তানের সঙ্গে উত্তেজনার সময় হঠাৎই আবারও আলোচনায় এসেছেন কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। সাম্প্রতিক একটি এক্স বার্তায় তিনি পাকিস্তানের বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের বিরুদ্ধে তীব্র অভিযোগ এনে বলেছেন, “পশ্চিমা শক্তিগুলোর মন জয় করার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে আফগানিস্তানের সঙ্গে সংঘাত সৃষ্টি করছেন আসিম মুনির।”

কারাগারের নির্জন সেল থেকে দেওয়া এই বক্তব্য পাকিস্তানজুড়ে নতুন করে আলোড়ন তুলেছে। পিটিআই নেতাদের মতে, ইমরান খানকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে যেন তিনি কোনোভাবেই জনগণ বা রাজনৈতিক সহকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারেন। অন্যদিকে পাকিস্তানের সরকারি সূত্রগুলো বলছে, তার নিরাপত্তার কারণেই এমন ব্যবস্থা।

তবে ইমরান খানের নিজস্ব মন্তব্য ভিন্ন। তিনি দাবি করেছেন—

“এটাই পাকিস্তানের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক সময়। সেনাপ্রধানের ভুল সিদ্ধান্ত পুরো দেশকে বিপথে ঠেলে দিচ্ছে।”

ইমরান খানের অভিযোগ: “পাকিস্তান নয়, আসিম মুনিরের চিন্তা কেবল পশ্চিমাদের”

ইমরান খান তার বার্তায় বলেন,
“পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ, জনগণের নিরাপত্তা, দেশের অর্থনীতি—কোনো কিছুই আসিম মুনিরের অগ্রাধিকার নয়। তিনি শুধুই পশ্চিমা শক্তিগুলোকে খুশি করতে চাইছেন। সেজন্যই আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে একের পর এক উস্কানিমূলক পদক্ষেপ নিচ্ছেন।”

তিনি দাবি করেন, আসিম মুনির চাচ্ছেন আন্তর্জাতিক মহলে নিজেকে ‘মুজাহিদ’ বা ‘জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে কঠোর সেনা নেতা’ হিসেবে তুলে ধরতে। আর সেই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই ড্রোন হামলা, সীমান্তে উত্তেজনা এবং আফগান শরণার্থীদের দেশছাড়া করা হয়েছে।

ইমরান খান আরও বলেন—
“আফগানদের হঠাৎ হুমকি দেওয়া, পাকিস্তান থেকে লাখো শরণার্থী বহিষ্কার, সীমান্তে অভিযান এবং ড্রোন হামলা—এসবই পরিকল্পিত। আর এসবের প্রতিক্রিয়ায় সন্ত্রাসবাদ এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।”

কারাগারে নির্যাতনের অভিযোগ: “চার সপ্তাহে একজন মানুষের সঙ্গেও কথা বলিনি”

ইমরান খানের বার্তার সবচেয়ে আলোচিত অংশ ছিল তার নিজের কারাবন্দি অবস্থা নিয়ে।

তিনি জানান,
“আমাকে পুরোপুরি নির্জন সেলে আটকে রাখা হয়েছে। গত চার সপ্তাহে একজন মানুষের সঙ্গেও কথা হয়নি। বাইরের জগত থেকে আমাকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে। কারাগারের ম্যানুয়েল অনুযায়ী যে যেসব মৌলিক সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার কথা, তার অনেক কিছুই আমার থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে।”

ইমরান খানের ভাষ্য অনুযায়ী, তাকে মানসিকভাবে ভেঙে ফেলার জন্যই এমন বন্দোবস্ত করা হয়েছে।
পিটিআই নেতারা এটিকে মানবাধিকার লঙ্ঘন বলে দাবি করছেন।

উজমা খানের সাক্ষাৎ—রটনার অবসান

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হঠাৎই ছড়িয়ে পড়ে ‘ইমরান খান মারা গেছেন’। পাকিস্তানের বিভিন্ন শহরে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। গুজব এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারের সামনে লোকজন ভিড় করতে শুরু করে।

পরবর্তীতে ২ ডিসেম্বর ইমরান খানের বড় বোন উজমা খান কারাগারে তাকে দেখতে যান। সেখানেই ইমরান খান তাকে নিজের ওপর চালানো নির্যাতনের কথা জানান। উজমা খান কারাগার থেকে বেরিয়ে বিষয়টি প্রকাশ করেন এবং ইমরান খানের এক্স অ্যাকাউন্টে পুরো বিবরণ শেয়ার করা হয়। এতে গুজবের অবসান ঘটে।

তবে নতুন করে শুরু হয় অন্য বিতর্ক—

“ইমরান খান কি সত্যিই নিরাপদ?”

আফগানিস্তান-পাকিস্তান উত্তেজনার পটভূমি

ইমরান খানের অভিযোগগুলো স্রেফ রাজনৈতিক বক্তব্য নয়—এগুলো এমন এক সময় এসেছে, যখন পাকিস্তান-আফগানিস্তান সম্পর্ক সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে।

১. আফগান শরণার্থী সংকট

২০২৩ ও ২০২৪ সালে পাকিস্তান হঠাৎ আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়—
অবৈধ আফগানদের দেশ ছাড়তে হবে।
এর ফলে প্রায় ১৫ লাখ আফগান শরণার্থী দুঃসহ অবস্থায় পড়েন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেছে—
“দীর্ঘদিন পাকিস্তানে বসবাসরত নিরীহ মানুষদের এমন হঠাৎ বহিষ্কার মানবিক সংকট তৈরি করেছে।”

২. ড্রোন হামলা ও সীমান্ত উত্তেজনা

পাকিস্তানের দাবি, আফগানিস্তানে থাকা টি-টিপি (তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান) যোদ্ধারা পাকিস্তানে হামলা চালাচ্ছে। তালেবান সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে—“আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করতে পাকিস্তান পরিস্থিতি অতিরঞ্জিত করছে।”

দুই দেশের মধ্যকার সীমান্তে বারবার গোলাগুলি, বাণিজ্য বন্ধ, সীমান্ত ফটক বন্ধ হওয়া জনজীবন ব্যাহত করেছে।

৩. ভূরাজনীতি—পশ্চিমা চাপ বনাম তালেবান সম্পর্ক

পশ্চিমা শক্তিগুলো তালেবান সরকারের প্রতি কড়া অবস্থানে রয়েছে। তারা চায় তালেবান যেন মানবাধিকার, নারী অধিকার, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়।
পাকিস্তান এ ক্ষেত্রে মধ্যবর্তী ভূমিকায় থাকে, কিন্তু ইমরান খানের দাবি—
“ওয়াশিংটনকে খুশি করতে আসিম মুনির অযথা আফগানিস্তানের সঙ্গে সংঘাত বাড়াচ্ছেন।”

আসিম মুনিরের বিরুদ্ধে অভিযোগ—রাজনৈতিক না বাস্তব?

ইমরান খানের অভিযোগ করা নতুন নয়। তিনি বহুবার বলেছেন—
“জাতীয় রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় সমস্যা।”

তার দাবি অনুযায়ী—

  • পিটিআই ভাঙা হয়েছে সেনাবাহিনীর চাপে
  • নির্বাচন প্রভাবিত করা হয়েছে
  • তাকে কারাগারে রাখা হচ্ছে রাজনৈতিক কারণে
  • গণমাধ্যমে তার খবর সীমিত করা হচ্ছে

এদিকে পাকিস্তানের সরকার ও সেনাপ্রধানের ঘনিষ্ঠ মহল এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে—
“রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপ ও দুর্নীতির মামলায় ইমরান খান কারাবন্দি। সেনাবাহিনীর সঙ্গে বিষয়টির কোনো সম্পর্ক নেই।”

পাকিস্তানে সন্ত্রাসবাদের উত্থান—তালেবান ইস্যু নাকি অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা?

গত তিন বছরে পাকিস্তানে সন্ত্রাসী হামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বিভিন্ন থিঙ্কট্যাঙ্ক জানিয়েছে—২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে চলে যাওয়ার পর এই অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়।

ইমরান খানের দাবি—
“এসবের জন্য আসিম মুনিরের ভুল নীতি দায়ী।”

অন্যদিকে সরকারি অবস্থান—
“টি-টিপি আফগানিস্তানে নিরাপদ আশ্রয় পাচ্ছে, তাই সন্ত্রাসবাদ বাড়ছে।”

এ নিয়ে দুই পক্ষের দোষারোপ বন্ধ হয়নি।

ইমরান খানকে ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’ বলার অভিযোগ

ইমরান খান বলেছেন—
“সেনাবাহিনীর বর্তমান নেতৃত্ব পাকিস্তানের নৈতিক কাঠামো ধ্বংস করে দিয়েছে। সংবিধানকে উপেক্ষা করে তারা পুরো দেশকে নিজেদের ইচ্ছামতো চালাচ্ছে।”

তিনি অভিযোগ করেন—
“যে ব্যক্তি জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ে কৌশল নির্ধারণ করেন, তার মানসিক অবস্থাই স্বাভাবিক নয়। দেশের ভবিষ্যৎ তার হাতে জিম্মি।”

অবশ্য পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী এসব মন্তব্যকে ‘অসত্য, উসকানিমূলক এবং রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দিয়েছে।

ইমরান খানের রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা—কারাগারেও কমছে না

পাকিস্তানে জরিপ অনুযায়ী, কারাগারে থেকেও ইমরান খান এখনও সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতা।
পিটিআই–র সমর্থকরা বলছে—
“যত নির্যাতন বাড়ছে, ততই ইমরান খানের প্রতি সহানুভূতি বাড়ছে।”

সামনের নির্বাচন নিয়েও জনমনে প্রশ্ন—
“ইমরান খান ছাড়া কি সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব?”

বিশ্লেষকরা বলছেন, পাকিস্তানের রাজনীতি এখন ‘এক ব্যক্তি বনাম পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র’ অবস্থায় দাঁড়িয়ে গেছে।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া—মানবাধিকার ও গণতন্ত্র নিয়ে উদ্বেগ

জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো ইমরান খানের কারাবন্দি অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
তারা বলছে—
“রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে বিরত থাকুন, গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করুন।”

তবে পাকিস্তান বলছে—
“ইমরান খান আইনের শাসনের আওতায় বিচার পাচ্ছেন।”

আন্তর্জাতিক মহলের আরেকটি উদ্বেগ—

“আফগানিস্তানের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়লে দক্ষিণ এশিয়ায় স্থিতিশীলতা হুমকিতে পড়বে।”

বিশ্লেষণ: পাকিস্তান-আফগানিস্তান সংকটে আসলে কী ঘটছে?

তথ্য, ইতিহাস ও বর্তমান পরিস্থিতি মিলিয়ে বিশ্লেষকরা কয়েকটি মূল বিষয় তুলে ধরছেন—

১. পাকিস্তান তালেবানের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে

আগে তালেবানদের ‘পাকিস্তানের সম্পদ’ বলা হত। কিন্তু এখন তারা পাকিস্তানের নির্দেশ মানে না।

২. টি-টিপি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা

আফগানিস্তানের ভেতর টি-টিপি সক্রিয়—এ দাবি পাকিস্তানের।
তালেবান বলে—“টি-টিপি আমাদের সমস্যা নয়।”

৩. পশ্চিমাদের চাপ

পাশ্চাত্য দেশগুলো তালেবান সরকারের ওপর চাপ বাড়াতে চায়। পাকিস্তানকে তারা একটি ‘বল প্রয়োগকারী দেশ’ হিসেবে ব্যবহার করতে চায়—অনেকে এমন ধারণা দিচ্ছেন।

৪. সেনাবাহিনী–নাগরিক সরকারের বিরোধ

পাকিস্তানে সেনাবাহিনী সবসময় রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী।
ইমরান খানের বক্তব্য সেই পুরনো বিতর্ককেই সামনে এনেছে—
“কার হাতে পাকিস্তানের ক্ষমতা?”

ইমরান খান–আসিম মুনির দ্বন্দ্ব: ব্যক্তিগত না রাজনৈতিক?

ইমরান খান ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে তাকে দেওয়া গোয়েন্দা প্রতিবেদন নিয়ে আসিম মুনিরের সঙ্গে তার সম্পর্ক খারাপ হয় বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।
সেই সময়ই ইমরান আসিম মুনিরকে ডিরেক্টর–জেনারেল পদ থেকে সরিয়ে দেন।
এটিই দুই পক্ষের সম্পর্ককে স্থায়ীভাবে নষ্ট করে।

অনেকের মতে,

“আজকের চাপা উত্তেজনার বীজ সেই সময়ই বপন হয়েছিল।”

পিটার দৃষ্টিভঙ্গি: দেশ রাজনৈতিক সংকটে, সন্ত্রাসবাদের উত্থান, অর্থনীতি বিপর্যস্ত

পাকিস্তানের অর্থনীতি ভয়াবহ সংকটে।
মুদ্রাস্ফীতি, ডলার সংকট, বেকারত্ব, ঋণ, জ্বালানির দাম—সব মিলিয়ে জনজীবন কঠিন হয়েছে।
এ অবস্থায় রাজনৈতিক অস্থিরতা পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করছে।

বিশ্লেষকদের মতে—
“ইমরান খান বনাম আসিম মুনির লড়াই এখন পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি।”

ইমরান খানের সর্বশেষ বক্তব্য আবারও পাকিস্তানের রাজনীতি, নিরাপত্তা এবং ভূরাজনীতির জটিল সংকটকে সামনে এনেছে।
আফগানিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হওয়া, সীমান্ত উত্তেজনা, সন্ত্রাসবাদের উত্থান এবং পশ্চিমাদের চাপ—সব মিলিয়ে পাকিস্তান আজ কঠিন অবস্থায়।

ইমরান খানের দাবি সত্য হোক বা রাজনৈতিক কৌশল, তার অভিযোগগুলো পাকিস্তানে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
দেখা যাচ্ছে—
দেশের রাজনীতি যতই পরিবর্তন হোক, ইমরান খান এবং সেনাবাহিনীর দ্বন্দ্বই পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখবে।

MAH – 14119 I Signalbd.com

মন্তব্য করুন
Advertisement

Related Articles

Back to top button