বিশ্ব

অভিনব উপায়ে ধূমপানমুক্ত দেশ হওয়া সম্ভব, বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিলো সুইডেন

Advertisement

ধূমপানের হার কমাতে বিশ্বে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে সুইডেন। দেশটি ‘ক্ষতি কমিয়ে আনার’ (Harm Reduction) নীতি গ্রহণ করে অপেক্ষাকৃত কম ক্ষতিকর নিকোটিন বিকল্প ব্যবহারের সুযোগ বাড়িয়ে দিয়েছে। এই উদ্ভাবনী পদ্ধতির ফলস্বরূপ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সংজ্ঞা অনুযায়ী সুইডেন এখন বিশ্বের প্রথম ধূমপানমুক্ত দেশ হওয়ার অগ্রযাত্রায় সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে। বর্তমানে সুইডেনের প্রাপ্তবয়স্ক ধূমপায়ীর হার ৫ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে, যা ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক কম। সুইডেনের এই সাফল্য প্রমাণ করে, শুধু কঠোর নিষেধাজ্ঞায় নির্ভর না করে বাস্তবসম্মত বিকল্প প্রদানের মাধ্যমেও ধূমপানজনিত জনস্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। এই মডেলটি এখন বিশ্বজুড়ে জনস্বাস্থ্য নীতিতে নতুন বিতর্ক ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

সুইডেনের অভূতপূর্ব সাফল্য: পরিসংখ্যান ও প্রেক্ষাপট

সুইডেনের এই সাফল্য তাৎক্ষণিকভাবে আসেনি। এটি মূলত গত দুই দশক ধরে সুইডেনে চলমান সুদূরপ্রসারী জনসচেতনতা কার্যক্রম এবং কম ক্ষতিকর নিকোটিন বিকল্প ব্যবহারের সুযোগ বৃদ্ধির ফল। সুইডেনের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নিকোটিন নয়, শরীরে নিকোটিন নেওয়ার ধরনই স্বাস্থ্যের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সুইডেনে গত দশকে ধূমপায়ীর সংখ্যা ৫৫ শতাংশ কমেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে জনস্বাস্থ্যের ওপর:

  • মৃত্যুহার হ্রাস: ধূমপান-সম্পর্কিত রোগে সুইডিশ পুরুষদের মৃত্যুহার প্রতিবেশী ইউরোপীয় দেশগুলোর তুলনায় ৩৮ শতাংশ কমে গেছে
  • ক্যান্সারের হার: ফুসফুস ক্যান্সারের হার কমেছে ৪১ শতাংশ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনো দেশের প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার ধূমপানের হার ৫ শতাংশের নিচে নামলে সেটিকে ‘ধূমপানমুক্ত দেশ’ হিসেবে ঘোষণা করা যায়। সুইডেন দ্রুতই সেই লক্ষ্যমাত্রার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

‘ক্ষতি কমিয়ে আনার’ মডেল ও বিকল্প নিকোটিন

সুইডেনের ধূমপান কমানোর মডেলের মূল বিশেষত্ব হলো ধূমপান নিষিদ্ধ না করে বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করা। দেশটি ধূমপানের হার কমানোর জন্য নিকোটিন পাউচের মতো কম ক্ষতিকর বিকল্প ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে মানুষকে ধীরে ধীরে সিগারেট থেকে দূরে সরিয়েছে। এই বিকল্প পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে:

১. ঐতিহ্যবাহী ‘স্নাস’ (Snus): এটি সুইডেনের ঐতিহ্যবাহী তামাকজাত পণ্য, যা ঠোঁটের নিচে রেখে ব্যবহার করা হয় (ধোঁয়াবিহীন)। ২. তামাকমুক্ত নিকোটিন পাউচ (Nicotine Pouch): এটি তামাকবিহীন নিকোটিন পণ্য, যা সিগারেটের চেয়ে কম ক্ষতিকর হিসেবে বিবেচিত।

উল্লেখযোগ্যভাবে, সুইডেনই ইউরোপের একমাত্র দেশ যেখানে নিকোটিন পাউচ বাণিজ্যিকভাবে বৈধ। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে প্রায় ১৮ শতাংশ মানুষ এই কম ক্ষতিকর বিকল্প ব্যবহার করে। যদিও এসব পণ্য ঝুঁকিমুক্ত নয় এবং নিকোটিন আসক্তিকর, তবুও বিশেষজ্ঞদের মতে, এগুলো ধূমপানের (পোড়া তামাক) চেয়ে তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিকর।

নীতির প্রয়োগ: নিষেধাজ্ঞা নয়, বিকল্প সমাধান

সুইডেনের পরীক্ষার বিশেষত্ব হলো, দেশটির কর্তৃপক্ষ ও জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান শুধু নিষেধাজ্ঞায় নির্ভর না করে দুটি দিককে সমান গুরুত্ব দিয়েছে: জনসচেতনতা এবং বিকল্প ব্যবস্থাকে সহজলভ্য করে দেওয়া

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য সংকটের সময়ে সুইডেন দেখিয়েছে—নীতিমালায় নতুনত্ব থাকলে ধূমপান কমানো সম্ভব। শুধু সতর্কবার্তা নয়, বাস্তবসম্মত বিকল্প দেওয়ার মাধ্যমে ধূমপায়ীদের সহায়তা করাই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান। জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের আস্থা, উচ্চ সচেতনতা এবং নিয়ন্ত্রিত বাজারব্যবস্থাই এ সাফল্যের মূল ভিত্তি। এই কৌশলটি ‘ডাবল ট্র্যাক অ্যাপ্রোচ’ বা দ্বৈত নীতির উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত।

অন্যান্য দেশে মডেলটি কার্যকরের সম্ভাবনা

সুইডেনের এই অভিজ্ঞতা বিশ্বজুড়ে জনস্বাস্থ্য নীতি নির্ধারকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা তৈরি করেছে। যদিও প্রতিটি দেশের সংস্কৃতি, আইনগত ভিন্নতা এবং জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের আস্থা ভিন্ন হয়, তবুও সুইডেনের মডেলটিকে একটি ব্যবহারযোগ্য মডেল হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ই-সিগারেট, হিটেড টোব্যাকো (Heated Tobacco) ও নিকোটিন পাউচের মতো বিকল্প পণ্যগুলো যারা সহজে ধূমপান ছাড়তে পারেন না, তাদের জন্য ধূমপান কমাতে একটি কার্যকর সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারে। ধূমপান কমাতে বাস্তবভিত্তিক এবং নমনীয় নীতি অন্য দেশের জন্য ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা হতে পারে কিনা, সেই বিষয়ে এখন বিশ্বজুড়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। এই নীতির মাধ্যমে জনস্বাস্থ্যের ক্ষতিকে ধাপে ধাপে কমিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হয়।

বিশ্বজুড়ে নতুন বিতর্ক ও নমনীয় নীতির প্রয়োজনীয়তা

সুইডেনের এই সাফল্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে—ধূমপানমুক্ত সমাজ গড়ার লক্ষ্য অর্জন করা অসম্ভব নয়, তবে এর জন্য কঠোর নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি উদ্ভাবনী এবং মানবিক নীতির প্রয়োজন। ধূমপানের হার ৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে এনে সুইডেন প্রমাণ করেছে, ‘ক্ষতি কমিয়ে আনার’ মডেলটি কার্যকর। যদিও বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত সত্য হলো ধূমপান ছাড়াই সর্বোত্তম, কিন্তু যারা সহজে ছাড়তে পারেন না, তাদের জন্য কম ক্ষতিকর বিকল্পগুলো একটি প্রয়োজনীয় সমাধান হতে পারে। বিশ্বজুড়ে জনস্বাস্থ্য সংকটের সময়ে সুইডেনের এই অভিজ্ঞতা নীতি নির্ধারকদের চিরাচরিত পদ্ধতির বাইরে এসে বাস্তবভিত্তিক সমাধানে মনোযোগ দিতে উৎসাহিত করছে।

এম আর এম – ২৪৫৯,Signalbd.com

মন্তব্য করুন
Advertisement

Related Articles

Back to top button