ভারতে মুসলমানদের সাংবিধানিক অধিকার ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে এবং এ প্রক্রিয়ায় আদালতসহ বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান সরাসরি বা পরোক্ষভাবে চাপের মুখে রয়েছে—এমনই অভিযোগ তুলেছেন ভারতের শীর্ষ ইসলামি চিন্তাবিদ ও জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ-এর সভাপতি মাওলানা মাহমুদ মাদানী। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের রাজনৈতিক পরিবেশ, বিচার বিভাগীয় বিভিন্ন রায় এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে জড়িয়ে ক্রমবর্ধমান সামাজিক উত্তেজনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ভারতের সংবিধান যেসব মৌলিক অধিকার সংখ্যালঘুদের দিয়েছে, তার যথাযথ বাস্তবায়ন এখন প্রশ্নের মুখে।
পশ্চিমবঙ্গভিত্তিক শীর্ষ দৈনিক পুবের কলমে প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে মাদানীর বক্তব্য উদ্ধৃত করে জানানো হয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যে সব বিচারিক সিদ্ধান্ত সামনে এসেছে, তার মধ্যে অনেকগুলোতেই ন্যায়বিচারের চেয়ে রাজনীতির প্রভাবই বেশি দেখা গেছে। এ অবস্থায় ভারতের বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা, সংখ্যালঘুদের রাজনৈতিক নিরাপত্তা এবং সামাজিক সম্প্রীতি—সবই ঝুঁকির মুখে পড়ছে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষার দায়িত্ব সরকারের—মাদানী
মাহমুদ মাদানী বলেন, সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষার দায়িত্ব সরাসরি সরকারের। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র—সংখ্যালঘুরা নানাভাবে চাপের মুখে এবং তাদের ন্যায্য অধিকারগুলো ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেন, ভারতের কিছু রাজনৈতিক শক্তি দেশের ধর্মনিরপেক্ষ পরিচয়কে দুর্বল করার চেষ্টা করছে এবং সংখ্যালঘুদের বিষয়ে নেতিবাচক জনমত তৈরি করছে।
তার ভাষায়, “ভারতের সংবিধান সকল নাগরিককে সমান অধিকার দিয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এমন বহু সিদ্ধান্ত এসেছে, যেগুলো সরাসরি সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অধিকারকে খর্ব করছে। সরকারের উচিত ছিল তাদের রক্ষা করা, কিন্তু তারা বরং এমন পরিবেশ তৈরি করছে যাতে সংখ্যালঘুরা আতঙ্কে থাকে।”
বিচার বিভাগের উপর রাজনৈতিক চাপ—বাবরি ও তিন তালাক মামলার উদাহরণ
মাওলানা মাদানী সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার ক্ষেত্রে। তিনি বলেন, গত কয়েক দশকে ভারতের আদালত সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নানা বিতর্কিত রায় আদালতের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন বাবরি মসজিদ রায় এবং তিন তালাক মামলাকে। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের মতো স্পর্শকাতর ধর্মীয় বিষয়ে আদালতের রায় অনেকের কাছেই ন্যায়ের প্রত্যাশা পূরণ করেনি। অনেক বিশ্লেষক এর মধ্যে রাজনৈতিক চাপের প্রভাব দেখেছেন।
তিন তালাক মামলাতেও মুসলিম ব্যক্তিগত আইনকে লক্ষ্য করে সরকারের অতি-সক্রিয়তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে বলে তার দাবি।
মাদানী বলেন, “বিচার বিভাগে সরকারি চাপ রয়েছে—এ কথা আজ ভারতের সাধারণ মানুষও অনুভব করেন। সংবিধান রক্ষা করা আদালতের দায়িত্ব হলেও, যদি আদালতই চাপে পড়ে যায়, তাহলে সংখ্যালঘুরা কোথায় দাঁড়াবে?”
জিহাদকে ভুলভাবে প্রচার করছে রাজনৈতিক শক্তি ও গণমাধ্যম
মাহমুদ মাদানী জোর দিয়ে বলেন, ‘জিহাদ’ একটি পবিত্র ধর্মীয় ধারণা, যার মূল উদ্দেশ্য কল্যাণ, ন্যায় এবং মানবতার জন্য সংগ্রাম। কিন্তু ভারতের কিছু রাজনৈতিক শক্তি এবং তাদের সমর্থিত গণমাধ্যম এই শব্দটিকে বিকৃত করে জনমনে ভুল ধারণা তৈরি করছে।
তিনি উদাহরণ হিসেবে ‘লাভ জিহাদ’, ‘ল্যান্ড জিহাদ’, ‘পপুলেশন জিহাদ’-এর মতো কথাবার্তা উল্লেখ করেন। এই শব্দগুলো ব্যবহার করে মুসলমানদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে খলনায়ক বানানোর চেষ্টা চলছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
মাদানীর মতে,
“ধর্মীয় গ্রন্থে ‘জিহাদ’ মানে আত্মশুদ্ধি থেকে শুরু করে অন্যের মঙ্গলের জন্য সংগ্রাম। কিন্তু সরকারপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠী ও গণমাধ্যম এটিকে এমনভাবে তুলে ধরছে—যেন এটি একটি অপরাধমূলক বা চরমপন্থী কর্মকাণ্ড। এতে সামাজিক বিভাজন বাড়ছে এবং মুসলমানদের প্রতি সন্দেহ-ভীতি গভীর হচ্ছে।”
ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামো হিংসাকে সমর্থন করে না
যদিও মাদানী জিহাদের ভুল ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানান, তিনি একই সঙ্গে স্পষ্ট করে বলেন—ভারতের মুসলমানরা কোনোভাবেই সহিংসতার পক্ষে নয়। তারা সংবিধানকে সম্মান করে, দেশের আইন মেনে চলে এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বিশ্বাসী।
তার মতে,
“ভারত এমন একটি দেশ যেখানে বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষ একসঙ্গে বসবাস করে। এই বহুত্ববাদই ভারতের শক্তি। কিন্তু যখন সংবিধানিক মূল্যবোধ আঘাতপ্রাপ্ত হয়, তখনই সমাজে বিভাজন তৈরি হয়।”
তিনি আরও বলেন, “ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামো কখনো হিংসা বা উগ্রতার জায়গা দেয় না। মুসলমানরা সর্বদা শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের অধিকার আদায়ের চেষ্টা করেছে এবং ভবিষ্যতেও তাই করবে।”
১৯৯১ সালের উপাসনালয় আইন: উপেক্ষিত একটি গুরুত্বপূর্ণ আইন
১৯৯১ সালে ভারতে পাশ হওয়া উপাসনালয় আইন (Places of Worship Act, 1991) অনুযায়ী, ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট যে ধর্মীয় উপাসনালয় যেভাবে ছিল, সেভাবেই তার অবস্থান বহাল থাকবে—কোনো পক্ষ তা পরিবর্তন করতে পারবে না। আইনে শুধুমাত্র বাবরি মসজিদ-বিতর্ককে এই আইনের আওতামুক্ত রাখা হয়।
কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কাশী, মথুরা, হড়হড়িয়া, তাজিয়া বাড়ি সহ বিভিন্ন স্থানে মসজিদ-মন্দির নিয়ে নতুন করে মামলা তোলা হয়েছে। এসব মামলায় আদালত বারবার শুনানি নিচ্ছে—যা মাদানীর মতে, ১৯৯১ সালের আইনের বিরোধী।
তিনি বলেন,
“সব আদালত সুপ্রিম নয়। সুপ্রিম কোর্ট যদি সংবিধান রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তাকে সর্বোচ্চ আদালত বলা যাবে না। উপাসনালয় আইন থাকা সত্ত্বেও নানান মামলা গ্রহণ করা হচ্ছে—এটা খুবই উদ্বেগজনক।”
ভারতে মুসলমানদের বর্তমান পরিস্থিতি: এক বিস্তৃত চিত্র
মাদানীর বক্তব্য ভারতের সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও সংখ্যালঘুদের বিষয়ে রাজনৈতিক অবস্থানের প্রেক্ষাপটে নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে ভারতের সংখ্যালঘুদের অস্থিরতা, নিরাপত্তাহীনতা এবং বৈষম্যের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে।
১. মুসলিম নাগরিকত্ব ও পরিচয় সংকট
সাম্প্রতিক সময়ে এনআরসি, সিএএ, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ আইন প্রস্তাব, গোরক্ষক বাহিনীর হামলা ইত্যাদি ঘটনা মুসলমানদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
২. ধর্মীয় স্বাধীনতা কমে যাওয়া
বিভিন্ন রাজ্যে গরু জবাই, ধর্মান্তর নিষিদ্ধ আইন, মসজিদ ইস্যু, আজান ও পোশাক সংক্রান্ত বিতর্ক—এসব কারণে মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
৩. রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব কমছে
ভারতের সংসদ ও রাজ্য বিধানসভায় মুসলিম প্রতিনিধিত্ব গত দুই দশকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
৪. সামাজিক বৈষম্য ও বিদ্বেষমূলক প্রচারণা
মৌলবাদী সংগঠনগুলোর উগ্র বক্তব্য, সোশ্যাল মিডিয়া প্রচারণা এবং ঘৃণাত্মক ভাষণ (হেট স্পিচ) মুসলিমদের দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করছে।
জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের অবস্থান ও ভূমিকা
ভারতের অন্যতম বৃহৎ ইসলামি সংগঠন জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ ঐতিহাসিকভাবে দেশের স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে শুরু করে সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সংগঠনটি সর্বদা ধর্মীয় সহিষ্ণুতা, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পক্ষে।
মাওলানা মাহমুদ মাদানী বর্তমানে সংখ্যালঘুদের অধিকারের পক্ষে সোচ্চার কণ্ঠ হিসেবে পরিচিত। তিনি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, শিক্ষা ও সামাজিক মর্যাদা বিষয়ে মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষায় দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছেন।
ভারতের ভবিষ্যত ধর্মনিরপেক্ষতার উপর নির্ভর করছে
মাদানীর বক্তব্য ভারতীয় সমাজে নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে:
ভারত কি সংবিধানের চেতনা ধরে রাখতে পারবে?
সংখ্যালঘুরা কি ন্যায়বিচার পাবেন?
বিচার বিভাগ কি রাজনৈতিক চাপ থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করবে?
এই প্রশ্নগুলো শুধু মুসলমানদের নয়—সমগ্র ভারতের গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং বহুত্ববাদী পরিচয় রক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি মনে করিয়ে দেন,
“ভারত একটি মহান দেশ। কিন্তু একটি দেশের মহত্ত্ব বজায় থাকে তখনই, যখন সেখানে প্রত্যেক নাগরিক সমান অধিকার, ন্যায়বিচার ও সম্মান পান। সংবিধানকে রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব।”
MAH – 14065 I Signalbd.com



