বিশ্ব

ভারতের মুর্শিদাবাদে চার মুসলিমকে জয় শ্রীরাম স্লোগান দিতে বাধ্য করল উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা

Advertisement

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে চারজন মুসলিম পরিযায়ী শ্রমিককে উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা জোরপূর্বক ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দিতে বাধ্য করেছে। এই ঘটনার খবর প্রকাশিত হয়েছে ভারতীয় গণমাধ্যম পুবের কলমের প্রতিবেদনে। বিষয়টি স্থানীয় জনমনে আতঙ্ক এবং উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

ঘটনাবলি

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত শুক্রবার (২৮ নভেম্বর) মুর্শিদাবাদের চার পরিযায়ী শ্রমিক ওড়িশার দিকে ফেরি করতে যান। এ সময় তারা গঞ্জাম জেলার রানিপাড়া এলাকায় পৌঁছালে স্থানীয় কিছু উগ্র হিন্দুত্ববাদী, বিশেষত বজরং দলের সদস্যরা, তাদের লক্ষ্যবস্তু করে হামলা চালায়। হামলার প্রধান কারণ হিসেবে জানানো হয়, তারা বাংলায় কথা বলছিল এবং মুসলিম পরিচয় বহন করছিল।

হামলার সময় শ্রমিকদের মারধর করা হয় এবং তাদের ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দিতে বাধ্য করা হয়। আহত অবস্থায় তারা আতঙ্কে বাড়ি ফিরতে বাধ্য হন। এই ঘটনায় সবচেয়ে গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন ২২ বছর বয়সী রুহুল শেখ

রুহুলের সহকর্মী নাহিদ সরকার জানান, হামলা কেবল তাদের বাংলায় কথা বলার কারণে নয়, মুসলিম পরিচয়ের কারণে তাদের টার্গেট করা হয়েছিল। হামলাকারীরা শ্রমিকদের এলাকা ছাড়ার হুমকি দেন এবং স্থানীয়দের কাছে সাহায্য চাওয়ার সুযোগও দেওয়া হয়নি।

রুহুলের কাকা সুখচাঁদ শেখ অভিযোগ করেন, এই ঘটনার ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। আহত শ্রমিকরা স্থানীয় পুলিশ ও জনপ্রতিনিধিদের কাছে সাহায্য চেয়েও কোনো কার্যকর প্রতিকার পাননি।

পরিযায়ী শ্রমিকদের প্রতি হামলার প্যাটার্ন

ভারতে বাঙালি মুসলিম পরিযায়ী শ্রমিকরা প্রায়ই এই ধরনের হামলার শিকার হন। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ এবং ওড়িশা অঞ্চলে, যেখানে ধর্মীয় ও ভাষাগত বৈষম্য থেকে এ ধরনের হামলার ঘটনা নিয়মিত ঘটে।

পরিযায়ী ঐক্য পরিষদ এই ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। তারা জানিয়েছেন, দেশের বিভিন্ন রাজ্যে বারবার বাঙালি শ্রমিকদের উপর এমন হামলা উদ্বেগজনক এবং তা দ্রুত সমাধান করার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে দাবি জানানো হবে।

সামাজিক প্রেক্ষাপট

ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং হিন্দুত্ববাদী শক্তির ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে এ ধরনের ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে। বিশেষ করে ছোট শহর ও গ্রামের মানুষদের উপর উগ্রপন্থীদের প্রভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে। শ্রমিকরা, যারা সাধারণত নিম্নপদস্থ বা সেবা-মূলক কাজ করেন, তারা এই ধরণের ধর্মীয় ও জাতিগত নির্যাতনের শিকার হন।

এছাড়া, সামাজিক মিডিয়ার ব্যবহারও এই পরিস্থিতিকে ত্বরান্বিত করছে। হামলার ভিডিও দ্রুত ভাইরাল হয় এবং এটি স্থানীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে নিন্দা ও সমালোচনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

নিরাপত্তা এবং প্রশাসনের ভূমিকা

এই ধরনের ঘটনার পর স্থানীয় প্রশাসন প্রায়শই যথাযথ ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়। রুহুলসহ আহত শ্রমিকরা পুলিশ ও জনপ্রতিনিধির কাছে সহায়তার জন্য আবেদন করেও কোনো কার্যকর প্রতিকার পাননি। এই ধরনের অবহেলা শ্রমিক সমাজের মধ্যে আতঙ্ক এবং নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তৈরি করে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পরিযায়ী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। স্থানীয় পুলিশ ও প্রশাসনকে এই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধের জন্য বিশেষ নজরদারি বাড়াতে হবে।

ইতিহাসে এর আগের ঘটনা

ভারতে ধর্মীয় ও ভাষাগত সংখ্যালঘুদের উপর হামলার ঘটনা নতুন নয়। এর আগেও পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ এবং ওড়িশার বিভিন্ন অঞ্চলে শ্রমিক ও স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের উপর হামলার অভিযোগ এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে, হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর প্রভাব এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনা এই ধরনের ঘটনার জন্য প্রেক্ষাপট তৈরি করে।

সমাজ ও মানবাধিকার সংস্থার প্রতিক্রিয়া

মানবাধিকার সংস্থা এবং এনজিও এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তারা বলছে, ধর্মীয় পরিচয় বা ভাষার কারণে কাউকে হামলার শিকার করা অসম্ভব। সামাজিক সংহতি বজায় রাখতে এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

শিক্ষার্থীদের ও কর্মজীবীদের জন্য প্রভাব

পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর এমন ঘটনা শিক্ষার্থী ও কর্মজীবীদের জন্যও সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করছে। ধর্মীয়, ভাষাগত বা জাতিগত বৈষম্যের কারণে যে কেউ হুমকির মুখে পড়তে পারে, এটি সমাজের জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয়।

পরবর্তী করণীয়

১. কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে: শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
২. পুলিশ ও প্রশাসনের দায়িত্ব: স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর নজরদারি ও জরুরি প্রতিকার ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
৩. সচেতনতা সৃষ্টি: সামাজিক মিডিয়া এবং গণমাধ্যমের মাধ্যমে ধর্ম ও ভাষা নির্বিশেষে মানুষকে সংহতি ও সহমর্মিতার বার্তা দেওয়া।
৪. পরিযায়ী শ্রমিকদের সুরক্ষা: তাদের জন্য আশ্রয় কেন্দ্র, জরুরি হটলাইন এবং সহায়তা ব্যবস্থা তৈরি করা।

মুর্শিদাবাদের এই ঘটনায় ভারতের সমাজে ধর্মীয় সহমর্মিতা ও মানবাধিকারের প্রশ্নকে নতুনভাবে সামনে এনেছে। ধর্মীয় পরিচয় এবং ভাষার ভিত্তিতে কাউকে ভয় দেখানো, মারধর করা বা মানসিক নিগ্রহ করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এই ঘটনা শুধু ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের নয়, বরং পুরো সমাজের জন্য একটি সতর্কবার্তা যে, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

পরিযায়ী শ্রমিকদের প্রতি সহানুভূতি, সংহতি এবং মানবাধিকার রক্ষা করা আমাদের সামাজিক দায়িত্ব। মুর্শিদাবাদের ঘটনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে, সকল নাগরিকের প্রতি সমান মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং স্বাধীনতার নিশ্চয়তা প্রদানের জন্য সক্রিয় পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

MAH – 14058 I Signalbd.com

মন্তব্য করুন
Advertisement

Related Articles

Back to top button