বিশ্ব

ইউনিফর্ম-ব্যাগ-বই কিছুই নেই, জোড়াতালি দেয়া পোশাকে স্কুলে যাচ্ছে গাজার শিশুরা

Advertisement

গাজার যুদ্ধবিধ্বস্ত রাস্তায় কাঁধে ব্যাগ নেই, নেই বই বা ইউনিফর্ম। পরনে ছেঁড়া জামা আর জোড়াতালি দেওয়া প্যান্ট। এরপরেও প্রতিদিন ধ্বংসস্তূপ পেরিয়ে অস্থায়ী স্কুলে যাচ্ছে গাজার শিশুরা। ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধ বন্ধের পর এই শিশুরা আবার পড়ালেখার সুযোগ পাওয়ায় খুশি, তবে তাদের এই পথচলা বেঁচে থাকার লড়াইয়ের মাঝেও এক কঠিন বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। আল-লুলুয়া আল-কাতামি স্কুলের মতো অস্থায়ী শিক্ষাকেন্দ্রগুলোতে শিশুরা ফিরলেও তাদের শ্রেণিকক্ষ এখন ভাঙা ভবনের ভেতরে টাঙানো তাঁবু। শিক্ষা উপকরণ, চেয়ার-টেবিল, এমনকি পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ ও পানিরও তীব্র সংকট সেখানে। জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনআরডব্লিউএ) এবং স্থানীয় উদ্যোগে এই শিশুদের শিক্ষাজীবন ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।

ধ্বংসস্তূপের মাঝে আশার আলো: স্কুলে ফেরার যাত্রা

১১ বছরের লাইয়ান হাজি গাজা সিটির ভাঙা রাস্তায় প্রায় আধা ঘণ্টা হেঁটে প্রতিদিন অস্থায়ী স্কুলে যায়। চারপাশে শুধু ধ্বংসস্তূপ দেখে তার মন খারাপ হলেও, আবার পড়ালেখা শুরু করতে পারায় সে খুশি। তার মতো শিশুরা বেঁচে থাকার কঠিন সংগ্রামেও আশার আলো খুঁজছে। লাইয়ান জানিয়েছে, সে বড় হয়ে ডাক্তার হতে চায়।

দুই বছর ধরে চলা ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধ বন্ধের পর গাজার শিশুদের জন্য কিছু স্কুল আবার খুলেছে। আল-লুলুয়া আল-কাতামি স্কুলে লাইয়ানের মতো প্রায় নয়শো শিক্ষার্থী পড়াশোনা শুরু করেছে। এই স্কুলে ফিরতে পারা শিশুদের জন্য এক বিশাল স্বস্তি, কারণ জীবনের মৌলিক চাহিদা পূরণের লড়াইয়ের মাঝেও তারা শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে।

শিক্ষা উপকরণের অভাব ও করুণ বাস্তবতা

এই স্কুলগুলো এখন আর আগের মতো নেই। বোমা হামলায় লাইব্রেরি ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থীদের হাতে বই নেই, খাতাও নেই। স্কুলের দেয়াল ও করিডোরে নেই কোনো রঙ বা আঁকিবুঁকি। ভাঙা স্কুল ভবনের ভেতরে টাঙানো তাঁবুগুলোই এখন তাদের শ্রেণিকক্ষ।

১৬ বছরের সাঈদ শেলদানও স্কুলে ফিরতে পেরে আনন্দিত। তবে লাইয়ানের মতো তার কাছেও কোনো শিক্ষা উপকরণ নেই। এমনকি স্কুলে চেয়ার-টেবিল, বিদ্যুৎ কিংবা পানিরও পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। শেলদান জানায়, প্রতিদিন সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে তাকে পানি সংগ্রহ করতে হয় এবং রুটির জন্য লাইনে দাঁড়াতে হয়। যুদ্ধের মধ্যে তার পরিবারকে কমপক্ষে ১০ বার বাড়িঘর ছাড়তে হয়েছে এবং বর্তমানে তাদের কোনো স্থায়ী বাড়ি নেই। এই শিশুদের জন্য ক্লাস শুরুর আগে খাবার ও পানির সংস্থান করাই প্রধান কাজ।

ইউএনআরডব্লিউএ এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ

প্রায় এক মাস আগে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ এবং গাজার শিক্ষা মন্ত্রণালয় যৌথভাবে ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণমুক্ত এলাকাগুলোর শিশুদের ধীরে ধীরে স্কুলে ফেরানোর উদ্যোগ নিয়েছে। গাজার এই স্কুলগুলো মূলত যুদ্ধকালীন সময়ে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। এখন ইউএনআরডব্লিউএ সেখানে অস্থায়ী শিক্ষাকেন্দ্র খুলেছে।

গত মাসে সংস্থার প্রধান ফিলিপ লাজারিনি জানান, ইতোমধ্যে ২৫ হাজার শিশু পড়াশোনা শুরু করেছে এবং আরও তিন লাখ শিশু অনলাইনে ক্লাস করবে। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী গাজায় মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা সাত লাখ ৫৮ হাজারেরও বেশি, যার অর্থ বিপুল সংখ্যক শিশু এখনও শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত।

কঠিন শ্রম ও মানসিক চাপ

স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা ইমান আল-হিনাওয়ি আশা করছেন, খুব শিগগিরই বিনামূল্যে বই ও অন্যান্য সামগ্রী সরবরাহ করা সম্ভব হবে। তবে তিনি আক্ষেপ করে জানান, যুদ্ধে পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী নিহত হওয়ার কারণে গাজার অনেক শিশু এখন ‘কঠোর শ্রম’ করতে বাধ্য হচ্ছে। জাতিসংঘ যেখানে দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করেছিল, সেই অঞ্চলের শিশুরা এখনও কাঠ কুড়ায়, পানি সংগ্রহ করে, এমনকি খাবারের জন্য লাইনেও দাঁড়ায়।

এএফপি সংবাদদাতারা সরেজমিনে ঘুরে দেখেছেন, অসংখ্য শিশু প্লাস্টিকের বালতি, পুরনো হাঁড়ি কিংবা শুধু প্লেট হাতে খাবার সংগ্রহ করছে, যা তাদের চরম মানসিক চাপ ও উদ্বেগজনক জীবনযাত্রার ইঙ্গিত দেয়। স্কুলের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফয়সাল আল-কাসাস বলেন, শিশুরা সবসময়ই রুটি ও পানির সংগ্রহের লাইনের চিন্তায় মগ্ন থাকে।

মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য নতুন শিক্ষণ পদ্ধতি

শিক্ষার্থীদের ওপর যুদ্ধের তীব্র মানসিক চাপ কমাতে স্কুলগুলোতে নতুন শিক্ষণ পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। তাদের খেলাধুলার মাধ্যমে পড়ানো হচ্ছে। মেয়েরা নাচের প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে গণিত সমাধান করছে এবং কেউবা অভিনয় করে কবিতা আবৃত্তি করছে। এই পদ্ধতি শিশুদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার এবং মানসিক চাপ মোকাবিলার একটি কার্যকর উপায় হিসেবে কাজ করছে। শিক্ষকরা শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতির ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছেন।

পুনর্নির্মাণের চ্যালেঞ্জ ও আন্তর্জাতিক সহায়তা

গাজার শিক্ষাব্যবস্থার অবকাঠামোগত ক্ষতি মারাত্মক। এখানকার ৯৭ শতাংশ স্কুল কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেগুলোর বেশিরভাগেরই পুনর্নির্মাণ বা বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন। ইসরায়েলের দাবি, হামাস যোদ্ধারা এসব স্থাপনায় লুকিয়ে ছিল, যদিও এসব স্থানে আশ্রয় নেওয়া বহু ফিলিস্তিনি ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছেন।

দক্ষিণ গাজার আল-মাওয়াসি এলাকায় আন্তর্জাতিক সহায়তা এবং স্থানীয় উদ্যোগে শিশুদের স্কুলে ফেরানোর চেষ্টা চলছে। ‘এডুকেশন অ্যাবাব অল ফাউন্ডেশন’ নামে কাতার ‘রিবিল্ডিং হোপ ফর গাজা’ কর্মসূচি চালু করেছে। এই কর্মসূচির লক্ষ্য ১ লাখের বেশি শিক্ষার্থীকে সহায়তা দেওয়া। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে স্কুল নির্মাণ সামগ্রী বিতরণ, ইন্টারনেট ও বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, মানসিক সহায়তা দেওয়া। আল-মাওয়াসির একটি স্কুলে আপাতত আরবি, ইংরেজি, গণিত ও বিজ্ঞান এই চার বিষয় পড়ানো হচ্ছে। ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যুক্ত হাযেম আবু হাবিব বলেছেন, ‘প্রাথমিক কোর্স দিয়ে শুরু হলেও আমরা যত বেশি সম্ভব শিক্ষার্থীকে পড়াশোনায় ফিরিয়ে আনতে চাই।’

যুদ্ধের আগে গাজা নিরক্ষরমুক্ত ছিল, কিন্তু এখন শিক্ষাই সবচেয়ে বড় সংকটের মুখে পড়েছে। এই মানবিক সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদী এবং ব্যাপক আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অপরিহার্য।

এম আর এম – ২৪১৫,Signalbd.com

মন্তব্য করুন
Advertisement

Related Articles

Back to top button