বিশ্ব

কৃষ্ণসাগরে রাশিয়ার দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে বিস্ফোরণ

Advertisement

কৃষ্ণসাগরে তুরস্ক উপকূলের কাছে রাশিয়ার দুটি তেলবাহী ট্যাংকার জাহাজে রহস্যজনক বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার (২৮ নভেম্বর) স্থানীয় সময় পরপর এই বিস্ফোরণের পর ‘কাইরোস’ ও ‘ভিরাট’ নামের জাহাজ দুটিতে দ্রুত আগুন ধরে যায়। তুরস্কের কোস্টগার্ড তাৎক্ষণিকভাবে অভিযান চালিয়ে দুটি জাহাজের মোট ৪৫ জন ক্রুকে নিরাপদে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। বিস্ফোরণের কারণ এখনও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি, তবে তুরস্কের মেরিটাইম কর্তৃপক্ষ এটিকে ‘হামলার শিকার’ বলে উল্লেখ করেছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা রাশিয়ার ‘শ্যাডো ফ্লিট’-এর অংশ এই জাহাজগুলোতে হামলার ঘটনা কৃষ্ণসাগরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে এবং অঞ্চলজুড়ে উচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

বিস্ফোরণের ঘটনা ও উদ্ধার অভিযান

তুরস্কের পরিবহন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শুক্রবার কৃষ্ণসাগরে তুরস্কের কোজায়েলি উপকূল থেকে প্রায় ২৮ নটিক্যাল মাইল দূরে প্রথম বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে গাম্বিয়ার পতাকাবাহী ২৭৪ মিটার লম্বা ট্যাংকার কাইরোস-এ। মিশর থেকে রাশিয়ার নোভোরোসিস্ক বন্দরের দিকে খালি অবস্থায় যাচ্ছিল এই ট্যাংকারটি। বিস্ফোরণের পরপরই আগুন ধরে যায়। তুর্কি কর্তৃপক্ষ দ্রুত দুটি দ্রুতগতির উদ্ধার নৌযান, একটি টাগবোট এবং একটি জরুরি সহায়তা জাহাজ ঘটনাস্থলে পাঠায় এবং কাইরোসের নাবিকদের নিরাপদে উদ্ধার করে।

প্রথম ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পরেই প্রায় ৩৫ নটিক্যাল মাইল দূরে ভিরাট নামের আরেকটি ট্যাংকারে আগুন ধরে যাওয়ার খবর পাওয়া যায়। তুরস্কের মেরিটাইম কর্তৃপক্ষ এই দ্বিতীয় ঘটনাটিকে সরাসরি ‘হামলার শিকার’ বলে উল্লেখ করেছে। যদিও দুটি জাহাজেই আগুন লাগার কারণ ও আক্রমণের উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য এখনও প্রকাশ করা হয়নি। দুটি জাহাজের মোট ৪৫ জন ক্রুকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।

রাশিয়ার ‘শ্যাডো ফ্লিট’ এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা

বিস্ফোরণের শিকার কাইরোস ও ভিরাট ট্যাংকার দুটিই রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত ‘শ্যাডো ফ্লিট’-এর অংশ। এই বহরটি মূলত রাশিয়ার তেল বাণিজ্যের ওপর দেওয়া আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়াতে বিভিন্ন দেশের পতাকা ব্যবহার করে এবং মালিকানা গোপন রাখে। এই কৌশল ব্যবহার করে রাশিয়া নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহ করে চলেছে।

এই দুটি জাহাজই আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে। ভিরাট ট্যাংকারটিকে যুক্তরাষ্ট্র এ বছরের জানুয়ারিতে নিষিদ্ধের তালিকায় তোলে। এরপর ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড ও কানাডাও এটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। অন্যদিকে, কাইরোস জাহাজটিকে ইইউ জুলাই মাসে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে, পরে যার সঙ্গে যুক্ত হয় যুক্তরাজ্য ও সুইজারল্যান্ড। নিষেধাজ্ঞার শিকার এই গুরুত্বপূর্ণ ট্যাংকারগুলোতে বিস্ফোরণের ঘটনাটি আন্তর্জাতিক মহলে গভীর তাৎপর্য বহন করছে।

বিস্ফোরণের কারণ: বহিরাগত আঘাতের ইঙ্গিত

তুরস্কের মেরিটাইম কর্তৃপক্ষ দুটি ট্যাংকারে বিস্ফোরণের কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত না হলেও, প্রথম বিস্ফোরণের পেছনে ‘বহিরাগত আঘাতের ইঙ্গিত’ পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে। তবে এই আঘাতের প্রকৃতি কী, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। তুরস্কের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে, এই বহিরাগত আঘাতটি নৌ-মাইন, সমুদ্রের পানিতে ভেসে থাকা যুদ্ধবিধ্বস্ত বিস্ফোরক, নাকি লক্ষ্যভেদী কোনো দূর নিয়ন্ত্রিত হামলা, তা এই মুহূর্তে পরিষ্কার নয়।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কৃষ্ণসাগরে চলমান যুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মাইন ভেসে বেড়ানোর ঘটনা বাড়তে থাকায় এই অঞ্চলে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি এমনিতেই বেড়ে গিয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে দুটি নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত তেল ট্যাংকারে পরপর বিস্ফোরণ কোনো দুর্ঘটনা না হয়ে সুপরিকল্পিত হামলা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এই হামলার উদ্দেশ্য আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বলবৎ করা হতে পারে অথবা রাশিয়ার তেল সরবরাহকে বাধাগ্রস্ত করা হতে পারে।

কৃষ্ণসাগরের ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের পটভূমি

কৃষ্ণসাগর অঞ্চলটি ইউক্রেন-রাশিয়া সংঘাতের কারণে গত কয়েক বছর ধরে অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। ইউক্রেন রাশিয়াকে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করতে কৃষ্ণসাগরে রাশিয়ার নৌ-সরবরাহ লাইন এবং সমুদ্রপথে তেল বাণিজ্যের ওপর হামলা চালাচ্ছে। অন্যদিকে, রাশিয়াও কৃষ্ণসাগরের মাধ্যমে শস্য পরিবহন এবং সামরিক স্থাপনাগুলোতে পাল্টা আক্রমণ করছে।

এই ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের কারণেই কৃষ্ণসাগরে মাইন এবং সামরিক ধ্বংসাবশেষ ভেসে বেড়ানোর ঘটনা বেড়েছে। তুরস্ক, যা কৃষ্ণসাগর ও বসফরাস প্রণালীর নিয়ন্ত্রক, এই অঞ্চলে যেকোনো ধরনের উত্তেজনা বৃদ্ধির বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক। সাম্প্রতিক এই বিস্ফোরণের পর তুরস্কের বসফরাসের আশপাশে জাহাজ চলাচলে নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে।

এই ঘটনার প্রভাব ও আঞ্চলিক সতর্কতা

কৃষ্ণসাগরে দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে বিস্ফোরণের ঘটনাটি আন্তর্জাতিক তেল সরবরাহ চেইন এবং সমুদ্রপথে নিরাপত্তার ওপর বড় প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যেহেতু এই জাহাজগুলো ‘শ্যাডো ফ্লিট’-এর অংশ, তাই এই ধরনের আক্রমণের ফলে অন্যান্য নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত জাহাজগুলো আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে এবং তাদের বিমা খরচ ও অপারেটিং ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে। এর ফলে রাশিয়ার তেল রপ্তানি আরও কঠিন হতে পারে।

এই ঘটনার পর কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে উচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। তুরস্কের সামরিক ও নৌ-কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। সমুদ্রপথে চলাচলকারী অন্যান্য জাহাজকে সতর্ক থাকতে এবং কোনো প্রকার সন্দেহজনক বস্তু বা কার্যকলাপ দেখতে পেলে তাৎক্ষণিকভাবে কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এটি স্পষ্ট যে, কৃষ্ণসাগর এখন বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য একটি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে গণ্য হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক তদন্তের প্রয়োজনীয়তা

ঘটনার প্রকৃতি বিশ্লেষণ করে আন্তর্জাতিক মেরিটাইম নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা এই বিস্ফোরণের একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ ও নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন। বিস্ফোরণের উৎস যদি সুনির্দিষ্টভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাতকারী কোনো ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলা হয়, তবে তা কৃষ্ণসাগরের সংঘাতকে আরও নতুন ও বিপজ্জনক মোড় দেবে। অন্যদিকে, যদি ভেসে আসা মাইনের কারণে দুর্ঘটনা ঘটে থাকে, তবে এই অঞ্চলে মাইন অপসারণের জরুরি ব্যবস্থা নিতে হবে। দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ উন্মোচন করা এবং এই ধরনের ঘটনা পুনরাবৃত্তি রোধে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

এম আর এম – ২৪১০,Signalbd.com

মন্তব্য করুন
Advertisement

Related Articles

Back to top button