বিশ্ব

আফগান যুদ্ধবিরতি অকার্যকর: সীমান্ত উত্তেজনা বাড়ছে, পাকিস্তানের দাবি

Advertisement

দক্ষিণ এশিয়ার জটিল ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান–আফগানিস্তান সম্পর্ক আবারও টানাপোড়েনে পড়েছে। ইসলামাবাদ জানিয়েছে, দুই দেশের মধ্যে ঘোষিত যুদ্ধবিরতি কার্যকর হচ্ছে না। পাকিস্তানের দাবি—যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও আফগান নাগরিকদের সম্পৃক্ততায় তাদের ভেতরে হামলা অব্যাহত রয়েছে।

শুক্রবার (২৮ নভেম্বর) ইসলামাবাদে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি উত্থাপন করেন পাকিস্তান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, পাকিস্তান বর্তমানে শুধু নিরাপত্তা সংকট নয়, পাশাপাশি কূটনৈতিক চাপেও আছে।

যুদ্ধবিরতি“ বলতে পাকিস্তান কী বুঝিয়েছে?

তাহির আন্দ্রাবি জানান, পাকিস্তান–আফগানিস্তান যুদ্ধবিরতির ধারণাটি ছিল মূলত সন্ত্রাসী হামলা বন্ধের একটি বোঝাপড়া, দুই রাষ্ট্রের মধ্যে প্রচলিত সামরিক যুদ্ধবিরতি নয়।

তিনি বলেন—

“পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি বলতে দুটি যুদ্ধরত রাষ্ট্রের মধ্যকার প্রচলিত যুদ্ধবিরতি বোঝায় না। এর অর্থ ছিল— আফগানিস্তান-সমর্থিত সন্ত্রাসী গোষ্ঠী বা তাদের প্রতিনিধিরা (প্রক্সি) পাকিস্তানের ভেতরে কোনো সন্ত্রাসী হামলা চালাবে না।”

অর্থাৎ সরকারিভাবে যাকে যুদ্ধবিরতি বলা হয়েছে, বাস্তবে তা ছিল সন্ত্রাসী হামলা বন্ধে আফগানিস্তান সরকারের অঙ্গীকার

কিন্তু পাকিস্তান বলছে—এই অঙ্গীকার পূরণ হয়নি।

যুদ্ধবিরতির পরও বড় হামলা—পাকিস্তানের উদ্বেগ বাড়ছে

পাকিস্তানের অভিযোগ অনুযায়ী, বোঝাপড়া হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই পাকিস্তানের বিভিন্ন শহরে বড় ধরনের হামলা ঘটেছে। আন্দ্রাবি বলেন—

“যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরও পাকিস্তানের ভেতরে বড় বড় সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে। এর পেছনে আফগান নাগরিকদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে।”

ইসলামাবাদ, কোয়েটা, খাইবার পাখতুনখোয়া—সব জায়গায় হামলার ধারা

পাকিস্তানের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর তথ্য:

  • সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইসলামাবাদে নজিরবিহীন নিরাপত্তা কড়াকড়ি সত্ত্বেও হামলা বৃদ্ধি পেয়েছে।
  • খাইবার পাখতুনখোয়া সীমান্তবর্তী এলাকায় পাকিস্তানি সেনা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপর হামলা বেড়েছে।
  • বেলুচিস্তানেও সন্ত্রাসী তৎপরতা নতুন করে মাথাচাড়া দিচ্ছে।

পাকিস্তানের দাবি, বেশ কিছু হামলায় আফগান পাসপোর্টধারী বা অবৈধভাবে পাকিস্তানে প্রবেশ করা ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতা মিলেছে।

তালেবান কি টিটিপিকে নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ?

পাকিস্তানের অভিযোগের কেন্দ্রে মূলত তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)। ইসলামাবাদের ধারণা, আফগানিস্তানের মাটির বড় একটি অংশ এখনও টিটিপির ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

তালেবান সরকার অনেকবার টিটিপিকে নিয়ন্ত্রণে আনার প্রতিশ্রুতি দিলেও, পাকিস্তান বলছে—

  • আফগানিস্তান এখনও টিটিপিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি
  • টিটিপি পাকিস্তানের অভ্যন্তরে পুনর্গঠিত হচ্ছে
  • আফগানিস্তানের ভেতর থেকেই পাকিস্তানে ঢুকে হামলা চালানো হচ্ছে

আন্দ্রাবির বক্তব্যে এ হতাশা স্পষ্ট:

“ইসলামাবাদসহ বিভিন্ন স্থানে আফগান নাগরিকদের সম্পৃক্ততায় সংঘটিত হামলাগুলো পাকিস্তানের জন্য যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়ন নিয়ে খুব বেশি আশাবাদী হওয়া কঠিন করে তুলছে।”

সীমান্ত উত্তেজনা: তোরখাম ও চমন বন্দর বারবার বন্ধ

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পাকিস্তান–আফগানিস্তান সীমান্তে উত্তেজনা নতুন কিছু নয়।
বিশেষ করে তোরখাম ও চমন সীমান্তে একাধিকবার সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।

সীমান্তে ঘটে যাওয়া উল্লেখযোগ্য ঘটনা:

  • সীমান্তে গোলাগুলিতে উভয় পক্ষের নিহত
  • আফগান ব্যবসায়ী ও যাত্রীদের আটকে যাওয়া
  • বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহনে স্থবিরতা
  • বন্দর বন্ধ থাকায় উভয় দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত

এ উত্তেজনার কারণে দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাস আরও গভীর হচ্ছে।

আফগানিস্তানের নীরবতা—ক্যাবুলের অবস্থান কী?

আফগানিস্তানের অন্তর্বর্তী তালেবান সরকার এখন পর্যন্ত পাকিস্তানের অভিযোগের আনুষ্ঠানিক জবাব দেয়নি।
তবে পূর্বের বিবৃতিতে তারা সবসময়ই দাবি করে এসেছে—

  • আফগানিস্তানের মাটিতে কোনো বিদেশি গোষ্ঠীকে প্রশ্রয় দেওয়া হয় না
  • পাকিস্তানের অভিযোগ ভিত্তিহীন
  • কাবুল চায় শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে

তালেবান আরও দাবি করে—

  • সীমান্তে উত্তেজনার জন্য পাকিস্তান নিজেই দায়ী
  • সীমান্তে নতুন বেড়া নির্মাণ ও কঠোর নজরদারি আফগান জনগণের স্বাভাবিক চলাচলে বাধা তৈরি করছে

এই পাল্টাপাল্টি বক্তব্যেই স্পষ্ট—দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক অত্যন্ত নাজুক।

আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ—দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা হুমকিতে

আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাকিস্তান–আফগান উত্তেজনা শুধু দুই দেশেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং—

  • দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা
  • মধ্য এশিয়ার বাণিজ্য করিডর
  • চীন–পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (CPEC)
  • আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবিরোধী প্রচেষ্টা

সবকিছুর উপর এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে।

জাতিসংঘ ইতিমধ্যে আফগানিস্তানের ভেতর সক্রিয় বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে:

  • আফগানিস্তানের পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি
  • সীমান্ত উত্তেজনা বাড়লে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো আরও সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে

পাকিস্তানের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে

পাকিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি অবনতির ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনেও চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বিরোধী দলগুলো অভিযোগ করছে—

  • সরকার সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ
  • তালেবানের সঙ্গে যোগাযোগে দুর্বল কূটনীতি
  • আফগান শরণার্থীদের যথাযথ নজরদারি নেই

এদিকে, সরকার বলছে—

  • সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চলছে
  • আফগানিস্তানের কাছে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার দায়িত্ব প্রধানত তাদেরই

শরণার্থী ইস্যু: নতুন বিতর্ক

পাকিস্তানে আনুমানিক ৩৫ লাখের বেশি আফগান শরণার্থী রয়েছে—এদের অনেকেই ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর এসেছে।

পাকিস্তান সরকার সাম্প্রতিক মাসগুলোতে:

  • অবৈধ শরণার্থীদের দেশে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে
  • সীমান্ত পারাপারে কঠোরতা বাড়িয়েছে
  • আফগান শরণার্থীদের বায়োমেট্রিক নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করেছে

আন্দ্রাবির বক্তব্য থেকেও বোঝা যায়—হামলায় আফগান নাগরিকদের জড়িত থাকার অভিযোগের কারণে পাকিস্তান শরণার্থী ইস্যুতে আরও কঠোর হতে পারে।

ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি কোন দিকে?

বিশ্লেষকদের মতে:

  • দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাস চরমে
  • রাজনৈতিক-সামরিক যোগাযোগ সীমিত
  • সীমান্তে স্থায়ী সমাধান দূরবর্তী
  • সন্ত্রাসী হামলা বন্ধ না হলে যুদ্ধবিরতি বিপর্যস্তই থাকবে

তবে উভয় দেশের অর্থনীতি এবং মানুষের স্বাভাবিক জীবন–যাপন শান্তি ছাড়া টেকসই হতে পারে না

অনেক বিশেষজ্ঞই মনে করেন—
টেকসই সমাধানের জন্য দরকার—একটি শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিকভাবে নিরীক্ষিত নিরাপত্তা সহযোগিতা কাঠামো, যেখানে:

  • তালেবান সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেবে
  • পাকিস্তান শরণার্থী ইস্যুতে মানবিক অবস্থান বজায় রাখবে
  • সীমান্তে যৌথ টহল বা তথ্য বিনিময় বাড়ানো হবে

কিন্তু রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এই পথ সহজ নয়।

পাকিস্তান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে—আফগানিস্তানের সঙ্গে ঘোষিত যুদ্ধবিরতি কার্যকর নয় এবং হামলার ধারাবাহিকতা তাদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করছে।
অন্যদিকে আফগানিস্তানের নীরবতা ও পূর্বের পাল্টা অভিযোগ ইঙ্গিত দেয়—দুই দেশের সম্পর্ক এখন নতুন এক অস্থিতিশীল পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এই উত্তেজনার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে অনেক দূর পর্যন্ত গড়াতে পারে।
মানুষের জীবন, সীমান্ত বাণিজ্য, অর্থনীতি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা—সবই এই সংকটের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে—তা নির্ভর করছে দুই দেশের কূটনৈতিক সদিচ্ছা, সন্ত্রাসবিরোধী পদক্ষেপ এবং আন্তর্জাতিক মহলের সক্রিয় ভূমিকার উপর।

MAH – 14047 I Signalbd.com

মন্তব্য করুন
Advertisement

Related Articles

Back to top button