ইউক্রেনে রাশিয়ার নতুন করে চালানো রাতভর হামলায় দেশটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্তত তিনজন নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। হামলার কারণে প্রায় ছয় লাখের মতো পরিবার বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে। যুদ্ধবিরতি ও শান্তি আলোচনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইউক্রেন ও মিত্র দেশগুলোর আলোচনা চলার মাঝেই এ হামলা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
বিস্তারিত: ক্ষেপণাস্ত্র ও শতাধিক ড্রোন ব্যবহার
ইউক্রেনীয় সামরিক কর্মকর্তাদের দাবি, রাশিয়া এই হামলায় ব্যাপক আক্রমণাত্মক কৌশল ব্যবহার করেছে। তারা জানায়, গভীর রাতে বিভিন্ন অঞ্চলে ৩০টির বেশি ক্ষেপণাস্ত্র এবং কয়েকশো ড্রোন ছোড়া হয়। লক্ষ্যবস্তু করা হয় বিদ্যুৎকেন্দ্র, সাবস্টেশন, সরকারি স্থাপনা এবং আবাসিক এলাকাসহ বেসামরিক অবকাঠামো।
রাজধানী কিয়েভে বিস্ফোরণের শব্দে রাতজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। জরুরি পরিষেবা জানায়, ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলোর ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধার করতে রাতভর অভিযান চালানো হয়েছে। তিন শিশুসহ ১৮ জনকে উদ্ধার করা হয়। মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
যুদ্ধের চার বছর পরও আক্রমণের ঘনত্ব কমেনি
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া ইউক্রেনে আগ্রাসন শুরুর পর থেকে দেশটি নিয়মিত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার শিকার হচ্ছে। বিশেষ করে শীতকালে বিদ্যুৎ অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো রাশিয়ার অন্যতম কৌশল।
বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করে ইউক্রেনের জীবনযাত্রা ও অর্থনৈতিক স্থবিরতা তৈরি করা রাশিয়ার দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। এর আগে গত শীতেও একই ধরনের সাইবার ও ড্রোন হামলার ফলে ইউক্রেনের কিছু এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং চলেছিল।
বর্তমান পরিস্থিতি সেই উত্তেজনাকেই আবারও নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে, যখন শান্তি আলোচনার সম্ভাবনা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছিল।
বিদ্যুৎহীন লাখো পরিবার ও মানবিক সংকট
ইউক্রেনের জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানায়, হামলার কারণে অন্তত ছয় লাখ পরিবার অন্ধকারে রয়েছে। বহু সাবস্টেশন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কিয়েভ, লভিভ, খারকিভ ও দনিপ্রোর বড় অংশে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে।
রাজধানী কিয়েভে অনেক পরিবার দিনে মাত্র ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাচ্ছে। হাসপাতাল, স্কুল ও জরুরি পরিষেবাগুলো জেনারেটরের ওপর নির্ভর করছে।
মানবিক সহায়তাদানকারী সংস্থাগুলো বলছে, শীতের সময় এমন পরিস্থিতিতে বয়স্ক এবং শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। গরম কাপড়, চিকিৎসা এবং খাদ্য সরবরাহ নিয়ে সংকট তৈরি হতে পারে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও দায়িত্ব অস্বীকারের চেষ্টা
ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, সবাই যখন শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করছে, তখন রাশিয়া আবারও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশ হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেছে, এ ধরনের হামলা আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার লঙ্ঘন।
রাশিয়ার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, তারা শুধু সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। বেসামরিক এলাকায় হামলার অভিযোগ অস্বীকার করে তারা বলে, ইউক্রেনই নিজেদের স্থাপনা রক্ষায় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গোলারোধ ব্যবহার করে দুর্ঘটনা ঘটিয়ে থাকে।
তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, উপগ্রহচিত্র ও ক্ষয়ক্ষতির তথ্য ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে।
যুদ্ধের বর্তমান অবস্থা
গত চার বছরে সংঘাতে হাজার হাজার মানুষ নিহত এবং লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। জাতিসংঘের তথ্য মতে, ইউক্রেনের অবকাঠামোর কমপক্ষে ৩০ শতাংশ বড় ধরনের ক্ষতির শিকার।
বিশেষ করে জ্বালানি খাত বারবার হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়ায় দেশটির বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা অর্ধেকে নেমেছে।
ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনীর দাবি, এবারকার হামলা ছিল চলতি বছরের সবচেয়ে বড় আক্রমণগুলোর একটি।
শান্তি আলোচনার মাঝেই উত্তেজনার নতুন রূপ
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ায় উভয় পক্ষই এখন কৌশলগত সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করছে। রাশিয়া হয়তো চাপ বাড়াতে চায়, যাতে আলোচনার টেবিলে সুবিধা পাওয়া যায়।
ইউক্রেনের জন্য এই পরিস্থিতি কঠিন। তারা শান্তি চাইলেও ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়ার শর্ত মানতে রাজি নয়। আবার জোটে যোগদানের বিষয়ে রাশিয়ার আপত্তি তাদের জন্য ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা অনিশ্চিত করে তুলছে।
এই অবস্থায় রাতভর হামলা শুধু সামরিক চাপ নয়, বরং রাজনৈতিক বার্তাও বহন করছে বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
“রাশিয়া যখন ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে, আমরা তখনো শান্তি চাইছি। কিন্তু শান্তি মানে আত্মসমর্পণ নয়।” — একজন ইউক্রেনীয় কর্মকর্তা
ইউক্রেনে রাতভর রাশিয়ার ব্যাপক হামলা যুদ্ধের চার বছরের পুরোনো বাস্তবতা আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়া লাখো পরিবার এবং হাসপাতাল থেকে স্কুল পর্যন্ত বিপর্যস্ত অবকাঠামো মানবিক সংকটকে আরও ঘনীভূত করতে পারে।
আন্তর্জাতিক মহল শান্তি চাইলেও চলমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, সংঘাতের সমাধানের পথ এখনো দীর্ঘ এবং অনিশ্চিত।
এম আর এম – ২৪০৩,Signalbd.com



