আফগানিস্তানের ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী মোল্লা আবদুল গনি বারাদার সম্প্রতি ঘোষণা করেছেন যে, আফগানিস্তান যেকোনো বৈদেশিক আগ্রাসনের মুখোমুখি হওয়ার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। তিনি বলেন, আফগান সরকার দেশের সীমানা এবং ভূ-রাজনৈতিক অখণ্ডতা রক্ষায় দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
কাবুলে জাতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিশেষ কমান্ডো বাহিনীর সনদ বিতরণ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখার সময় মোল্লা বারাদার বলেন, “আমাদের দেশ এবং সীমানা রক্ষার জন্য আমরা সর্বদা প্রস্তুত। আফগান জনগণ ও আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী একত্রে যে কোনও ধরনের আগ্রাসনের জবাব দিতে সক্ষম।”
তিনি আরও বলেন, বর্তমান ইসলামী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে “শহীদদের ত্যাগের মাধ্যমে”। এটি আফগানদের জন্য গর্বের বিষয় এবং দেশের অখণ্ডতা রক্ষায় প্রতিটি নাগরিকের দায়বদ্ধতা রয়েছে।
আফগানিস্তানের সীমানা রক্ষা ও সামরিক প্রস্তুতি
মোল্লা বারাদারের বক্তব্যের মূল বিষয় হলো আফগানিস্তানের সীমানা ও নিরাপত্তা বজায় রাখা। তিনি সতর্ক করে বলেন, “কেউ আমাদের ভূমির দিকে কুদৃষ্টি দেবেন না। আফগানদের ধৈর্যও পরীক্ষা করবেন না। আমরা কাউকেই আমাদের ভূখণ্ড লঙ্ঘন করতে দেব না। যেকোনো ধরনের আগ্রাসনের জবাব দিতে আমরা প্রস্তুত।”
এই মন্তব্যগুলো আফগানিস্তানের সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে আফগানিস্তান এবং পাকিস্তানের মধ্যে সীমান্ত সংলগ্ন অঞ্চলে সংঘর্ষ ও বিমান হামলার ঘটনা ঘটেছে, যা দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।
ডুরান্ড লাইন, যা আফগানিস্তান ও পাকিস্তানকে বিভক্ত করে, সেই সীমান্ত অঞ্চলে নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং সম্ভাব্য সংঘাত এড়িয়ে চলা আফগান নিরাপত্তা বাহিনীর প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। মোল্লা বারাদার এই প্রসঙ্গে বলেন, “আমরা সীমানার প্রতি সম্মান দেখাতে এবং সব দেশের সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্ক বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে, আমাদের ভূখণ্ডে কেউ অনুপ্রবেশ করলে তার জবাব দিতে আমরা পিছপা হব না।”
আফগান নিরাপত্তা বাহিনীর শক্তি ও প্রস্তুতি
আফগানিস্তানের ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী বিশেষভাবে দেশের নিরাপত্তা বাহিনী এবং কমান্ডো ইউনিটের প্রশিক্ষণ ও প্রস্তুতির প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, “আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী আধুনিক প্রশিক্ষণ ও সজ্জা নিয়ে যেকোনো আক্রমণ প্রতিহত করতে সক্ষম। তারা দেশের শত্রুদের জন্য প্রতিরোধের প্রথম রেখা।”
তিনি আরও জানান, সাম্প্রতিক কমান্ডো ইউনিটের সনদ বিতরণ অনুষ্ঠান একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, যা নিরাপত্তা বাহিনীর মান উন্নয়ন ও তাদের কর্মকাণ্ডে উদ্যম যোগায়। মোল্লা বারাদার বলেন, “প্রতিটি কমান্ডো যোদ্ধা দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং সাহসিকতার প্রতীক। তাদের প্রশিক্ষণ দেশের সীমানা রক্ষা ও জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”
আফগানিস্তান ও পাকিস্তান: উত্তেজনার পটভূমি
সম্প্রতি আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে সীমান্ত উত্তেজনা বেড়েছে। বিশেষ করে ডুরান্ড লাইনের কাছাকাছি এলাকায় সংঘর্ষ এবং বিমান হামলার ঘটনা দুই দেশের সম্পর্ককে প্রভাবিত করেছে।
পাকিস্তান-আফগান সীমান্ত প্রায় ২,৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ। এই সীমান্ত এলাকার নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তা দুদেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। সীমান্ত এলাকা প্রায়শই সন্ত্রাসী কার্যকলাপ, ত্রাণ ও সামরিক লড়াইয়ের কারণে উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। মোল্লা বারাদারের বক্তব্যের মাধ্যমে স্পষ্ট যে, আফগানিস্তান সীমান্ত সংরক্ষণে এবং সম্ভাব্য সংঘাত প্রতিহত করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা রেখেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আফগান সরকারের এই কঠোর বার্তা মূলত পাকিস্তান এবং অন্যান্য প্রতিবেশী দেশকে সতর্ক করার উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছে। তারা বলছেন, “আফগানিস্তান আন্তর্জাতিকভাবে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। তবে দেশের সীমানা ও নিরাপত্তা রক্ষার ক্ষেত্রে তারা কোনো আপোষ করবে না।”
আফগান সরকারের বর্তমান নীতি ও নিরাপত্তা দৃষ্টিভঙ্গি
ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী মোল্লা বারাদারের বক্তব্য আফগান সরকারের বর্তমান নীতির প্রতিফলন। আফগান সরকার দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তি, নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সমন্বয় করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, “আমরা চাই সব প্রতিবেশী দেশ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আমাদের ভূখণ্ডকে সম্মান জানাক। আফগান জনগণ শান্তি ও সমৃদ্ধি চাই। তবে, আমাদের সীমানা লঙ্ঘন হলে আমরা দমন করতে পিছপা হব না।”
আফগান সরকারের নীতি হলো কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা, শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং দেশের প্রতিরক্ষা শক্তি উন্নয়ন করা। এই নীতি অনুযায়ী, আফগান সরকার সামরিক, কূটনৈতিক এবং অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে দেশ রক্ষা করছে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট
আফগানিস্তান স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশগুলো এবং ইসলামিক বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন আফগান সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আফগান সরকারের এই কঠোর বার্তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সংকেত দেয় যে আফগানিস্তান শান্তি ও সহযোগিতা চায়, কিন্তু তার ভূখণ্ড ও জনগণকে যে কোনও আগ্রাসন থেকে রক্ষা করতে পিছপা হবে না।
সীমানা রক্ষা: আফগান নিরাপত্তা বাহিনীর চ্যালেঞ্জ
ডুরান্ড লাইনের নিকটবর্তী অঞ্চলগুলো আফগান নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য চ্যালেঞ্জের জায়গা। এখানে পাহাড়ি অঞ্চল, জঙ্গলের বিস্তার এবং সীমান্তপথের অসুবিধার কারণে নিরাপত্তা বজায় রাখা কঠিন।
মোল্লা বারাদার বলেন, “আমরা সীমান্তে আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষিত নিরাপত্তা বাহিনী ব্যবহার করছি। আমাদের উদ্দেশ্য হলো কোনো আগ্রাসন প্রতিহত করা এবং দেশের নিরাপত্তা বজায় রাখা।”
তিনি আরও জানান, নিরাপত্তা বাহিনী নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং যুদ্ধ কৌশলের উন্নয়ন করছে। এটি আফগানিস্তানের সীমানা রক্ষা এবং সম্ভাব্য সংঘাত এড়িয়ে চলার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আফগান জনগণের প্রতিক্রিয়া
আফগান নাগরিকরা সাধারণত সরকারের এই কঠোর অবস্থানকে সমর্থন করছে। তারা মনে করেন যে দেশের সীমানা ও নিরাপত্তা রক্ষা করা প্রত্যেক আফগানের দায়িত্ব।
এক আফগান নাগরিক বলেন, “আমরা চাই আমাদের দেশ শান্তিতে থাকুক। কিন্তু যদি কেউ আমাদের উপর আক্রমণ করে, তাহলে আমরা সাড়া দেব। আমাদের সরকার এবং নিরাপত্তা বাহিনী আমাদের জন্য সবসময় প্রস্তুত।”
মোল্লা আবদুল গনি বারাদারের এই বক্তব্য স্পষ্ট করে দিয়েছে যে আফগান সরকার দেশের সীমানা রক্ষা এবং সম্ভাব্য যেকোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে আফগানিস্তান শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে চাইছে, তবে দেশের নিরাপত্তা ও ভূখণ্ডের অখণ্ডতা রক্ষা করার জন্য প্রস্তুত।
আফগান সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনী দেশের শত্রুদের জন্য প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে কাজ করছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সতর্কবার্তা দিচ্ছে যে আফগানিস্তানের সীমানা লঙ্ঘন করা মানে আন্তর্জাতিক আইন ও নীতি লঙ্ঘন করা।
MAH – 14035 I Signalbd.com



