বিশ্ব

ইসরাইলি কারাগারে নির্যাতন, মারধরের পর দৃষ্টি হারান ফিলিস্তিনি আবু ফাউল

Advertisement

ইসরাইলি কারাগারে নির্যাতনের শিকার এক ফিলিস্তিনি যুবক দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছেন বলে জানিয়েছেন মুক্তির পর।

২৮ বছর বয়সী মাহমুদ আবু ফাউল বলেন, দীর্ঘ আট মাস ইসরাইলি কারাগারে অমানবিক নির্যাতন ও মারধরের পর তিনি সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে গেছেন। মার্কিন মধ্যস্থতায় সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হিসেবে গত সপ্তাহে মুক্তি পান এই ফিলিস্তিনি বন্দি।

ইসরাইলি কারাগারে অমানবিক নির্যাতনের শিকার আবু ফাউল

উত্তর গাজার বেইত লাহিয়ার বাসিন্দা আবু ফাউলকে গত বছরের ডিসেম্বরে কামাল আদওয়ান হাসপাতাল থেকে আটক করে ইসরাইলি বাহিনী। এরপর তাকে দক্ষিণ ইসরাইলের কুখ্যাত সাদে তেইমান আটক কেন্দ্রে নেওয়া হয়।

তিনি আল জাজিরাকে বলেন,

“কারাগারে প্রবেশের পর থেকেই আমাকে প্রতিদিন নির্যাতন করা হতো। রক্ষীরা আমার মাথায়, মুখে ও পিঠে আঘাত করত। একদিন এমনভাবে মাথায় আঘাত করে যে আমি অজ্ঞান হয়ে যাই। জ্ঞান ফেরার পর দেখি আমি কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।”

তার দাবি, তিনি বারবার চিকিৎসার জন্য আবেদন করেছিলেন, কিন্তু কর্তৃপক্ষ পাত্তা দেয়নি। “তারা আমাকে শুধু চোখের ড্রপ দিয়েছিল, যা কোনো কাজ করেনি,” বলেন আবু ফাউল।

মুক্তির পর মায়ের কণ্ঠ শুনলেন, কিন্তু মুখ দেখলেন না

মুক্তির পর গাজার নাসের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আবু ফাউল বলেন, “আমি আমার মাকে জড়িয়ে ধরেছিলাম, কিন্তু তাকে দেখতে পারিনি। কেবল তার কণ্ঠস্বর শুনতে পেরেছিলাম, সেটাই এখন আমার পৃথিবীর সবকিছু।”

তিনি বর্তমানে গাজার ধ্বংসস্তূপের পাশে একটি তাঁবুতে বসবাস করছেন। চোখের চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার অনুমতি ও সহায়তা আশা করছেন তিনি।

নির্যাতনের সাক্ষ্য দিচ্ছে আরও শতাধিক বন্দি

আবু ফাউলের ঘটনা একক নয়। সাম্প্রতিক সময়ে মুক্তি পাওয়া আরও শতাধিক ফিলিস্তিনি বন্দি একই ধরনের নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন। কারাগার থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত অনেকের শরীরে আঘাতের স্পষ্ট চিহ্ন দেখা গেছে, অনেকে গুরুতরভাবে অসুস্থ।

ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি অন্তত ১০০ ফিলিস্তিনি বন্দির মৃতদেহ ফিরিয়ে দিয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, বেশিরভাগ মৃতদেহে মারধর, পোড়ানো ও শ্বাসরোধের স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে।

জাতিসংঘের তথ্যমতে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরাইলি হেফাজতে অন্তত ৭৫ জন ফিলিস্তিনি বন্দির মৃত্যু হয়েছে।

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন ও নিন্দা

ফিলিস্তিনি মানবাধিকার কেন্দ্র (PCHR) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইসরাইলি কারাগারগুলোতে “পদ্ধতিগত নির্যাতন” চলছে, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন লঙ্ঘন করছে। সংস্থাটি ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত আটক ১০০ জন সাবেক বন্দির সাক্ষ্য নথিভুক্ত করেছে, যাদের সবাই মারধর, ঘুমের বঞ্চনা, ক্ষুধার্ত রাখা ও চিকিৎসা না দেওয়ার মতো নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

ইসরাইলি মানবাধিকার সংগঠন বেতসেলেমও বলেছে, “ইসরাইলি কারাগারগুলো এখন মূলত নির্যাতন শিবিরে পরিণত হয়েছে।” সংস্থাটি আরও দাবি করে, অনেক বন্দিকে যৌন নিপীড়ন, জোরপূর্বক নগ্ন করা ও অপমানের মুখোমুখি হতে হয়।

সাদে তেইমান কারাগার: ফিলিস্তিনিদের কাছে ‘মানুষ ভাঙার কারাগার’

যে সাদে তেইমান আটক কেন্দ্রে আবু ফাউল ছিলেন, সেটিকে অনেক বন্দি “মানুষ ভাঙার কারাগার” বলে আখ্যা দেন। এখানেই নিয়মিতভাবে মারধর, খাদ্য বঞ্চনা ও মানসিক নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

গত বছর এই একই কারাগারে এক ফিলিস্তিনি বন্দিকে প্রহরীরা গণধর্ষণ করে বলে স্থানীয় গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। ভিডিও প্রমাণে দেখা যায়, প্রহরীরা ঢাল দিয়ে ক্যামেরা আড়াল করে ভুক্তভোগীর ওপর হামলা চালায়।

ইসরাইলি সরকারের প্রতিক্রিয়া

ইসরাইল এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো প্রমাণ বা তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি। ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতমার বেন–গভির বলেন, “এখন থেকে সন্ত্রাসীদের জন্য গ্রীষ্মকালীন শিবির নয়, কঠোর শাস্তি হবে।”

মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই মন্তব্যকে ‘রাষ্ট্রীয় সহিংসতার বৈধতা’ হিসেবে সমালোচনা করেছে। তারা বলছে, এ ধরনের বক্তব্য ইসরাইলি নিরাপত্তা বাহিনীকে আরও নির্মম হতে উৎসাহিত করছে।

এটি মানবিক বিপর্যয়ের স্পষ্ট ইঙ্গিত

মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসরাইলি কারাগারগুলোর ভেতর যা ঘটছে তা মানবাধিকারের ঘোর লঙ্ঘন।

একজন বিশেষজ্ঞ বলেন, “আবু ফাউলের মতো ঘটনার সংখ্যা বাড়ছে, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং রাষ্ট্রীয়ভাবে অনুমোদিত নির্যাতনের অংশ।”

জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনারও সাম্প্রতিক এক বিবৃতিতে বলেন, “ইসরাইলি কারাগারে নির্যাতন ও মৃত্যুর ঘটনা তাৎক্ষণিকভাবে স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত দাবি করে।”

ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় ফিলিস্তিনিরা

আবু ফাউলের মতো শত শত ফিলিস্তিনি বন্দি আজও চিকিৎসা ও ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় আছেন। তাদের কেউ দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন, কেউ পঙ্গু হয়েছেন, কেউ হারিয়েছেন জীবন।

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি দ্রুত পদক্ষেপ না নেয়, তবে এই নির্যাতনের মাত্রা আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে।

ইসরাইলি কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া আবু ফাউলের শেষ কথায় ফুটে উঠেছে ফিলিস্তিনিদের মর্মবেদনা — “আমি চোখে দেখতে পাই না, কিন্তু আমি জানি, আমার জাতি এখনো অন্ধকারে বন্দি।”

এম আর এম – ১৮২৩,Signalbd.com

মন্তব্য করুন
Advertisement

Related Articles

Back to top button