বিশ্ব

ডেথ সেলে ইমরান খান, পরিবারের কাছে নেই বেঁচে থাকার কোনো প্রমাণ

Advertisement

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পিটিআই চেয়ারম্যান ইমরান খানকে নিয়ে নতুন করে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে সারাদেশে। রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে তাকে ‘ডেথ সেল’-এ রাখা হয়েছে—এমন অভিযোগের পাশাপাশি তার শারীরিক অবস্থা ও জীবিত থাকা নিয়ে জোরদার সন্দেহ তৈরি হয়েছে। কারাগার কর্তৃপক্ষের দাবি একরকম হলেও পরিবার বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। বিশেষ করে ইমরানের ছোট ছেলে কাসিম খান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন—পরিবারের কাছে কোনো প্রমাণ নেই যে ইমরান খান এখনো জীবিত আছেন।

এই ঘটনার পর পাকিস্তানের রাজনৈতিক অঙ্গনে যেন উত্তাল ঝড় নেমেছে। কারাগারের বাইরে পিটিআই নেতাকর্মীদের বিশাল সমাবেশ, নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর তৎপরতা, পরিবারের ওপর হামলার অভিযোগ এবং সরকারের রহস্যময় নীরবতা—সব মিলিয়ে দেশজুড়ে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

কারাগারে দেখা করতে না দিয়ে রহস্য বাড়াচ্ছে কর্তৃপক্ষ

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ইমরান খানের তিন বোন বারবার আদিয়ালা কারাগারে গিয়ে সাক্ষাতের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু প্রতিবারই তাদের সাক্ষাৎ–অনুরোধ ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কারাগারের বাইরে অবস্থানরত তার দুই বোনের ওপর নিরাপত্তা বাহিনী হামলাও চালিয়েছে। তারা বলছেন—

“আমাদের ভাইকে দেখার অনুমতি না দেওয়া এবং আমাদের ওপর হামলা—দুটোই ইচ্ছাকৃতভাবে করা হচ্ছে।”

এদিকে কারা কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে ইমরান খান কারাগারের ভেতরেই নিরাপদ, তাকে কোথাও স্থানান্তর করা হয়নি এবং তিনি চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন। কিন্তু পরিবার এবং দলের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে—এই দাবি প্রমাণহীন, এবং সরকারের কথার ওপর বিশ্বাস করা যাচ্ছে না।

কাসিমের বিস্ফোরক অভিযোগ: ‘বেঁচে থাকার কোনো প্রমাণ নেই’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স–এ কাসিম খান এক দীর্ঘ বিবৃতিতে লিখেছেন—

“বাবা ৮৪৫ দিন ধরে কারাগারে। গত ছয় সপ্তাহ ধরে তাকে কোনো ধরনের স্বচ্ছতা ছাড়া ‘ডেথ সেল’-এ এককভাবে বন্দি রাখা হয়েছে। আদালতে স্পষ্ট আদেশ থাকা সত্ত্বেও তার বোনদের সাক্ষাৎ–অনুরোধ বাতিল করা হয়েছে। কোনো ফোন কল নেই, কোনো সাক্ষাৎ নেই—এমনকি বেঁচে থাকারও কোনো প্রমাণ নেই।”

তার মতে, পাকিস্তান সরকার একটি “সম্পূর্ণ ব্ল্যাকআউট” পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যা কোনো নিরাপত্তা প্রটোকল নয় বরং ইমরান খানের প্রকৃত অবস্থা গোপন করার কৌশল।

কাসিম আরও বলেন—

“আমি আর আমার ভাই বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারিনি। আমাদের কাছ থেকে বাবার অবস্থা গোপন রাখা হচ্ছে।”

এটি ছিল তার প্রথম প্রকাশ্য ও কঠোর বক্তব্য, কারণ এতদিন তিনি পাকিস্তানের রাজনীতি থেকে দূরে ছিলেন এবং বিদেশেই অবস্থান করছিলেন।

ইমরান খানের দীর্ঘ কারাবাসের পটভূমি

ইমরান খানের বিরুদ্ধে মামলার দীর্ঘ তালিকা নতুন নয়। ঘটনা শুরু ২০২২ সালের এপ্রিলে অনাস্থা ভোটে ক্ষমতা হারানোর পর। এরপর তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, বিদেশি রাষ্ট্রের গোপন নথি ফাঁস, সেনাবাহিনীর সদর দপ্তরে হামলা উসকে দেওয়া, এমনকি রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ আনা হয়।

২০২৩ সালের প্রথম দিকে তাকে নাটকীয়ভাবে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তিনি একবার মুক্তি পেলেও আবার গ্রেপ্তার হন এবং ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে এখন পর্যন্ত কারাগারেই আছেন। পরিবারের দাবি, গত ছয় সপ্তাহ ধরে তাকে ডেথ সেল–এ রাখা হয়েছে, যেখানে সাধারণত মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের রাখা হয়। বিশিষ্ট আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন—এটি একটি মানবাধিকার লঙ্ঘন, কারণ কোনো বন্দিকে আদালতের অনুমতি ছাড়া এমন সেলে স্থানান্তর করা যায় না।

কারাগারকে ঘিরে উত্তেজনা: পিটিআই সমর্থকদের ঢল

ইমরানের জীবিত থাকার প্রমাণ না পাওয়ার পর থেকেই আদিয়ালা কারাগারের আশপাশে উত্তেজনা বাড়ছে। হাজার হাজার পিটিআই সমর্থক কারাগারের গেটে জড়ো হয়েছেন। তাদের অনেকে দাবি করছেন—

“সরকার হয়তো ইমরান খানের সঙ্গে কোনো অঘটন ঘটিয়েছে এবং এখন সেটি আড়াল করার চেষ্টা করছে।”

এদিকে স্থানীয় প্রশাসন দ্রুত বড় আকারের নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। রাওয়ালপিন্ডির বিভিন্ন এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক সীমিত করা, শান্তিপ্রিয় সমাবেশ ভাঙতে লাঠিচার্জ ও টিয়ারগ্যাস ছোড়ার ঘটনাও ঘটেছে। কয়েকজন পিটিআই কর্মীকে আটক করা হয়েছে বলেও জানা গেছে।

সরকারের দাবি—‘বিশেষ সুবিধা’ দেওয়া হচ্ছে

পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ সংবাদমাধ্যমে বলেছেন—

“ইমরান খান কারাগারে সর্বোচ্চ সুবিধা পাচ্ছেন। তার স্বাস্থ্য ভালো এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে।”

কিন্তু এই বক্তব্যকে অনেকে রাজনৈতিক বিবৃতি বলেই মনে করছেন। কারণ পরিবারকে যখন সাক্ষাৎ করতে দেওয়া হচ্ছে না, তখন সরকারের কোনো বক্তব্যই নিরপেক্ষ মনে হচ্ছে না।

মানবাধিকার কমিশন অব পাকিস্তান (এইচআরসিপি) জানিয়েছে—

“স্বচ্ছতার অভাব জনমনে সন্দেহ সৃষ্টি করছে। ইমরান খানের অবস্থান ও স্বাস্থ্য সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য প্রকাশ করা জরুরি।”

আন্তর্জাতিক মহলের আগ্রহ বাড়ছে

ইমরান খানের অবস্থানকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমও সরব হয়েছে। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা—এই তিন দেশের একাধিক মানবাধিকার সংস্থা ইতোমধ্যেই পাকিস্তান সরকারের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে।

কাসিম তার পোস্টে বিশ্বকে উদ্দেশ্য করে লিখেছেন—

“আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অনুরোধ করছি—তারা যেন পাকিস্তান সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে বাবার সঙ্গে পরিবারের সাক্ষাৎ নিশ্চিত করে। তার বেঁচে থাকার প্রমাণ দেখানো হোক। তাকে ‘ডেথ সেল’ থেকে সরিয়ে সাধারণ সেলে ফিরিয়ে আনা হোক।”

অনেক আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ও সরকারের মধ্যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এখন এতটাই জটিল যে ইমরান খানের অবস্থান দেশটির ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় ভূমিকা রাখে। তাই তাকে ঘিরে রহস্য বাড়ানো হতে পারে রাজনৈতিক কৌশলও।

বিশেষজ্ঞদের মতামত: কেন ‘ডেথ সেল’ বিতর্ক ভয়াবহ হয়ে উঠছে

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. শাহিদ জাভেদ বলেন—

“একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে ডেথ সেলে একঘরে রাখা বিরল ঘটনা। স্বচ্ছতার অভাব, সাক্ষাৎ নিষেধাজ্ঞা ও সরকারের নীরবতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।”

এদিকে আইন বিশেষজ্ঞ সামি ইবরার বলেন—

“যদি সত্যিই সাক্ষাৎ বন্ধ করে রাখা হয়, তাহলে এটি আইনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। আদালতের আদেশ অমান্য করা কোনো সরকারেরই উচিত নয়।”

অনেকে মনে করছেন, ইমরান খান দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হওয়ায় তার বিরুদ্ধে প্রতিটি পদক্ষেপই পাকিস্তানের রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলছে। পিটিআই–কে দুর্বল করার কৌশল হিসেবে তাকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হচ্ছে।

পিটিআই নেতাদের দাবি—”ইমরান খানের ওপর রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন চলছে”

পিটিআইয়ের বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা অভিযোগ তুলেছেন—

“সরকার ও সামরিক প্রতিষ্ঠানের যৌথ কৌশলে ইমরানকে অন্ধকারে রাখা হচ্ছে। তার সঙ্গে কি ঘটছে তা জাতির কাছে প্রকাশ করতে তারা ভয় পাচ্ছে।”

তারা আরও বলেন—

“ইমরান খান যদি সুস্থ ও নিরাপদ থাকতেন, তাহলে পরিবারকে দেখা করতে দেওয়ার কথা। সরকার সাক্ষাৎ বন্ধ রেখে নিজেদের উদ্দেশ্য প্রমাণ করছে।”

ডেথ সেল: কী এবং কেন বিতর্ক?

পাকিস্তানে ‘ডেথ সেল’ বলতে সাধারণত এমন একটি পৃথক কারা–কক্ষকে বোঝানো হয় যেখানে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের রাখা হয়। এ কক্ষগুলো সাধারণত ছোট, আলো–বাতাস কম প্রবেশ করে, নিরাপত্তাব্যবস্থা বেশি এবং বন্দি মানসিক চাপে থাকে।

ইমরান খানের মতো একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে সেখানে রাখা হলে তা—

১. আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের পরিপন্থী
২. রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হতে পারে
৩. বন্দির শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির আশঙ্কা বাড়ায়

তাই পরিবার, দল, মানবাধিকার সংগঠন—সকলেই বিষয়টি নিয়ে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন।

জনমনে শঙ্কা: ‘ইমরান খানের কি কিছু ঘটেছে?’

ইমরানের দীর্ঘ নীরবতা, কোনো ছবি বা ভিডিও প্রকাশ না হওয়া, সাক্ষাৎ না দেওয়া—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় হাজার হাজার পোস্ট ঘুরছে—

“ইমরান খান কি সত্যিই সুস্থ?”
“কেন তিনি কোনো ভিডিও বার্তা দিচ্ছেন না?”
“কেন সাক্ষাৎ দিতে ভয় পাচ্ছে সরকার?”

এমনকি কিছু আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকও বলছেন—

“পরিস্থিতি অস্বাভাবিক ও সন্দেহজনক।”

সবশেষে প্রশ্ন—ইমরান খান কোথায় এবং কেমন আছেন?

সরকার বলছে—তিনি সুস্থ।
পরিবার বলছে—কোনো প্রমাণ নেই।
পিটিআই বলছে—সরকার সত্য গোপন করছে।
মানবাধিকার সংগঠন বলছে—স্বচ্ছতা আনুন।

এ অবস্থায় পাকিস্তানের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতার প্রকৃত অবস্থান নিয়ে রহস্য ঘনীভূত হচ্ছে।
দেশজুড়ে উত্তাল পরিস্থিতির মধ্যেও সরকারি নীরবতা আরও প্রশ্ন তৈরি করছে।

আন্তর্জাতিক মহল ইতোমধ্যেই নজর রাখছে।
পাকিস্তানের জনগণ অপেক্ষা করছে—কবে এই অন্ধকার কেটে যাবে এবং ইমরান খানের প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ পাবে।

MAH – 14032 I Signalbd.com

মন্তব্য করুন
Advertisement

Related Articles

Back to top button