বিশ্ব

আইসিজেতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার মামলায় যোগ দিয়েছে ব্রাজিল

Advertisement

নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগ শহরে অবস্থিত আন্তর্জাতিক বিচার আদালত—আইসিজে—ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি মঞ্চে পরিণত হয়েছে। সেখানে দক্ষিণ আফ্রিকার দায়ের করা মামলায় এবার অফিসিয়ালি যুক্ত হলো ব্রাজিল।

দক্ষিণ আফ্রিকা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তুলেছে তা অত্যন্ত গুরুতর—গণহত্যা। তাদের দাবি, গাজা উপত্যকা ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েল যেভাবে সামরিক অভিযান চালাচ্ছে, তা জাতিসংঘ স্বীকৃত ১৯৪৮ সালের গণহত্যা সনদের সরাসরি লঙ্ঘন।

জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে ব্রাজিলও আন্তর্জাতিক আইন রক্ষার অংশীদার। সে কারণেই তারা আইসিজে বিধির ৬৩ নম্বর অনুচ্ছেদ ব্যবহার করে মামলায় অংশগ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে। ব্রাজিলের মতে, ন্যায়বিচারের অভাব ও ইসরায়েলের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতা কেবল ফিলিস্তিনি জনগণের জন্যই নয়, গোটা বিশ্বব্যাপী আইনের শাসনের জন্যও হুমকি।

কেন গুরুত্বপূর্ণ ব্রাজিলের যোগদান?

বিশ্বের সবচেয়ে বড় লাতিন আমেরিকান দেশ হিসেবে ব্রাজিলের রাজনৈতিক অবস্থান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তাদের অংশগ্রহণ দক্ষিণ আফ্রিকার দাবিকে আরও শক্তিশালী করছে। কারণ, ইতিমধ্যেই স্পেন, আয়ারল্যান্ড, মেক্সিকো, তুরস্কসহ একাধিক দেশ দক্ষিণ আফ্রিকার পাশে দাঁড়িয়েছে।

ব্রাজিল দীর্ঘদিন ধরেই ফিলিস্তিন প্রশ্নে একটি দৃঢ় অবস্থান নিয়ে এসেছে। তারা ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং জাতিসংঘে ফিলিস্তিনের পূর্ণ সদস্যপদ সমর্থন করেছে। এবার আইসিজে মামলায় যোগদানের মাধ্যমে তারা দেখিয়ে দিল, আন্তর্জাতিক আইন রক্ষায় ব্রাজিল কেবল কূটনৈতিক সমর্থনেই নয়, আইনগত লড়াইটিও সমান গুরুত্ব দিচ্ছে।

দক্ষিণ আফ্রিকার অভিযোগ: ‘গণহত্যা’

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় নতুন করে যে সংঘাত শুরু হয়েছে, তা ইতিহাসের ভয়াবহতম এক মানবিক বিপর্যয় তৈরি করেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার আইনি দল বলছে, মাত্র কয়েক মাসে ৬৫,০০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে, যার মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য।

তাদের মতে, ইসরায়েল শুধু সামরিক টার্গেট নয়, বরং হাসপাতাল, স্কুল, শরণার্থী শিবির ও খাদ্য সরবরাহ কেন্দ্র পর্যন্ত বোমা হামলা চালিয়েছে। এর ফলে লাখ লাখ মানুষ গৃহহীন হয়েছে, খাদ্য ও ওষুধের ঘাটতিতে মানবিক সংকট চরমে পৌঁছেছে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থাগুলিও একাধিকবার ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গের অভিযোগে সতর্ক করেছে। যদিও ইসরায়েল সব অভিযোগ অস্বীকার করেছে, তারা বলছে—তাদের অভিযান শুধুমাত্র “সন্ত্রাসী সংগঠন হামাসের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ”।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

ইসরায়েলের বিরুদ্ধে এই মামলায় যে সব দেশ দক্ষিণ আফ্রিকার পক্ষে দাঁড়িয়েছে, তারা সবাই বিশ্বাস করে যে, বিশ্ব আইনের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ না হলে ভবিষ্যতে আর কোনো রাষ্ট্রই নিরাপদ থাকবে না।

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেছেন, “মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের কোনো অজুহাত থাকতে পারে না।”
আয়ারল্যান্ডও একইভাবে বলেছে, “গাজায় যা ঘটছে, তা মানবতার বিবেককে নাড়া দিচ্ছে।”
তুরস্কও প্রকাশ্যে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে “রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ” বলে উল্লেখ করেছে।

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা ইতিমধ্যেই গাজা সংকট নিয়ে জাতিসংঘে জোরালো বক্তব্য রেখেছিলেন। এবার আইসিজে মামলায় যুক্ত হয়ে তিনি সেই অবস্থানকে আরও শক্ত করলেন।

ইসরায়েলের অবস্থান

অন্যদিকে ইসরায়েল বলছে, দক্ষিণ আফ্রিকার আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তাদের দাবি, আইসিজে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে বিচার করছে এবং এতে সন্ত্রাসী সংগঠন হামাস উপকৃত হবে।

ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ বলছে, “আমরা গণহত্যা করছি না, বরং নিজেদের নাগরিকদের বাঁচানোর জন্য লড়াই করছি। হামাস গাজাকে ব্যবহার করছে যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে। আমরা বাধ্য হচ্ছি প্রতিরোধ করতে।”

তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ মনে করছে, গণহত্যা হোক বা না হোক—ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডে স্পষ্টভাবেই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও যুদ্ধকালীন আইন লঙ্ঘিত হচ্ছে।

আইসিজের রায়ের গুরুত্ব

আন্তর্জাতিক বিচার আদালত জাতিসংঘের শীর্ষ আইনি প্রতিষ্ঠান। এর রায় সব সদস্য রাষ্ট্রের জন্য বাধ্যতামূলক। তবে বাস্তব প্রয়োগ অনেক সময় রাজনৈতিক চাপের কারণে দুর্বল হয়।

এই মামলায় যদি আদালত দক্ষিণ আফ্রিকার পক্ষে রায় দেয়, তবে ইসরায়েল কেবল আইনি নয়, কূটনৈতিকভাবেও তীব্র চাপের মুখে পড়বে। এতে তাদের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বিশেষ করে পশ্চিমা মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক জটিল হতে পারে।

অন্যদিকে, যদি আদালত ইসরায়েলের পক্ষে রায় দেয়, তবে ফিলিস্তিনপন্থী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে হতাশা বাড়বে। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠবে।

গাজা ও পশ্চিম তীরে বর্তমান পরিস্থিতি

সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গাজার ৮০% অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিদ্যুৎ, পানি, হাসপাতাল—সবকিছু কার্যত ভেঙে পড়েছে। জাতিসংঘ বলছে, এ মুহূর্তে গাজা বিশ্বের সবচেয়ে বড় খোলা কারাগারে পরিণত হয়েছে, যেখানে কোটি মানুষের জীবন ঝুঁকির মুখে।

অধিকৃত পশ্চিম তীরেও পরিস্থিতি শান্ত নয়। সেখানেও ইসরায়েলি সেনা অভিযানে শত শত ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই যুদ্ধ যদি দ্রুত বন্ধ না হয়, তবে পুরো মধ্যপ্রাচ্যেই অস্থিতিশীলতা ছড়িয়ে পড়বে।

ব্রাজিলের আইসিজে মামলায় যুক্ত হওয়া আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য একটি বড় বার্তা। এটি কেবল দক্ষিণ আফ্রিকার দাবিকে শক্তিশালী করছে না, বরং দেখিয়ে দিচ্ছে যে বিশ্বজুড়ে অনেক দেশ ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপকে সমর্থন করছে।

এই মামলা শুধু ফিলিস্তিনের জন্য নয়, বরং পুরো আন্তর্জাতিক আইনের ভবিষ্যতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, যদি গণহত্যার অভিযোগ প্রমাণিত হয় এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হয়, তবে ভবিষ্যতে আর কোনো রাষ্ট্র এত সহজে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সাহস করবে না।

বর্তমান বিশ্ব যখন মানবাধিকারের প্রশ্নে বিভক্ত, তখন আইসিজের এই রায় হতে পারে নতুন এক আন্তর্জাতিক মানদণ্ড। ব্রাজিলের যোগদান সেই পথকে আরও সুসংহত করল।

MAH – 12919 I Signalbd.com

মন্তব্য করুন
Advertisement

Related Articles

Back to top button