ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কিছু আরব দেশ ফিলিস্তিনি মুক্তিকামী সংগঠন হামাসের বিরুদ্ধে সরাসরি নিন্দা জানাতে যাচ্ছে। জাতিসংঘের আগামী সপ্তাহের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে এই ঘোষণা আসতে পারে। পশ্চিমা দেশগুলোকে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিতে উদ্বুদ্ধ করাই এর মূল লক্ষ্য।
আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে চলেছে। আগামী সপ্তাহে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের অনুষ্ঠানে প্রথমবারের মতো কিছু আরব দেশ হামাসকে প্রকাশ্যে নিন্দা জানাবে এবং সংগঠনটিকে নিরস্ত্রীকরণের আহ্বান জানাবে। এমন পদক্ষেপ মূলত পশ্চিমা দেশগুলোকে, বিশেষ করে ইউরোপীয় দেশগুলোকে, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য উৎসাহিত করার কৌশলের অংশ হিসেবে নেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
আরব দেশগুলোর অবস্থান পরিবর্তন
আরব দেশগুলো ঐতিহ্যগতভাবে ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী আন্দোলনকে সমর্থন করেছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হামাসের কার্যক্রম এবং এর সহিংস কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনা বাড়ছিল। এবার প্রথমবারের মতো তারা সংগঠনটির বিরুদ্ধে সরাসরি নিন্দার পথে হাঁটতে যাচ্ছে।
ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জিন-নোয়েল ব্যারোট সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “আমরা নিউইয়র্কে একত্রিত হয়ে হামাসের নিন্দা জানাব এবং এর নিরস্ত্রীকরণের আহ্বান করব। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে আমরা ফিলিস্তিনের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পথে অগ্রসর হতে চাই।”
নিউইয়র্কের জাতিসংঘ বৈঠকে কী হতে যাচ্ছে
নিউইয়র্কে আগামী সপ্তাহের শুরুতে অনুষ্ঠিতব্য এই বৈঠকে ফ্রান্স ও সৌদি আরবের যৌথ উদ্যোগে যুদ্ধোত্তর একটি রোডম্যাপ তৈরির পরিকল্পনা উপস্থাপন করা হবে। এর লক্ষ্য হবে দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের মাধ্যমে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের অবসান ঘটানো।
এই রোডম্যাপে থাকবে নিরাপত্তা, পুনর্গঠন এবং শাসনব্যবস্থার উন্নয়ন পরিকল্পনা। বিশেষজ্ঞদের মতে, আরব দেশগুলোর এই অবস্থান পরিবর্তন কূটনৈতিকভাবে বড় ধরনের বার্তা বহন করবে।
কেন পশ্চিমাদের ‘আকৃষ্ট’ করার কৌশল
ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতির ক্ষেত্রে ইউরোপীয় দেশগুলো বরাবরই বিভক্ত। কিছু দেশ ইতোমধ্যেই স্বীকৃতি দিলেও অনেকে এখনো দ্বিধায় আছে। ফ্রান্স, সৌদি আরব এবং অন্যান্য সহযোগী দেশগুলো মনে করছে, হামাসের বিরুদ্ধে সরাসরি নিন্দা জানালে পশ্চিমা দেশগুলোকে বোঝানো সহজ হবে যে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের নেতৃত্ব এখন একটি রাজনৈতিক সমাধানের দিকে এগোচ্ছে।
ফরাসি মন্ত্রী ব্যারোট বলেন, “আমরা চাই ইউরোপীয় দেশগুলো যেন স্পষ্টভাবে ফিলিস্তিনকে সমর্থন করে। হামাসের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে দূরত্ব তৈরি করলে এই প্রক্রিয়া সহজ হবে।”
ফরাসি উদ্যোগ এবং ইউরোপের প্রতিক্রিয়া
গত সপ্তাহে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ঘোষণা করেছেন, ২১ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ফ্রান্স আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেবে। এই ঘোষণার পরই বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
ব্রিটেনও এ ধরনের স্বীকৃতির আগ্রহ প্রকাশ করেছে, জার্মানি এ বিষয়ে ভাবছে। এই প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে ফ্রান্স সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে বলে মনে করা হচ্ছে।
হামাসের অবস্থান এবং অতীতের প্রেক্ষাপট
হামাস ১৯৮৭ সালে গাজায় প্রতিষ্ঠিত হয়। শুরু থেকেই সংগঠনটি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধের নীতি গ্রহণ করে এবং ফিলিস্তিনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও তাদের প্রভাব ক্রমেই বৃদ্ধি পায়। তবে পশ্চিমা দেশগুলো হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গাজায় হামাসের কর্মকাণ্ড এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে, যার ফলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতেই আরব দেশগুলো নতুন করে কৌশলগত অবস্থান নিচ্ছে।
ভবিষ্যৎ প্রভাব ও বিশ্লেষণ
বিশ্লেষকদের মতে, যদি আরব দেশগুলো এই ঘোষণা দেয়, তবে তা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনবে। পশ্চিমা দেশগুলো ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার পথে আরও ইতিবাচক ভূমিকা নিতে পারে।
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—হামাসকে বাদ দিয়ে কি ফিলিস্তিনের মুক্তির আন্দোলন আরও শক্তিশালী হবে, নাকি এর ফলে নতুন ধরনের বিভাজন তৈরি হবে?
এখন দেখার বিষয়, জাতিসংঘের এই বৈঠক কতটা ফলপ্রসূ হয় এবং ইউরোপীয় দেশগুলো কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়।
সারসংক্ষেপ
আগামী সপ্তাহের জাতিসংঘের বৈঠককে ঘিরে পুরো বিশ্ব অপেক্ষা করছে। আরব দেশগুলোর অবস্থান পরিবর্তনের এই সিদ্ধান্ত কূটনৈতিকভাবে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে এই উদ্যোগ সফল হবে কি না, তা নির্ভর করছে পশ্চিমা দেশগুলোর পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।
এম আর এম – ০৫৪৩, Signalbd.com



