বিশ্ব

নরেন্দ্র মোদি কেন ভারতজুড়ে হিন্দি ভাষা চালুর চেষ্টা করছেন

Advertisement

ভারতীয় ভাষাগত বৈচিত্র্যের প্রেক্ষাপট

ভারত একটি ভাষাগতভাবে অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় দেশ। এখানে হাজারেরও বেশি ভাষা ও উপভাষা রয়েছে, যেগুলো বিভিন্ন রাজ্য ও অঞ্চল অনুসারে ভিন্ন রকমের সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যবাহী পরিচয় বহন করে। এই ভাষাগত বৈচিত্র্য ভারতের এক অসাধারণ শক্তি হিসেবে বিবেচিত হলেও, তা মাঝে মাঝে রাজনৈতিক ও সামাজিক সংঘাতের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ভাষাকে কখনো জাতিগত বা ধর্মীয় পরিচয়ের অংশ হিসেবে ব্যবহার করাও দেখা যায়।

মোদি সরকারের হিন্দি প্রচারের পেছনের কারণ

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং তাঁর দল বিজেপি দেশের এককীকরণ ও ‘হিন্দুত্ববাদী’ আদর্শকে মজবুত করতে হিন্দি ভাষাকে কেন্দ্রীয় স্তরে প্রচার করতে চান। হিন্দি ভাষা ভারতের সবচেয়ে বড় জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা হলেও, দেশের দক্ষিণ ও পশ্চিম অঞ্চলে এটি সর্বত্র সমানভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।

মোদির রাজনৈতিক ঘাঁটি উত্তর ভারতের বেশিরভাগ অংশে হিন্দি ভাষা প্রধান। তারই প্রেক্ষিতে তিনি দেশজুড়ে হিন্দিকে প্রাধান্য দিয়ে একটি ‘এক ভাষায় ভারত’ গড়ার প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। এই প্রচেষ্টা অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচির নামকরণ থেকে শুরু করে শিক্ষা ক্ষেত্রে হিন্দি বাধ্যতামূলক করার মতো নীতিমালা।

মহারাষ্ট্র ও দক্ষিণ ভারতের প্রতিক্রিয়া

মহারাষ্ট্রের মত রাজ্যে যেখানে মারাঠি ভাষা মানুষের হৃদয়ের অন্তরাত্মায় স্থান করে নিয়েছে, সেখানে হিন্দি বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ প্রচণ্ড প্রতিরোধের মুখে পড়ে। গত বছর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হিন্দি বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত বাতিল করতে মহারাষ্ট্র সরকার বাধ্য হয়। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা এবং জনগণ এটিকে মারাঠি ভাষার অবমূল্যায়ন ও অপমান হিসেবে দেখে।

দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ুতে এই বিষয়টি আরও জটিল। তামিল ভাষার প্রাচীন ও সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে, যা তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। মোদি সরকারের চাপানো শিক্ষানীতি যেখানে হিন্দি বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে, তাতে তামিলনাড়ু সরকার কঠোর আপত্তি জানিয়েছে। রাজ্য সরকার জানিয়েছে, এই নীতি বাস্তবায়িত হলে তাদের শিক্ষাক্ষেত্রে আর্থিক সাহায্য বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যার বিরুদ্ধেও তারা আদালতে মামলা করেছে।

ভাষাগত চাপ ও সাংস্কৃতিক হুমকি

অধিকারকর্মী ও গবেষক নিরঞ্জনারাধ্য ভি পি জানান, “একটি ভাষাকে অন্যের ওপর চাপিয়ে দিলে দেশের ভাষাগত বৈচিত্র্য নষ্ট হয়, যা ভারতের জাতীয় ঐক্য ও সাংস্কৃতিক সংহতির জন্য ক্ষতিকর। এই কারণেই সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হচ্ছে।”

দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলো ভয় পাচ্ছে, হিন্দির প্রচার তাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির অবমূল্যায়নের মতো কাজ করবে, যা দীর্ঘমেয়াদে তাদের ঐতিহ্য ধ্বংসের কারণ হবে।

হিন্দি ভাষার গুরুত্ব ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

ভারতে হিন্দি ও ইংরেজি দুটি সরকারি ভাষা হলেও, অধিকাংশ লোক হিন্দিকেই তাদের মাতৃভাষা হিসেবে গ্রহণ করে। মোদি সরকার ‘নতুন ভারত’ গঠনের যে কৌশল নিয়েছে, সেখানে হিন্দি ভাষাকে জাতীয় ঐক্যের প্রধান উপাদান হিসেবে দেখা হচ্ছে। ‘ভারত’ নামের উৎপত্তিও প্রাচীন সংস্কৃত ভাষা থেকে, যেটি হিন্দির জন্মভূমি।

২০২০ সালে মোদি সরকার দেশের জাতীয় শিক্ষানীতি বদলে আরও ঐতিহ্যভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা চালু করে। নতুন নীতিতে তিনটি ভাষা শেখার নিয়ম থাকলেও, রাজ্যগুলোকে ভাষা নির্বাচন করার স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তামিলনাড়ু ও মহারাষ্ট্রের মতো রাজ্য মনে করছে, এর আড়ালে হিন্দি বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।

তামিলনাড়ুর প্রতিবাদ ও রাজ্যের ভাষা গৌরব

তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্টালিন বারবার বলেছেন, “আমাদের রাজ্যে হিন্দি শেখানো কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ আমরা ইতিমধ্যেই তামিল ও ইংরেজি ভাষায় শিক্ষিত সমাজ গড়ে তুলেছি।” তিনি ভাষাগত ঐতিহ্য রক্ষায় দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।

‘দ্য তামিলস: আ পোর্ট্রেট অব আ কমিউনিটি’ গ্রন্থের লেখক নির্মলা লক্ষ্মণ বলেন, “তামিলরা তাদের ভাষাকে গভীরভাবে ভালোবাসে এবং গর্ব করে। কবিতা ও সাহিত্যে এই ভাষার সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে। তাই হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে তামিলদের তীব্র প্রতিরোধ রয়েছে।”

মহারাষ্ট্রে মারাঠি ভাষার সুরক্ষা নিয়ে উত্তেজনা

মহারাষ্ট্রেও একই ধরনের উত্তেজনা চলছে। বিজেপি শাসিত রাজ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হিন্দি শেখানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর থেকেই মারাঠি ভাষাপ্রেমীদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। একদিকে বিনিয়োগকারী সুশীল কেদিয়া মারাঠি ভাষা শেখার কষ্টের কথা উল্লেখ করলে তার বিরুদ্ধে সোশ্যাল মিডিয়ায় কটাক্ষ ও হামলার ঘটনা ঘটে।

অন্যদিকে মারাঠি ভাষার স্বার্থে দুই প্রধান রাজনীতিক, রাজ ঠাকরে ও উদ্ধব ঠাকরে, রাজনৈতিক পার্থক্য ভুলে একত্রিত হয়েছেন। তারা একসঙ্গে মারাঠির স্বার্থে লড়াই করার ঘোষণা দিয়েছেন।

ভাষাগত বৈচিত্র্য ও জাতীয় ঐক্যের সমন্বয়

ভারতীয় ভাষাগত বৈচিত্র্য দেশের ঐতিহ্যের অংশ। কিন্তু হিন্দি ভাষার অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করলে দেশের সংহতি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ভাষা যদি সাংস্কৃতিক গর্বের মাধ্যমে সম্মানিত হয়, তা দেশকে এগিয়ে নিতে পারে। কিন্তু জোরপূর্বক চাপ প্রয়োগ করলে বিভাজনের জন্ম হয়।

ভবিষ্যৎ পথ ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ

নরেন্দ্র মোদি সরকার যে হিন্দি ভাষাকে জাতীয় একতাবদ্ধতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে, তা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিতর্ক ও অসন্তোষের কারণ। ভবিষ্যতে সরকারের উচিত হবে দেশের ভাষাগত বৈচিত্র্যকে সম্মান করে সমন্বিত নীতি গ্রহণ করা, যাতে দেশীয় ভাষাগুলোর মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকে এবং দেশের ঐক্যও বজায় থাকে।

টপিকের সারমর্ম:

  • ভারতের ভাষাগত বৈচিত্র্য দেশের অন্যতম শক্তি, যা হুমকির মুখে রয়েছে হিন্দি ভাষার অতিরিক্ত চাপের কারণে।
  • মোদি সরকারের হিন্দি প্রচার মূলত উত্তর ভারতকে ভিত্তি করে হলেও মহারাষ্ট্র ও দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোতে ব্যাপক প্রতিরোধ তৈরি করেছে।
  • তামিলনাড়ু ও মহারাষ্ট্রের প্রতিবাদ ভাষাগত চাপের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক গৌরব রক্ষার লড়াই।
  • রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্তেজনা মারাঠি ও তামিল ভাষার জন্য প্রতিরোধকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানিয়েছে।
  • ভাষাগত সমন্বয় ও সংহতি ভবিষ্যতে ভারতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
মন্তব্য করুন
Advertisement

Related Articles

Back to top button