যুক্তরাষ্ট্র এক অভিনব ও বিস্ময়কর পরিকল্পনার বাস্তবায়ন শুরু করেছে। কোটি কোটি মাছি উৎপাদন করে তা উড়োজাহাজ থেকে ছড়িয়ে দেওয়া হবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলজুড়ে। শুনে অবাক লাগলেও এই পরিকল্পনার পেছনে রয়েছে এক ভয়ংকর শত্রুকে দমন করার প্রয়াস—নিউ ওয়ার্ল্ড স্ক্রুওর্ম নামে পরিচিত এক ধরণের লার্ভা, যাকে বলা হচ্ছে ‘মাংসখেকো শূককীট’।
কী এই মাংসখেকো শত্রু?
এই লার্ভার উৎস হচ্ছে এক বিশেষ মাছি, যার বৈজ্ঞানিক নাম Cochliomyia hominivorax। এরা উষ্ণ রক্তের প্রাণীর শরীরের ক্ষতস্থানে ডিম পাড়ে এবং ডিম থেকে জন্ম নেওয়া লার্ভাগুলো জীবিত প্রাণীর মাংস খেতে শুরু করে। এরা এতটাই ভয়ংকর যে অল্প সময়েই পশুর মৃত্যু ঘটতে পারে। ২০২৩ সালে মধ্য আমেরিকার দেশগুলোতে এই লার্ভার ব্যাপক প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়, যার প্রভাবে পানামা, কোস্টারিকা, হন্ডুরাস, নিকারাগুয়া, গুয়াতেমালা, বেলিজ ও এল সালভাদর পর্যন্ত আক্রান্ত হয়। এরপর গত বছরের নভেম্বরে এটি মেক্সিকোর দক্ষিণাঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।
মানুষও আছে ঝুঁকিতে
বিশেষজ্ঞদের মতে, এদের আক্রমণ শুধু পশুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিরল হলেও মানুষের শরীরেও এই লার্ভা সংক্রমণ ঘটাতে পারে। টেক্সাস এ অ্যান্ড এম ইউনিভার্সিটির কীটতত্ত্ববিদ ড. ফিলিপ কাফম্যান জানান, মানুষকেও আক্রান্ত করার তথ্য পাওয়া গেছে, বিশেষ করে শরীরের উন্মুক্ত ক্ষতস্থানে।
মাছি দিয়ে মাছি দমন – পুরনো কৌশল আবার ফিরছে
এই সমস্যার সমাধানে যুক্তরাষ্ট্র ফিরেছে তাদের পুরনো, কিন্তু কার্যকর কৌশলে। ১৯৫০ এবং ১৯৬০-এর দশকে তারা Sterile Insect Technique (SIT) ব্যবহার করে এ ধরণের লার্ভা নিয়ন্ত্রণে সফলতা পেয়েছিল। কৌশলটি হলো: প্রজননে অক্ষম পুরুষ মাছি তৈরি করে তা স্ত্রী মাছিদের সঙ্গে প্রজননে বাধ্য করা। যেহেতু পুরুষ মাছি বন্ধ্য, ফলে স্ত্রী মাছিরা ডিম দিলেও তা নিষ্ক্রিয় হয় এবং বংশবিস্তার বন্ধ হয়ে যায়।
নতুনভাবে তৈরি হচ্ছে কারখানা ও গবেষণাগার
এবার এই প্রকল্পকে আরও বড় পরিসরে বাস্তবায়ন করতে, টেক্সাসের হিডালগো কাউন্টিতে, মুর এয়ারফোর্স বেস–এর পাশে একটি বিশাল মাছি উৎপাদন কারখানা গড়ে তোলা হচ্ছে। এখানে প্রতি সপ্তাহে ১০ কোটি প্রজননে অক্ষম পুরুষ মাছি উৎপাদন করা হবে, যেগুলো বিশেষ উড়োজাহাজের মাধ্যমে আক্রান্ত এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়া হবে।
এই প্রকল্পে প্রতি ফ্লাইটে খরচ হতে পারে প্রায় ৮.৫ মিলিয়ন ডলার। স্থাপনা নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার। তবে কৃষিবিদ ও খামারিরা বলছেন, এই খরচ অনেক কম যদি তুলনা করা হয় গবাদিপশু শিল্পে প্রতি বছর কয়েক বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির সঙ্গে।
কেন এই পরিকল্পনা এত জরুরি?
টেক্সাস পশু স্বাস্থ্য কমিশনের উপ-নির্বাহী পরিচালক থমাস ল্যানসফোর্ড বলেন, এই মাছির লার্ভা আক্রান্ত পশুকে প্রতিদিন পরিষ্কার করতে হয়, অ্যান্টিসেপটিক ব্যবহার করতে হয় এবং ক্ষত ঢেকে রাখতে হয়। চিকিৎসা না দিলে পশুটি এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে মারা যেতে পারে।
অপারেশনের দায়িত্বে কে?
এই প্রকল্পটি USDA (United States Department of Agriculture) এবং Panama–U.S. Commission for the Eradication and Prevention of Screwworm (COPEG)-এর যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিদিন লাখ লাখ মাছি উৎপাদন করে মেক্সিকো ও মধ্য আমেরিকায় আক্রান্ত এলাকায় ফেলে দেওয়া হচ্ছে।
পরিকল্পনার সাফল্য সম্ভাবনা কেমন?
ড. কাফম্যান জানান, স্ত্রী মাছি মাত্র একবার প্রজননে অংশ নেয়। একবার যদি তা বন্ধ্যা মাছির সঙ্গে ঘটে, তাহলে সে আর ডিম দিতে পারে না। এই পদ্ধতিতে কয়েক মাসের মধ্যে মাছির জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
স্থানীয় খামারিদের প্রতিক্রিয়া
টেক্সাসের খামারি স্টিফেন ডিয়েবেল বলেন, “হ্যাঁ, এটা ব্যয়বহুল। তবে যদি এটা কাজ করে, তাহলে কোটি কোটি ডলারের গবাদিপশু শিল্প রক্ষা পাবে। আমরা আগেও দেখেছি এই পদ্ধতি কার্যকর হয়েছে। এবারও আশাবাদী।”
ভবিষ্যতের প্রস্তুতি
বর্তমানে টেক্সাসে তৈরি হচ্ছে সবচেয়ে আধুনিক মাছি উৎপাদন কেন্দ্র। এর মাধ্যমে সম্পূর্ণ জেনেটিকভাবে প্রজননে অক্ষম পুরুষ মাছি তৈরি করা হবে। গবেষকেরা বলছেন, ভবিষ্যতে এই পদ্ধতিকে আরো উন্নত করা যেতে পারে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যবহার করে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জয়যাত্রা
মাছি দিয়ে মাছি দমন করার এই অভিনব কৌশল একদিকে যেমন পরিবেশবান্ধব, তেমনি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে আশার আলো জাগাচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় কোনও ক্ষতিকর রাসায়নিক প্রয়োগ হয় না এবং এটি বন্যপ্রাণীর ওপরও ক্ষতিকর নয়। একে বলা হচ্ছে ‘স্মার্ট বায়ো কন্ট্রোল’–এর অনন্য উদাহরণ।
এই উদ্যোগ সফল হলে এটি হতে পারে সারা বিশ্বের জন্য একটি মডেল প্রকল্প, যা ভবিষ্যতে পোকামাকড়-নিয়ন্ত্রণ ও গবাদিপশু স্বাস্থ্য সংরক্ষণে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে।



