গাজা — গত ২৪ ঘণ্টায় ইসরায়েলি বিমান বাহিনীর বেহাত বর্বরোচিত হামলায় প্রাণ হারিয়েছে অন্তত ১১০ জন ফিলিস্তিনি। ইসরায়েলের নিরবিচ্ছিন্ন বোমাবর্ষণ ও স্থলসেনার তাণ্ডবে গাজা উপত্যকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, হাজার হাজার নিরীহ মানুষ দারুণ বিপর্যয়ে পড়েছে। শনিবার থেকে রবিবার সকাল পর্যন্ত এই মারাত্মক বন্যহত্যার ঘটনা ঘটেছে।
রাফাহে ত্রাণকর্মীদের ওপর নির্বিচার হামলা, নিহত ৩৪
দক্ষিণ গাজার রাফাহ শহরের কাছে একটি ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রে যাওয়ার পথে হামলার শিকার হন বেশ কয়েকজন ত্রাণকর্মী ও নাগরিক। যাদের মধ্যে গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন (জিএইচএফ) এর সদস্যরাও ছিল। ৩৪ জনের প্রাণহানি ঘটে এই সশস্ত্র হামলায়, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোতে তীব্র নিন্দার মুখে পড়েছে।
বেইত হানুনে বিমান হামলার তাণ্ডব, নিহত ৪০ জনের অধিক
উত্তর গাজার বেইত হানুন এলাকায় শনিবার সন্ধ্যার পর থেকেই ব্যাপক বিমান হামলা চালায় ইসরায়েলি বিমান বাহিনী। প্রায় ৪০টি বোমা হামলায় শহরের আবাসিক এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। এতে কমপক্ষে ১৫ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে শিশুসহ নারীও রয়েছেন।
আবাসিক এলাকায় ইসরায়েলি আগ্রাসন, হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে
গাজার জাবালিয়া এলাকায় অবস্থিত আবাসিক ভবনগুলিতেও চলেছে ইসরায়েলি বাহিনীর বোমাবর্ষণ। একাধিক পরিবারের বসবাসকেন্দ্রে হামলার ফলে ব্যাপক মৃত্যু ও আহতের খবর পাওয়া গেছে। পাশাপাশি আল-শাতি শরণার্থী শিবিরে আইডিএফ (ইসরায়েলি ডিফেন্স ফোর্স) নামের সামরিক বাহিনীর তাণ্ডব অব্যাহত রয়েছে। শিশুসহ বহু নারী-পুরুষ হতাহত হয়েছেন।
পশ্চিম তীরের আল-মানিয়া গ্রামে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের বর্বরতা
দখলকৃত পশ্চিম তীরের আল-মানিয়া গ্রামে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা ফিলিস্তিনিদের বসতঘর লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপ শুরু করেছে। তারা আগুন লাগিয়ে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে, যা এলাকার নিরাপত্তাহীনতা এবং আতঙ্ক ছড়িয়েছে। স্থানীয়রা ক্ষোভ ও হতাশায় ভুগছেন।
গাজায় ইসরায়েলি হামলার পেছনে রাজনৈতিক ও মানবিক প্রেক্ষাপট
গত কয়েক বছর ধরে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে সংঘর্ষ তীব্র হচ্ছে। বিশেষ করে গাজার ওপর ইসরায়েলের অবরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ফিলিস্তিনি জনজীবনে এক বিশাল মানবিক সংকট সৃষ্টি করেছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা বারবার ইসরায়েলের এই হামলা ও অবরোধের নিন্দা জানিয়ে এসেছে। তবে ইসরায়েল তার নিরাপত্তার স্বার্থে এই অভিযান চালাচ্ছে বলে দাবি করছে।
গাজা উপত্যকা বিশ্বের অন্যতম সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। প্রায় দুই কোটি মানুষের বাস, যারা দীর্ঘদিন ধরেই সন্ত্রাস, অবরোধ ও যুদ্ধের ভয়ে নাজেহাল। বেসামরিক লোকজনের ওপর ইসরায়েলি বিমান হামলা ও স্থলযুদ্ধের কারণে দৈনন্দিন জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও সাহায্যের আহ্বান
ইসরায়েলি এই তাণ্ডবের বিরুদ্ধে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও মানবাধিকার সংস্থা কঠোর প্রতিবাদ জানিয়েছে। জাতিসংঘ, আমেরিকা, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশ্ব রাজনীতি এখন গাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেবে কি না, সেই দিকেই নজর রাখছে।
জাতিসংঘের হিউম্যান রাইটস অফিস জানিয়েছে, বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক আইনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গাজায় এসব হামলা যুদ্ধকালীন অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।
বিশ্বের বিভিন্ন মানবতাবাদী সংগঠন ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছে দিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে। ত্রাণের অভাবে হাজার হাজার মানুষ খাদ্য, পানি ও ওষুধের অভাবে ঝুঁকিতে রয়েছে।
গাজার বাস্তব চিত্র: ধ্বংসস্তূপ আর আশ্রয়হীন মানুষ
গাজার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা এখন ধ্বংসস্তূপ আর রক্তাক্ত ময়দান। মানুষ শিবিরে আশ্রয় নিয়েও নিরাপদ নয়, কারণ বিমান হামলা এখনও চলছে। শিশু, বৃদ্ধ, নারী এবং অসহায় মানুষের জীবন একেবারে ঝুঁকির মধ্যে।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, অনেকের বাড়িঘর ধ্বংস হয়ে গেছে, যেখানে কোথাও খাবার নেই, কোথাও নেই নিরাপদ আশ্রয়। বিদ্যুৎ ও পানির সঙ্কট প্রকট। হাসপাতালগুলোও অতিভর্তি এবং সঙ্কটে।
ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ভবিষ্যত কি?
গাজার এই দীর্ঘ সংঘাতের ফলে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি শরণার্থী হয়ে গেছেন। তাদের অধিকাংশের জন্য শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ জীবন এখন স্বপ্ন মাত্র। ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা ছাড়া এই সংকটের সমাধান মুশকিল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিশ্ব সম্প্রদায়ের দ্রুত হস্তক্ষেপ না হলে, গাজার অবস্থা আরও খারাপ হবে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা।
গত ২৪ ঘণ্টায় গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় ১১০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। রাফাহ, বেইত হানুন, জাবালিয়া, আল-শাতি শিবিরসহ বিভিন্ন এলাকায় নির্বিচার বোমাবর্ষণ চলছে। মানবাধিকার লঙ্ঘন ও সামরিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বিশ্বজনীন প্রতিবাদ জানানো হচ্ছে। পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ এবং দ্রুত মানবিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তা জোরালো হচ্ছে।



