ভারতের রাজস্থানের চুরু জেলায় এক করুণ বিমান দুর্ঘটনায় ভারতীয় বিমানবাহিনীর দুই পাইলটের মৃত্যু হয়েছে। বুধবার (৯ জুলাই) দুপুরে চুরু জেলার একটি প্রশিক্ষণ মিশনে নিযুক্ত জাগুয়ার ট্রেইনার যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়। দুর্ঘটনায় স্কোয়াড্রন লিডার লোকেন্দ্র সিং সিধু ও ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট রিশি রাজ সিং নিহত হন। খবর আসে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে।
বিমান বিধ্বস্তের ঘটনার বিস্তারিত
ভারতীয় বিমানবাহিনীর তরফ থেকে জানানো হয়েছে, বিধ্বস্ত হওয়া বিমানটি প্রশিক্ষণ মিশনে ছিল। বিমানটি ভূপৃষ্ঠ থেকে নিচু উচ্চতায় উড়ছিলো এবং হঠাৎ দুর্ঘটনার শিকার হয়। বিমান বাহিনী এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, “দুর্ঘটনায় দুইজন পাইলটের মৃত্যু হয়েছে, তবে কোনো বেসামরিক সম্পত্তির ক্ষতি হয়নি।” দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে একটি কোর্ট অব ইনকোয়ারি গঠন করা হয়েছে।
স্থানীয় পুলিশ সুপার জয় যাদব জানান, “বিমানটি নিচু উচ্চতায় উড়ছিলো এবং বিধ্বস্ত হওয়ার আগেও এটি এমনভাবে চলছে।” বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে, নিচু উচ্চতায় বিমান চালানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং এই ধরণের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে পাখির সঙ্গে সংঘর্ষ, মোবাইল টাওয়ার, কিংবা অজানা কোনও বাধা।
জাগুয়ার যুদ্ধবিমান এবং এর পূর্বের দুর্ঘটনা
জাগুয়ার ট্রেইনার যুদ্ধবিমান ভারতীয় বিমান বাহিনীতে ১৯৭৯ সাল থেকে ব্যবহার হচ্ছে। বর্তমানে ভারতের ৬টি স্কোয়াড্রনে এই বিমান সক্রিয় রয়েছে। যদিও ইঞ্জিন উন্নয়নের পরিকল্পনা ২০১০ সালে শুরু হয়েছিল, কিন্তু খরচ বেশি হওয়ার কারণে তা বাতিল হয়েছে। ফলে এখনও এই বিমান পুরনো অ্যাডার এমকে ৮১১ ইঞ্জিন চালিত।
২০২৫ সালের শুরু থেকে জাগুয়ার যুদ্ধবিমানের তিনটি দুর্ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে এই রাজস্থানের দুর্ঘটনাটি সর্বশেষ। মার্চ মাসে হরিয়ানার আম্বালা এয়ারবেস থেকে এক জাগুয়ার বিধ্বস্ত হয়, কিন্তু সে দুর্ঘটনায় পাইলট নিরাপদে বেরিয়ে আসেন। পরে এপ্রিল মাসে গুজরাটের জামনগরে একটি জাগুয়ার বিধ্বস্ত হয়, যেখানে একজন পাইলট নিহত এবং আরেকজন গুরুতর আহত হন।
এই ঘটনাগুলো বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষণ ও যান্ত্রিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুরানো ইঞ্জিন এবং বিমান পরিচালনায় নতুন প্রযুক্তির অভাব দুর্ঘটনার সম্ভাবনা বাড়ায়।
নিচু উচ্চতায় বিমান চালানোর ঝুঁকি
বিমান চালনা বিশেষ করে যুদ্ধবিমানের ক্ষেত্রে নিচু উচ্চতায় উড়ান অত্যন্ত বিপজ্জনক। নিচু উচ্চতা থাকার কারণে পাখির সঙ্গে সংঘর্ষ, স্থাপনা বা টাওয়ারের মতো বাধার মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। ভারতীয় বিমান বাহিনীর নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা এটাও বলেন, প্রশিক্ষণ মিশনে এই ধরনের ঝুঁকি থাকে, তাই নিয়মিত নিরাপত্তা পর্যালোচনা এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার জরুরি।
ভারতীয় বিমান বাহিনীর প্রতিক্রিয়া
ভারতীয় বিমান বাহিনী প্রধান এক শোকবাণীতে নিহত পাইলটদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমাদের এই দুর্দান্ত দুই পাইলটের আত্মত্যাগ আমরা কখনো ভুলব না। তাদের স্মৃতি চিরকাল আমাদের সঙ্গে থাকবে।”
বিমান বাহিনী ইতিমধ্যে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে একটি উচ্চস্তরের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তারা ঘটনার পেছনের কারণ নির্ণয় করে ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা এড়ানোর পরিকল্পনা করবে।
সাম্প্রতিক বিমান দুর্ঘটনার প্রভাব ও পদক্ষেপ
ভারতীয় বিমান বাহিনীতে প্রশিক্ষণ ও নিরাপত্তা নিয়মকানুনের পুনর্বিবেচনা চলছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালে একের পর এক জাগুয়ার যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ফলে বিমান বাহিনী আধুনিকীকরণ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নতির ওপর জোর দিচ্ছে।
বিমান বাহিনী আধিকারিকদের মতে, পুরানো বিমান ও ইঞ্জিনের পরিবর্তে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করলে এই ধরনের দুর্ঘটনা অনেকাংশেই কমানো সম্ভব হবে। ইতিমধ্যে নতুন যুদ্ধবিমান ও আধুনিক প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম আনার প্রক্রিয়া চলছে।
সমগ্র প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যতের জন্য বার্তা
রাজস্থানে ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনা ভারতীয় বিমান বাহিনীর জন্য একটি বড় ধাক্কা। এই দুর্ঘটনা শুধু একজন পাইলটের জীবনহানি নয়, বরং দেশীয় নিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগের কারণ।
বিমান বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে— ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া। এটি শুধু প্রযুক্তিগত নয়, প্রশিক্ষণ ও নিরাপত্তা সংস্কৃতির ওপরও নির্ভর করে।



