আন্তর্জাতিক আদালত নামের কোনো প্রতিষ্ঠান আমরা বিশ্বাস করি না: মাওলানা জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ
আফগানিস্তানে তালেবান সরকারের মুখপাত্র মাওলানা জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) সম্পর্কে কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, “আমরা আন্তর্জাতিক আদালত নামের কোনো প্রতিষ্ঠানকে বিশ্বাস করি না এবং তাদের প্রতি আমাদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই।”
৮ জুলাই (মঙ্গলবার) এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে তিনি এ মন্তব্য করেন। তার এই বক্তব্য মূলত আফগানিস্তানের শীর্ষ দুই নেতা — আমিরুল মু’মিনীন মাওলানা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা ও প্রধান বিচারপতি আব্দুল হাকিম হাক্কানির বিরুদ্ধে আইসিসি কর্তৃক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির প্রেক্ষাপটে এসেছে।
আইসিসির বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ
বিবৃতিতে মাওলানা জাবিহুল্লাহ স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “এ ধরনের ভিত্তিহীন ও একতরফা ঘোষণা আমাদের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আনবে না। বরং এটি আন্তর্জাতিক আদালতের পক্ষপাতদুষ্ট অবস্থানকেই স্পষ্ট করে।”
তিনি আরও বলেন, “গাজ্জায় যখন প্রতিদিন শত শত নিরীহ নারী ও শিশু নিহত হচ্ছে, তখন আইসিসি চুপ। এটি প্রমাণ করে, বিশ্বব্যাপী মানবাধিকারের নামে এই সব প্রতিষ্ঠান আসলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই কাজ করে।”
গ্রেপ্তারি পরোয়ানা: কী ঘটেছিল?
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রি-ট্রায়াল চেম্বার-২ সম্প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। আফগানিস্তানে তালেবানদের ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে নারী অধিকার লঙ্ঘন, শিক্ষা নিষেধাজ্ঞা এবং রাজনৈতিক নিপীড়নের অভিযোগ এনে আদালত হিবাতুল্লাহ ও হাকিম হাক্কানির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে।
তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, নারীদের শিক্ষা ও কাজের অধিকার খর্ব করা হয়েছে এবং যারা নারীদের পক্ষে কথা বলেছে, তাদেরও দমন করা হয়েছে।
তালেবানদের পাল্টা যুক্তি: শরিয়াহ-ভিত্তিক বিচার
এই অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে তালেবান প্রশাসন। তারা দাবি করেছে, আফগানিস্তানে ইসলামি শরিয়াহর ভিত্তিতে ন্যায়ের ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে এবং এর বিরুদ্ধে কোনো আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপকে তারা বৈধ মানে না।
মাওলানা জাবিহুল্লাহ বলেন, “আমাদের বিচার ব্যবস্থা ইসলামী নিয়মে চলে। এই ব্যবস্থায় পশ্চিমা আইন কিংবা আদালতের স্থান নেই। আমাদের বিরুদ্ধে মামলা করা মানে পুরো মুসলিম বিশ্বের বিশ্বাসকে অপমান করা।”
গাজ্জা প্রসঙ্গ এনে আন্তর্জাতিক আদালতের নীরবতা প্রশ্নবিদ্ধ
তালেবান মুখপাত্র গাজ্জার প্রসঙ্গ তুলে বলেন, “যে বিশ্বে গাজ্জায় প্রতিদিন গণহত্যা চলছে, সেখানে আন্তর্জাতিক আদালত নিরব দর্শক। এই নিরবতা এক ধরনের মৌন সমর্থন। ফলে এদের ন্যায়বিচারের দাবি শুধু মুখে বলা শ্লোগান ছাড়া আর কিছু নয়।”
তিনি আরও বলেন, “যারা নিজেদের ‘বিচার প্রতিষ্ঠাকারী’ বলে দাবি করে, তারা গাজ্জায় শিশুদের কফিনের দৃশ্য দেখে চোখ বন্ধ করে রাখে। এটি দ্বিমুখী মানসিকতার জঘন্য উদাহরণ।”
কি হতে পারে ভবিষ্যতে?
বিশ্লেষকরা বলছেন, তালেবানদের এই অবস্থান আফগানিস্তানের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক আরও জটিল করে তুলতে পারে। আইসিসি যদি এই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করতে চায়, তবে তা সরাসরি সংঘাতের আশঙ্কাও তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে, ইসলামি বিশ্বের একটি অংশ তালেবানদের অবস্থানকে সমর্থন করতে পারে, বিশেষ করে গাজ্জা প্রসঙ্গে তাদের বক্তব্যের কারণে।
“আমরা আন্তর্জাতিক আদালত নামের কোনো প্রতিষ্ঠানে বিশ্বাস করি না”—মাওলানা জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ
সংকট আরও ঘনীভূত হতে পারে
তালেবান সরকারের স্পষ্ট ও কঠিন ভাষার এই প্রতিক্রিয়া আন্তর্জাতিক মহলে বড় ধরনের আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে গাজ্জা পরিস্থিতি ও আইসিসির নীরবতা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা এক ধরনের আন্তর্জাতিক দ্বিমুখিতা প্রকাশ করে।
বিশ্লেষকদের মতে, আইসিসি ও তালেবানদের মধ্যে এই উত্তেজনা কমার সম্ভাবনা কম। বরং এটি আগামী দিনে আফগানিস্তানকে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ফেলতে পারে।
তবে প্রশ্ন থেকেই যায় — আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার কি আদৌ সব দেশ ও জাতির জন্য সমানভাবে প্রয়োগ হয়? নাকি এটা হয়ে উঠেছে শুধুই রাজনীতির হাতিয়ার?
এম আর এম – ০২৫৮, Signalbd.com



