ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ ঘোষণা দিয়েছেন, গাজার সব ফিলিস্তিনিকে রাফাহ শহরের ধ্বংসাবশেষের ওপর একটি নতুন ‘মানবিক শহরে’ স্থানান্তরের পরিকল্পনা চলছে। সেখানে প্রাথমিকভাবে ছয় লাখ মানুষের আবাসের ব্যবস্থা থাকবে। আন্তর্জাতিক মহল একে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে দেখছে।
পরিকল্পনার ঘোষণা: ‘মানবিক শহর’ নাকি নিয়ন্ত্রিত বন্দিশিবির?
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ সোমবার সাংবাদিকদের সামনে এক বিস্ফোরক ঘোষণা দেন—গাজায় বসবাসরত সমস্ত ফিলিস্তিনিকে দক্ষিণাঞ্চলের রাফাহ শহরের ধ্বংসাবশেষের ওপর নির্মাণাধীন একটি ‘মানবিক শহরে’ স্থানান্তরের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
তিনি জানান, নতুন ওই শহরে প্রাথমিকভাবে প্রায় ৬ লাখ ফিলিস্তিনির বসবাসের ব্যবস্থা থাকবে, তবে ভবিষ্যতে এটি ২১ লাখ পর্যন্ত জনসংখ্যার জন্য প্রস্তুত করা যেতে পারে।
নিরাপত্তা যাচাইয়ের পর এই শহরে মানুষদের প্রবেশ করানো হবে এবং একবার প্রবেশ করলে তাদের আর বের হওয়ার সুযোগ থাকবে না, এমনটাই জানিয়েছেন ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী।
৭ অক্টোবর থেকে শুরু যুদ্ধ, হাজারো প্রাণহানি
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের সীমান্ত হামলার জবাবে ইসরায়েল গাজায় ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে। সেই থেকে এখন পর্যন্ত গাজার ৫৭ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে এবং ১ লাখ ১০ হাজারের বেশি আহত হয়েছে।
জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তথ্যমতে, গাজার প্রায় ৯০% অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে। খাদ্য, পানি, ওষুধসহ সকল নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের ভয়াবহ সংকট চলছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া: ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ বলছে জাতিসংঘ ও বিশ্লেষকরা
ইসরায়েলি মানবাধিকার আইনজীবী মাইকেল স্ফার্ড এই পরিকল্পনাকে সরাসরি “মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য পরিকল্পিত অভিযান” বলে আখ্যা দিয়েছেন।
জাতিসংঘ এরইমধ্যে সতর্ক করেছে যে, এই ধরনের জোরপূর্বক স্থানান্তর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী কঠোরভাবে নিষিদ্ধ এবং তা “জাতিগত নির্মূলের” সামিল।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি মূলত গাজার জনগণকে চিরতরে তাদের ভূমি থেকে সরিয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি।
নেতানিয়াহু ও ট্রাম্পের ‘নতুন গাজা পরিকল্পনা’
এই ঘটনার মাঝে হোয়াইট হাউসে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গাজা পরবর্তী পুনর্গঠনের একটি বিতর্কিত প্রস্তাব দেন।
নেতানিয়াহু বলেন, গাজা যেন যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকে, এবং ফিলিস্তিনিদের অন্যত্র পুনর্বাসনের সুযোগ দেওয়া উচিত। ট্রাম্প একে “স্বাধীন পছন্দ” হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।
তবে মিশর এবং অন্যান্য আরব রাষ্ট্রগুলো এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করে ৫৩ বিলিয়ন ডলারের গাজা পুনর্গঠন প্রকল্প ঘোষণা করেছে, যাতে ফিলিস্তিনিরা নিজ ভূখণ্ডেই থেকে যেতে পারেন।
গাজার জনগণের ভয়: ‘নাকবা’র পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা
ফিলিস্তিনিরা আশঙ্কা করছেন, ১৯৪৮ সালের ‘নাকবা’ অর্থাৎ বিপর্যয়ের পুনরাবৃত্তি ঘটতে যাচ্ছে। তখন ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় লাখ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছিল।
আজকের গাজার বাসিন্দাদের তিন-চতুর্থাংশই সেই শরণার্থীদের উত্তরসূরি। তারা আবারও তাঁদের ভূমি থেকে বিতাড়িত হওয়ার আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
পরিকল্পনার পেছনে আসল উদ্দেশ্য কী?
বিভিন্ন বিশ্লেষক ও কূটনৈতিক মহল বলছেন, এই পরিকল্পনার পেছনে মূল লক্ষ্য হচ্ছে হামাস ও অন্যান্য প্রতিরোধ বাহিনীকে বেসামরিক জনগণের ভিড় থেকে আলাদা করা, যাতে সামরিক অভিযান সহজ হয়।
তবে মানবিক শহরের নামে একটি দেয়ালঘেরা নিয়ন্ত্রিত এলাকা তৈরি করে পুরো গাজাকে বন্দিশিবিরে রূপান্তর করার আশঙ্কা করছেন অনেকেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং একটি সম্পূর্ণ জনগোষ্ঠীকে নির্বাসনে পাঠানোর পরিকল্পনা।
মানবিক সংকটের ভয়াবহতা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গাজায় আহতদের মধ্যে অন্তত ২৫% মানুষের আঘাত চিরস্থায়ী পঙ্গুত্ব ডেকে এনেছে।
চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে, নেই পর্যাপ্ত খাদ্য, পানি, জ্বালানি। এমএসএফ (Médecins Sans Frontières)-এর মতো চিকিৎসা সংগঠনগুলো বারবার মানবিক করিডোর খুলে দেওয়ার আহ্বান জানালেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।
সারসংক্ষেপ
গাজাবাসীদের রাফাহ শহরের নতুন ‘মানবিক শহরে’ স্থানান্তরের ইসরায়েলি পরিকল্পনা বিশ্বজুড়ে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। মানবিক, রাজনৈতিক ও আইনগতভাবে এ উদ্যোগকে অনেকে দেখছেন ভবিষ্যতের এক ভয়াবহ বাস্তুচ্যুতির সূচনা হিসেবে।
যেখানে ইসরায়েল একে ‘মানবিক’ উদ্যোগ বলে প্রচার করছে, সেখানে আন্তর্জাতিক মহল একে জাতিগত নির্মূলের পেছনের কৌশল হিসেবে দেখছে।
এম আর এম – ০২৪৬, Signalbd.com



