প্রযুক্তি

মাইক্রোসফটের তৈরি প্রথম সফটওয়্যারের সোর্স কোড উন্মুক্ত করলেন বিল গেটস

১৯৭৫ সালের ৪ এপ্রিল, যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই তরুণ—বিল গেটস ও পল অ্যালেন—একসঙ্গে একটি উদ্যোগ শুরু করেন। এই উদ্যোগের নাম ছিল ‘মাইক্রো-সফট’। পরে নামটি সংক্ষিপ্ত করে রাখা হয় ‘মাইক্রোসফট’। আর এই উদ্যোগটি পরিণত হয় বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠানে। ঠিক পঞ্চাশ বছর পর, প্রতিষ্ঠানের সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস একটি অনন্য উদ্যোগ নিয়েছেন—উন্মুক্ত করে দিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির প্রথম সফটওয়্যারের সোর্স কোড।

গেটস তাঁর ব্যক্তিগত ব্লগ Gates Notes-এ লেখেন, “একটি প্রতিষ্ঠানের ৫০ বছর পূর্ণ হওয়া নিঃসন্দেহে এক বিশাল অর্জন। আমি গর্বিত, মাইক্রোসফট আজ বিশ্বজুড়ে লক্ষ-কোটি মানুষের প্রযুক্তি সহায়তার একটি নাম।” তিনি আরও জানান, এই সফটওয়্যারটি ছিল ‘Altair BASIC’—মাইক্রোসফটের প্রথম বানিজ্যিক পণ্য। এটি ছিল সেই সফটওয়্যার, যার মাধ্যমে মাইক্রোসফটের ব্যবসায়িক যাত্রা শুরু হয়।

প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক দিগন্ত

১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসে প্রযুক্তি সাময়িকী Popular Electronics-এর প্রচ্ছদে স্থান পায় Altair 8800 নামের একটি পার্সোনাল কম্পিউটার। এটি তৈরি করেছিল ছোট একটি কোম্পানি, এমআইটিএস (MITS)। এই প্রচ্ছদ চোখে পড়তেই বিল গেটস ও পল অ্যালেন সিদ্ধান্ত নেন—তাঁরা এই কম্পিউটারের জন্য একটি সফটওয়্যার বানাবেন। যদিও তখন তাঁদের হাতে কোনো যন্ত্রাংশ ছিল না, এমনকি প্রোগ্রাম চালিয়ে পরীক্ষার সুযোগও ছিল না। তবু তাঁরা নিজেদের মেধা ও দক্ষতায় তৈরি করেন Altair BASIC—একটি ভাষা যেটি কম্পিউটার ব্যবহারকে সহজ করে তোলে।

গেটস ব্লগে লেখেন, “আমাদের হাতে কিছুই ছিল না। এমনকি Altair কম্পিউটারটি পর্যন্ত ছিল না আমাদের কাছে। কিন্তু আমরা জানতাম, আমাদের হাতে সময় কম। ফলে রাত-দিন পরিশ্রম করে, পরীক্ষার সুযোগ ছাড়াই আমরা কোড লিখে যাই। সে সময়ের প্রতিটি মুহূর্ত আজও মনে পড়ে—কম্পিউটার ল্যাবে বসে আমি আর পল অ্যালেন সেই কোডের লাইনে লাইনে তৈরি করছি আমাদের স্বপ্নের ভিত্তি।”

সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত ‘Altair BASIC’

মাইক্রোসফটের ৫০ বছরের যাত্রার একধরনের চূড়ান্ত সম্মান জানিয়ে, বিল গেটস Altair BASIC-এর পূর্ণ সোর্স কোড উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। এখন যে কেউ এই প্রোগ্রামটি দেখতে, বিশ্লেষণ করতে ও ডাউনলোড করতে পারবেন। এটি শুধুই একটি প্রযুক্তিগত দৃষ্টান্ত নয়; বরং সফটওয়্যার ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এটি আজকের দিনের প্রোগ্রামারদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করেন প্রযুক্তি বিশ্লেষকেরা।

গেটসের ভাষায়, “এটি আমার লেখা সবচেয়ে দুর্দান্ত কোড। একদিকে যেমন এতে আমাদের তরুণ বয়সের সৃজনশীলতা ধরা আছে, অন্যদিকে এর মাধ্যমেই প্রযুক্তি জগতের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল।”

সফটওয়্যার শিল্পে মাইক্রোসফটের অবদান

পঞ্চাশ বছরে মাইক্রোসফট শুধু একটি সফটওয়্যার কোম্পানি হিসেবে থেমে থাকেনি। এটি হয়ে উঠেছে আধুনিক বিশ্বের এক অবিচ্ছেদ্য প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম। উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেম থেকে শুরু করে মাইক্রোসফট অফিস, এক্সবক্স, ক্লাউড প্ল্যাটফর্ম অ্যাজুর, এবং সর্বশেষ এআইভিত্তিক Copilot—সবখানেই প্রতিষ্ঠানটি রেখেছে সৃষ্টিশীলতার ছাপ। গেটস বলেন, “আমি কৃতজ্ঞ স্টিভ বলমার ও সত্য নাদেলার মতো নেতাদের প্রতি, যাঁরা প্রতিভাবান কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে মাইক্রোসফটকে এই অবস্থানে নিয়ে এসেছেন।”

প্রযুক্তিপ্রেমীদের জন্য এক ঐতিহাসিক উপহার

এই কোড উন্মুক্ত করার অর্থ শুধু একটি পুরোনো কোড দেখা নয়। বরং এটি একটি জ্ঞানের ভাণ্ডার, ইতিহাসের নথি, এবং প্রযুক্তির বিকাশের প্রাথমিক রূপরেখা। ১৯৭৫ সালে মাত্র কয়েক হাজার লাইনের একটি কোড আজ এত বড় প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি হতে পারে—এই উপলব্ধি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আরও উদ্ভাবনী হতে অনুপ্রাণিত করবে।

উল্লেখ্য, Altair BASIC ছিল মাইক্রোসফটের তৈরি প্রথম সফটওয়্যার যা বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি হয়েছিল। এর মাধ্যমেই বিল গেটস ও পল অ্যালেন প্রতিষ্ঠা করেন তাঁদের প্রথম সফটওয়্যার ব্যবসা। সেই ব্যবসার পথ ধরেই জন্ম নেয় মাইক্রোসফট, যা আজ বিশ্বের একাধিক সেক্টরে প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব দিচ্ছে।

প্রতিক্রিয়া ও মূল্যায়ন

সোর্স কোড উন্মুক্ত করার পর থেকেই প্রযুক্তি জগতের বিভিন্ন বিশ্লেষক, ইতিহাসবিদ ও প্রোগ্রামাররা এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। অনেকেই বলছেন, এটি শুধু প্রযুক্তি অনুরাগীদের জন্যই নয়, বরং শিক্ষার্থীদের জন্যও এক অনন্য শিক্ষনীয় উপাদান। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কম্পিউটার ইতিহাসবিদ ড. রবার্ট কার্ল বলেন, “এই কোডটি যেন সময়ের ক্যালেন্ডার উল্টে প্রথম যুগের সফটওয়্যারের অবয়ব তুলে ধরেছে। এটি এক ঐতিহাসিক ধন।”

ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে

বর্তমানে যদিও বিল গেটস সক্রিয়ভাবে মাইক্রোসফট পরিচালনায় নেই, তবুও প্রযুক্তির উন্নয়ন ও মানবকল্যাণে তাঁর অবদান আজও অমলিন। গেটস ফাউন্ডেশন থেকে শুরু করে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কাজ—সবখানেই তিনি সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত। মাইক্রোসফটের এই সুবর্ণজয়ন্তীর মুহূর্তে তাঁর এই প্রতীকী উদ্যোগ যেন প্রতিষ্ঠানটির শিকড় ও ইতিহাসকে স্মরণ করার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

অতীতের সঙ্গে সংযোগ রেখে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়া—এটিই ছিল মাইক্রোসফটের দৃষ্টিভঙ্গি, যেটি আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। এবং এই উন্মুক্তকরণ তারই একটি নিদর্শন।

মন্তব্য করুন

Related Articles

Back to top button