প্রযুক্তি

উইন্ডোজ ১০ সমর্থনের ইতি, সামনে বিশাল ই-বর্জ্য বিপর্যয়ের আশঙ্কা

চলতি বছরের ১৪ অক্টোবর ২০২৫ থেকে মাইক্রোসফট তাদের জনপ্রিয় অপারেটিং সিস্টেম উইন্ডোজ ১০-এর জন্য আর কোনো সফটওয়্যার আপডেট, নিরাপত্তা প্যাচ কিংবা কারিগরি সহায়তা দেবে না। এর অর্থ, বিশ্বের প্রায় ২৪০ মিলিয়ন (২৪ কোটি) কম্পিউটার কার্যত অকেজো হয়ে পড়বে—যেগুলো উইন্ডোজ ১১-এ আপগ্রেড করতে অক্ষম।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি বিশ্বব্যাপী ই-বর্জ্যের পরিমাণ কয়েক লাখ মেট্রিক টন পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে এবং প্রযুক্তি জগতের এক নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করবে।

কেন এত কম্পিউটার অকেজো হয়ে পড়বে?

উইন্ডোজ ১১ চালাতে প্রয়োজন উন্নত হার্ডওয়্যার:

  • টিপিএম ২.০ (Trusted Platform Module) চিপ
  • ৮ম প্রজন্মের ইন্টেল বা AMD Ryzen ২০০০ সিরিজ প্রসেসর
  • ৪ জিবি র‍্যাম ও ৬৪ জিবি স্টোরেজ

২০১৬ সালের আগের বেশিরভাগ পিসিতে এসব সুবিধা নেই। ফলে, উইন্ডোজ ১০ চালিত পুরোনো পিসিগুলোর বিশাল একটি অংশ উইন্ডোজ ১১-এ আপগ্রেডের অযোগ্য।

ই-বর্জ্যের ভয়াবহ পরিণতি

Canalys Research অনুযায়ী, এই পরিবর্তনের ফলে প্রায় ৪৮০ মিলিয়ন কেজি (৪.৮ লাখ মেট্রিক টন) ই-বর্জ্য তৈরি হতে পারে—যা গড়ে ৩.২ লাখ গাড়ির ওজনের সমান

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানায়, ২০২২ সালেই বিশ্বে ৬২ মিলিয়ন টন ই-বর্জ্য উৎপাদিত হয়েছে, যার ২৫%–এরও কম পুনর্ব্যবহার করা হয়। নতুন এই ঢেউ সেই পরিসংখ্যানকে আরও ভয়াবহ করে তুলতে পারে।

সমস্যার মূল দিকগুলো

১. নিরাপত্তা ঝুঁকি:

উইন্ডোজ ১০-এর সমর্থন বন্ধ হওয়ায়, যারা পুরোনো কম্পিউটার চালিয়ে যাবেন, তারা সাইবার হামলার ঝুঁকিতে পড়বেন। যদিও Microsoft টাকার বিনিময়ে ২০২৮ পর্যন্ত ESU (Extended Security Updates) দেবে, তা শুধুমাত্র বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর নাগালের মধ্যে থাকবে।

২. রিসেল ভ্যালু কমে যাওয়া:

অসমর্থিত ও পুরোনো অপারেটিং সিস্টেম চালানো পিসির পুনর্বিক্রয়মূল্য ধসে পড়বে। ফলে সেকেন্ড হ্যান্ড বাজারেও এদের চাহিদা থাকবে না।

৩. পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থা দুর্বল:

বিশ্বব্যাপী মাত্র ১৫–২০% ই-বর্জ্য পুনর্ব্যবহার করা হয়। ফলে এসব পিসি পরিবেশে নিক্ষেপ হলে এতে থাকা সিসা, পারদ, ক্যাডমিয়াম এর মতো বিষাক্ত পদার্থ পানিতে ও মাটিতে মিশে মারাত্মক পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটাতে পারে।

কী করতে পারেন আপনি? সচল রাখার সহজ ও টেকসই বিকল্প

১. লিনাক্স-ভিত্তিক অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহার করুন

আপনার কম্পিউটার পুরোনো হলেও তা একেবারে অকেজো নয়। Linux Mint, Ubuntu, কিংবা Zorin OS এর মতো হালকা, ফ্রি ও নিরাপদ অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহার করে আপনি পুরোনো পিসি চালাতে পারবেন অনেক বছর।

লিনাক্স ব্যবহারের সুবিধা:

  • বিনামূল্যে ব্যবহারযোগ্য
  • নিয়মিত আপডেট ও নিরাপত্তা
  • পুরোনো হার্ডওয়্যারে দ্রুত চলে
  • ব্যবহার সহজ ও উইন্ডোজের মতো ইন্টারফেস

২. দায়িত্বশীল রিসাইক্লিং বেছে নিন

কম্পিউটারটি আর ব্যবহারের উপযোগী না হলে সরাসরি ফেলে না দিয়ে দায়িত্বশীলভাবে ই-বর্জ্য রিসাইক্লিং সেন্টারে দিন। এতে পিসির মূল্যবান ধাতু (লিথিয়াম, সোনা, কপার) পুনরায় ব্যবহারযোগ্য হবে এবং পরিবেশ রক্ষা পাবে।

৩. পুরোনো পিসিকে নতুন রূপ দিন

আপনার পুরোনো পিসিকে আপনি ব্যবহার করতে পারেন:

  • নেটওয়ার্ক স্টোরেজ ডিভাইস (NAS) হিসেবে
  • হোম সার্ভার
  • শিশুদের জন্য শিক্ষামূলক কম্পিউটার
  • ফাইল ব্যাকআপ সার্ভার হিসেবে

মাইক্রোসফটের সমালোচনা এবং করণীয়

মাইক্রোসফটের কার্বন-নিরপেক্ষ হওয়ার লক্ষ্য থাকা সত্ত্বেও, উইন্ডোজ ১১-এর জন্য উচ্চমানের হার্ডওয়্যার বাধ্যতামূলক করা তাদের এই লক্ষ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, যদি তারা উইন্ডোজ ১০-এর সমর্থন বাড়াতো অথবা উইন্ডোজ ১১ চালাতে হার্ডওয়্যারের প্রয়োজনীয়তা কমাত, তবে এই বিপুল ই-বর্জ্য তৈরি হতো না।

তবে, মাইক্রোসফট ও পিসি নির্মাতারা নতুন হার্ডওয়্যার বিক্রির লক্ষ্যে এই কৌশল নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

২০২৫ সালের অক্টোবরের পর, উইন্ডোজ ১০ সমাপ্তির কারণে প্রায় ২৪ কোটি পিসি অকার্যকর হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। যদি এই ডিভাইসগুলো যথাযথভাবে রিসাইক্লিং না করা হয় বা বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয়, তবে বিশ্বব্যাপী ই-বর্জ্যের সুনামি দেখা দিতে পারে।

ব্যক্তিগত সচেতনতা, সরকারি রিসাইক্লিং নীতিমালা, এবং প্রযুক্তি কোম্পানির দায়িত্বশীলতা মিলেই এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব।

মন্তব্য করুন

Related Articles

Back to top button