প্রযুক্তি

জাপানের বাজারে এলো মানব ওয়াশিং মেশিন

Advertisement

কল্পনা করুন, একটি আরামদায়ক পডের ভেতরে শুয়ে আছেন, আর স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে আপনার শরীর ও মন! এমন বিজ্ঞান-কল্পকাহিনিকে বাস্তবে পরিণত করেছে জাপান। দেশটির বাজারে আনুষ্ঠানিকভাবে এসেছে ‘মানব ওয়াশিং মেশিন’। জাপানি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘সায়েন্স’ উদ্ভাবিত এই যন্ত্রটি ব্যবহারকারীকে কাপড়ের মতো পরিষ্কার করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। ‘হিউম্যান ওয়াশার অব দ্য ফিউচার’ নামে পরিচিত এই অত্যাধুনিক স্নানযন্ত্রটি শুধু পরিচ্ছন্নতাই নয়, একই সাথে ব্যবহারকারীর মানসিক প্রশান্তি এবং শারীরিক লক্ষণ পর্যবেক্ষণের সুবিধা দেবে। এই উদ্ভাবন বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তিপ্রেমী ও স্বাস্থ্য সচেতনদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করেছে।

মানব ওয়াশিং মেশিন: প্রযুক্তির নতুন দিগন্ত

‘হিউম্যান ওয়াশার অব দ্য ফিউচার’ হলো একটি বড় আকারের পড-সদৃশ যন্ত্র, যেখানে একজন ব্যবহারকারী শুয়ে থাকতে পারেন। একবার ভেতরে প্রবেশ করে ঢাকনা বন্ধ করলেই যন্ত্রটি কাজ শুরু করে দেবে। এটি উচ্চ চাপযুক্ত সূক্ষ্ম জলীয় বাষ্প এবং আল্ট্রাসনিক বুদ্বুদ ব্যবহার করে শরীরের প্রতিটি অংশ গভীরভাবে পরিষ্কার করে। এটি সাধারণ গোসলের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকরী ও আরামদায়ক বলে দাবি করেছে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান।

জাপানি কোম্পানি ‘সায়েন্স’ এই মেশিনটি তৈরি করেছে। এটি মূলত ১৯৭০ সালে ওসাকায় আয়োজিত এক্সপোতে প্রদর্শিত একটি পুরোনো পণ্যের আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর সংস্করণ। কোম্পানিটি জানিয়েছে, তাদের লক্ষ্য হলো পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার ধারণাকে এক নতুন স্তরে নিয়ে যাওয়া, যেখানে ব্যবহারকারী একই সাথে শারীরিক ও মানসিক সতেজতা লাভ করতে পারে।

পুরোনো ধারণা থেকে আধুনিক উদ্ভাবন

নির্মাতা কোম্পানি সায়েন্স-এর মুখপাত্র সাচিকো মায়েকুরা গত শুক্রবার (২৮ নভেম্বর) জানান, এই যন্ত্রটি তৈরির অনুপ্রেরণা এসেছে কয়েক দশক পুরোনো এক ধারণা থেকে। তিনি বলেন, ‘আমাদের কোম্পানির প্রেসিডেন্ট যখন ১০ বছরের শিশু ছিলেন, তখন সেই প্রদর্শনী থেকেই তিনি এই যন্ত্র তৈরির জন্য অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।’

পুরোনো ধারণাকে আধুনিক প্রযুক্তির সাথে মিশিয়ে ‘সায়েন্স’ এমন একটি যন্ত্র তৈরি করেছে যা শুধু শরীর পরিষ্কারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মায়েকুরা বলেন, ‘এই মেশিন শুধু শরীর নয়, মনও পরিষ্কার করে দেবে।’ অর্থাৎ, এতে এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে যা গোসলের অভিজ্ঞতাকে আরামদায়ক করে মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করবে। যন্ত্রটি ব্যবহার করার সময় ব্যবহারকারীর হৃদস্পন্দন ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক লক্ষণও পর্যবেক্ষণ করার ব্যবস্থা রয়েছে, যা স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে একটি অতিরিক্ত সুবিধা যোগ করেছে।

প্রদর্শনীতে ব্যাপক সাড়া ও প্রথম ক্রেতা

গত অক্টোবরে ওসাকায় অনুষ্ঠিত এক প্রদর্শনীতে ‘হিউম্যান ওয়াশার অব দ্য ফিউচার’-এর একটি মডেল প্রদর্শন করা হয়। যন্ত্রটি দেখার জন্য সে সময় প্রদর্শনীতে দীর্ঘ লাইন পড়ে গিয়েছিল, যা এর প্রতি মানুষের বিপুল আগ্রহের প্রমাণ দেয়। এই যন্ত্রের প্রদর্শনীর পর থেকেই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এবং প্রযুক্তি মহলে এটি আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে।

প্রাথমিকভাবে যন্ত্রটির ক্রেতা হিসেবে এগিয়ে এসেছে ওসাকার একটি হোটেল। হোটেল কর্তৃপক্ষ প্রথম ক্রেতা হিসেবে একটি মানব ওয়াশিং মেশিন কিনেছে এবং তাদের অতিথিদের জন্য এই অত্যাধুনিক সেবা চালু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর মাধ্যমে হোটেলটি তাদের সেবার মান উন্নত করতে এবং অতিথিদের একটি ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা দিতে চাইছে। এটি বাণিজ্যিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে যন্ত্রটির সম্ভাবনার দিকটি তুলে ধরে।

প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য এবং স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ

মানব ওয়াশিং মেশিনের মূল প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য হলো এর আল্ট্রাসনিক বুদ্বুদ এবং উচ্চ চাপের সূক্ষ্ম জলীয় বাষ্প। এই প্রযুক্তি ত্বককে গভীর থেকে পরিষ্কার করতে এবং ময়লা অপসারণে সহায়তা করে। সাধারণ গোসলে যা সম্ভব হয় না, তা এই মেশিনের মাধ্যমে সম্ভব হবে বলে দাবি করা হচ্ছে।

এছাড়াও, এই মেশিনটি ব্যবহারকারীর রিলাক্সেশন বা বিশ্রামের দিকে বিশেষ মনোযোগ দিয়েছে। উন্নত আরামদায়ক পরিবেশ এবং শান্তিদায়ক আলো ও শব্দ ব্যবহার করে এটি মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। একই সাথে, যন্ত্রটিতে যুক্ত সেন্সরগুলো ব্যবহারকারীর হৃদস্পন্দনের হার, রক্তচাপ (সম্ভাব্য ক্ষেত্রে) এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বায়োমেট্রিক ডেটা পর্যবেক্ষণ করতে পারে। যদি কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়, তবে তা ব্যবহারকারীকে সতর্ক করতে পারে, যা স্বাস্থ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি বড় পদক্ষেপ।

উৎপাদন ও বিক্রয়মূল্য: একটি বিরল প্রযুক্তি

কোম্পানির মুখপাত্র মায়েকুরা নিশ্চিত করেন যে, মেশিনটির মূল আকর্ষণ হলো এটি একটি খুবই বিরল যন্ত্র। তারা সীমিত পরিসরে এই যন্ত্রটি উৎপাদনের পরিকল্পনা করেছেন। প্রাথমিকভাবে প্রায় ৫০টি মেশিন বানানোর পরিকল্পনা চলছে। এই সীমিত উৎপাদন কৌশল এর প্রিমিয়াম ও বিরল প্রযুক্তিগত মূল্যকে আরও বাড়িয়ে দেবে।

যন্ত্রটির বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ কোটি ইয়েন, যা মার্কিন ডলারের হিসেবে প্রায় ৩ লাখ ৮৫ হাজার ডলার (বাংলাদেশি টাকায় এর মূল্য প্রায় ৪ কোটি ২০ লক্ষ টাকা)। এই উচ্চ মূল্য নির্দেশ করে যে, এটি আপাতত শুধুমাত্র উচ্চবিত্তের ব্যক্তিগত ব্যবহার বা প্রিমিয়াম হোটেল, স্পা এবং স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোর জন্য তৈরি করা হয়েছে। তবে, সফল হলে ভবিষ্যতে এর ছোট ও সাশ্রয়ী সংস্করণ বাজারে আসতে পারে।

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মানব ওয়াশিং মেশিনের মতো উদ্ভাবন মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। জাপানের মতো দ্রুতগতির জীবনে, যেখানে সময় বাঁচানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে এই ধরনের স্বয়ংক্রিয় পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থা খুবই উপযোগী হতে পারে। এটি বিশেষ করে বয়স্ক বা শারীরিকভাবে দুর্বল ব্যক্তিদের জন্য সহায়ক হতে পারে, যাদের পক্ষে প্রচলিত গোসলের পদ্ধতি কঠিন। ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যসেবা, ফিটনেস ট্র্যাকিং এবং মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতির মতো আরও অনেক সুবিধা এই ধরনের যন্ত্রে যুক্ত হতে পারে। এই উদ্ভাবন বিশ্বজুড়ে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা প্রযুক্তির ভবিষ্যতে এক নতুন প্রবণতা সৃষ্টি করতে পারে।

এম আর এম – ২৪০৯,Signalbd.com

মন্তব্য করুন
Advertisement

Related Articles

Back to top button