বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) আসন্ন আসরকে সামনে রেখে অনুষ্ঠিত নিলামে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়ে ভিত্তি মূল্যের দ্বিগুণেরও বেশি দামে বিক্রি হয়েছেন জাতীয় দলের উইকেটরক্ষক-ব্যাটসম্যান মোহাম্মদ মিঠুন। ‘সি’ ক্যাটাগরিতে ২২ লাখ টাকা ভিত্তিমূল্য থাকা মিঠুনকে ৫২ লাখ টাকায় দলে ভিড়িয়েছে ঢাকা ক্যাপিটালস। নিলাম প্রক্রিয়া শুরুর আগে সরাসরি চুক্তি এবং নিলাম মিলিয়ে প্রতিটি ফ্র্যাঞ্চাইজিকে ন্যূনতম ১২ জন স্থানীয় এবং ২ জন বিদেশি ক্রিকেটার কিনতে হবে। নিলামের এই দাম হাঁকানোর লড়াই যেমন অনেক তরুণ ক্রিকেটারের ভাগ্য খুলে দিয়েছে, তেমনি অভিজ্ঞতার বিচারে পিছিয়ে পড়া মুশফিকুর রহিম, মুমিনুল হক ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ এর মতো সিনিয়র ক্রিকেটারদের অবিক্রিত থাকা জন্ম দিয়েছে নানা আলোচনার। বিপিএল কর্তৃপক্ষ এবার ড্রাফট পদ্ধতি ছেড়ে আবার নিলাম পদ্ধতিতে ফিরেছে।
মোহাম্মদ মিঠুনের দাম ও দলবদলের লড়াই
নিলামের ‘সি’ ক্যাটাগরির অন্যতম আকর্ষণ ছিলেন মোহাম্মদ মিঠুন। তার ভিত্তিমূল্য মাত্র ২২ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হলেও, তাকে দলে ভেড়ানোর জন্য ফ্র্যাঞ্চাইজিদের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যায়। বিশেষ করে নোয়াখালী এক্সপ্রেস, সিলেট টাইটান্স ও ঢাকা ক্যাপিটালসের মধ্যে এই লড়াই জমে ওঠে। শেষ পর্যন্ত ঢাকা ক্যাপিটালস ৫২ লাখ টাকায় মিঠুনকে কিনে নেয়, যা তাঁর ভিত্তিমূল্যের দ্বিগুণেরও বেশি।
একই ক্যাটাগরিতে থাকা আরেক তারকা নাহিদ রানাকে ৫৬ লাখ টাকায় কিনেছে রংপুর রাইডার্স। মিঠুনের এই উচ্চ মূল্যে বিক্রি হওয়া ইঙ্গিত দেয় যে, অভিজ্ঞতা এবং উইকেটরক্ষক হিসেবে তাঁর বহুমুখী দক্ষতা এখনও দলগুলোর কাছে মূল্যবান। যদিও জাতীয় দলের হয়ে তাঁর সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স প্রত্যাশিত ছিল না, ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো তার অভিজ্ঞতার ওপর আস্থা রেখেছে।
সিনিয়রদের প্রতি অনীহা: অবিক্রিত যারা
বিপিএলের এবারের নিলামের সবচেয়ে বড় চমক হলো অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের প্রতি ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর অনীহা। জাতীয় দলের গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেটার এবং দীর্ঘদিন ধরে দেশের ক্রিকেটে অবদান রাখা তিন সিনিয়র খেলোয়াড় – মুশফিকুর রহিম, মুমিনুল হক ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ – অবিক্রিত রয়ে গেছেন।
মুশফিকুর রহিম ‘বি’ ক্যাটাগরিতে ৩৫ লাখ টাকা ভিত্তিমূল্যে থাকলেও কোনো দল তাঁর প্রতি আগ্রহ দেখায়নি। টেস্ট স্পেশালিস্ট হিসেবে পরিচিত মুমিনুল হক প্রথম ও দ্বিতীয়বারে নাম উঠানোর পরেও অবিক্রিতই থাকেন। এছাড়া লম্বা সময় ধরে দেশের ফিনিশারের ভূমিকা পালন করা মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ এর নাম নিলামে উঠলেও কেউই আগ্রহ দেখায়নি। এই ঘটনা বাংলাদেশের ক্রিকেটে তরুণ নির্ভরতা বৃদ্ধির এবং অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে গুরুত্ব কমে আসার ইঙ্গিত দেয়।
তরুণ তারকাদের ভাগ্যবদল ও উচ্চ মূল্য
তরুণ ক্রিকেটারদের মধ্যে বেশ কয়েকজন নিলামে ভালো দাম পেয়েছেন। এশিয়া কাপ রাইজিং স্টারস টুর্নামেন্টে ২২৮ রান করে তৃতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হওয়া হাবিবুর রহমান সোহানকে তাঁর ভিত্তিমূল্য ১৮ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০ লাখ টাকায় কিনেছে নোয়াখালী এক্সপ্রেস। একই টুর্নামেন্টে ঝলক দেখানো আবদুল গাফ্ফার সাকলাইনকে ৪৪ লাখ টাকায় দলে নিয়েছে রাজশাহী ওয়ারিয়র্স।
এছাড়াও, তাওহীদ হৃদয়কে ৯২ লাখ টাকায় রংপুর রাইডার্স, শামিম পাটোয়ারিকে ৫৬ লাখে ঢাকা ক্যাপিটালস, তানজিম হাসান সাকিবকে ৬৫ লাখে রাজশাহী ওয়ারিয়র্স এবং সাইফউদ্দিনকে ৬৮ লাখে ঢাকা ক্যাপিটালস কিনেছে। নাঈম শেখ ‘এ’ ক্যাটাগরিতে ৫০ লাখ ভিত্তিমূল্য থাকা সত্ত্বেও তীব্র লড়াইয়ের পর ১ কোটি ১০ লাখ টাকায় চট্টগ্রাম রয়্যালসে গেছেন। এই উচ্চ মূল্য প্রমাণ করে যে ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো ভবিষ্যৎ তারকা এবং টি-টোয়েন্টি স্পেশালিস্টদের ওপর বিপুল বিনিয়োগ করতে প্রস্তুত।
সরাসরি চুক্তিতে কে কোন দলে: ফ্র্যাঞ্চাইজি বিন্যাস
নিলাম প্রক্রিয়া শুরুর আগেই প্রতিটি দল তাদের পছন্দের কিছু খেলোয়াড়কে সরাসরি চুক্তির মাধ্যমে দলে অন্তর্ভুক্ত করেছিল। ৬টি ফ্র্যাঞ্চাইজির মধ্যে সরাসরি চুক্তিতে থাকা স্থানীয় ও বিদেশি খেলোয়াড়দের তালিকা:
- ঢাকা ক্যাপিটালস: স্থানীয়: তাসকিন আহমেদ ও সাইফ হাসান। বিদেশি: অ্যালেক্স হেলস ও উসমান খান।
- সিলেট টাইটান্স: স্থানীয়: মেহেদী হাসান মিরাজ ও নাসুম আহমেদ। বিদেশি: মোহাম্মদ আমির ও সাইম আইয়ুব।
- রংপুর রাইডার্স: স্থানীয়: মোস্তাফিজুর রহমান ও নুরুল হাসান। বিদেশি: খাজা নাফে ও সুফিয়ান মুকিম।
- নোয়াখালী এক্সপ্রেস: স্থানীয়: হাসান মাহমুদ ও সৌম্য সরকার। বিদেশি: জনসন চার্লস ও কুশল মেন্ডিস।
- রাজশাহী ওয়ারিয়র্স: স্থানীয়: নাজমুল হোসেন শান্ত ও তানজিদ হাসান তামিম। বিদেশি: সাহিবজাদা ফারহান ও মোহাম্মদ নাওয়াজ।
- চট্টগ্রাম রয়্যালস: স্থানীয়: শেখ মেহেদী হাসান ও তানভীর ইসলাম। বিদেশি খেলোয়াড়: আবরার আহমেদ।
নিলাম পদ্ধতি ও বাজেট ব্যবস্থাপনা
বিপিএল কর্তৃপক্ষ এবার ড্রাফট পদ্ধতি বাতিল করে আবার নিলাম পদ্ধতিতে ফিরেছে। এই আসরে মোট ৬টি দল ৯ কোটি করে মোট ৫৪ কোটি টাকা বাজেট নিয়ে নিলাম টেবিলে বসেছে। প্রথম তিন ক্যাটাগরির (এ, বি, ও সি) নিলাম শেষে ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর হাতে থাকা অর্থের পরিমাণ:
- নোয়াখালী এক্সপ্রেস: ৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা
- সিলেট টাইটান্স: ৩ কোটি ২ লাখ টাকা
- রাজশাহী ওয়ারিয়র্স: ২ কোটি ৮২ লাখ টাকা
- ঢাকা ক্যাপিটালস: ২ কোটি ১৬ লাখ টাকা
- রংপুর রাইডার্স: ১ কোটি ৯০ লাখ টাকা
- চট্টগ্রাম রয়্যালস: ১ কোটি ১৫ লাখ টাকা
নিলামের নিয়মানুযায়ী, ক্যাটাগরি ‘এ’ এবং ‘বি’ থেকে ন্যূনতম দুইজন করে খেলোয়াড় নিতে হবে। নিয়মের মারপ্যাঁচে মাহিদুল অঙ্কন ও জাকের আলীকে ভিত্তিমূল্যেই দলে ভিড়িয়েছে নোয়াখালী এক্সপ্রেস, কারণ তখনও এই দুই ক্যাটাগরি থেকে তাদের খেলোয়াড় কেনা বাকি ছিল।
বিসিবি সভাপতির প্রত্যাশা ও মেয়েদের বিপিএল
নিলাম প্রক্রিয়া শুরুর আগে বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বাবুল বক্তব্য রাখেন। তিনি ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর কাছে বিভিন্ন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন এবং ড্রাফট থেকে নিলাম পদ্ধতিতে ফেরার কারণ ব্যাখ্যা করেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা ছিল, তিনি অচিরেই মেয়েদের বিপিএল আয়োজন করার প্রত্যায় ব্যক্ত করেন। এই ঘোষণা দেশের নারী ক্রিকেটের জন্য একটি বড় সুসংবাদ।
তারুণ্যের জয় ও অভিজ্ঞতার উপেক্ষা
বিপিএলের এই নিলাম স্পষ্টতই তারুণ্যনির্ভর ক্রিকেটের দিকে ঝুঁকে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়। মোহাম্মদ মিঠুন উচ্চ মূল্যে বিক্রি হলেও, মুশফিকুর রহিম, মুমিনুল হক ও মাহমুদউল্লাহর মতো অভিজ্ঞদের অবিক্রিত থাকা দেশের ক্রিকেটে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই নিলাম কেবল খেলোয়াড় কেনাবেচার মঞ্চ ছিল না, এটি দেশের টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ প্রবণতাও নির্ধারণ করে দিল। দলগুলোর বাজেট এবং খেলোয়াড় নির্বাচনের কৌশল দেখে মনে হচ্ছে, আসন্ন বিপিএল আসরে তারুণ্যের ঝলক দেখতে পাবে দর্শকরা।
এম আর এম – ২৪২৪,Signalbd.com



