খেলা

বেরোবিতে দেড় হাজার প্রতিযোগীর সর্ববৃহৎ দৌড় প্রতিযোগিতা

Advertisement

রংপুরে এক অসাধারণ, প্রাণবন্ত ও ইতিহাসগড়া আয়োজনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হলো বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সংগঠন ‘বেরোবি শিক্ষার্থী পরিষদ’-এর উদ্যোগে দৌড় প্রতিযোগিতা। বিশ্ববিদ্যালয় এবং নগরজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত এই আয়োজনকে রংপুরের সাম্প্রতিক সময়ের সর্ববৃহৎ দৌড় প্রতিযোগিতা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে—যেখানে অংশ নেন প্রায় দেড় হাজার শিক্ষার্থী, তরুণ ও ক্রীড়াপ্রেমী অংশগ্রহণকারী।

৩০ নভেম্বর রোববার সকালে রংপুরের শহীদ আবু সাঈদ চত্বর থেকে দৌড় প্রতিযোগিতার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন বেরোবি শিক্ষার্থী পরিষদের সভাপতি মো. আহমাদুল হক আলবীর। বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে সকাল থেকেই তরুণদের ঢল নামে—প্রতিযোগীরা টি-শার্ট পরে, সংখ্যাযুক্ত ব্যাজ লাগিয়ে উচ্ছ্বাস, স্লোগান আর প্রাণোচ্ছল পরিবেশে লাইনে দাঁড়ান।

প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার জন্য আগেই অনলাইন ও অফলাইন রেজিস্ট্রেশনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমেই গঠিত হয় প্রায় ১৫০০ প্রতিযোগীর বিশাল দল, যা আয়োজনটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ যুব উৎসবে রূপ দেয়।

ইতিহাস গড়ার পথে তরুণদের সমবেত পদচারণা

শহীদ আবু সাঈদ চত্বর থেকে শুরু হওয়া দৌড় প্রতিযোগিতাটি রংপুর নগরীর অন্যতম ব্যস্ততম শাপলা চত্বর ঘুরে আবার একই স্থানে এসে শেষ হয়। পুরো নগরজুড়ে সকাল বেলার স্বাভাবিকতা ভেদ করে প্রতিযোগীদের দ্রুত দৌড়ে এগিয়ে চলার দৃশ্য ছিল অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক। পথজুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, স্থানীয় বাসিন্দা এবং পথচারীরাও ফিনিশ লাইনের পথে দৌড়ানো তরুণদের উচ্ছ্বাস দেখতে ভিড় জমান।

বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে একটি এত বড় আয়োজন রংপুরে নতুন উদাহরণ তৈরি করেছে বলে মনে করেন স্থানীয়রা। কেবল প্রতিযোগিতা নয়—এটি ছিল সুস্থ শরীর, সুস্থ সমাজ এবং ইতিবাচক তরুণ শক্তির বৃহৎ প্রদর্শনী।

উদ্বোধনী বক্তৃতায় সভাপতি আলবীর: “এটি শুধু দৌড় নয়, নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন”

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মো. আহমাদুল হক আলবীর বলেন—
“আজকের আয়োজন শুধু একটি দৌড় প্রতিযোগিতা নয়। এটি তরুণ সমাজকে সুস্থ দেহ ও সুস্থ মনের মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান। ‘চলো একসঙ্গে হাঁটি, একসঙ্গে গড়ি’—এই প্রতিপাদ্যের মাধ্যমে আমরা বলতে চাই, ব্যক্তিগত জীবন হোক বা দেশ গঠনের ক্ষেত্র—তরুণদের সক্রিয়, দায়িত্বশীল এবং প্রাণবন্ত ভূমিকা অপরিহার্য। দেড় হাজার প্রতিযোগীর অংশগ্রহণই প্রমাণ করে তারা ইতিবাচক, সচেতন এবং দেশ গঠনে উৎসুক।”

তিনি আরও বলেন—
“যাঁরা রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে অংশ নিয়েছেন, তাঁদের সবাইকে ধন্যবাদ। আমরা চাই, প্রতিবছর আয়োজনে আরও বেশি তরুণ অংশগ্রহণ করুক। এই আয়োজন আরও বড় হোক, আরও শক্তিশালী হোক।”

আয়োজনের নেতৃত্ব, উদ্যম, পরিকল্পনা ও সংগঠনের দক্ষতার জন্য বেরোবি শিক্ষার্থী পরিষদকে প্রশংসা করেন উপস্থিত সবাই। অনেকেই বলেন—ক্যাম্পাসে এমন উদ্যোগ তরুণদের মানসিক চাপ কমায়, ইতিবাচক প্রতিযোগিতায় যুক্ত করে এবং খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ বাড়ায়।

প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা

আয়োজনে অংশ নেওয়া প্রতিযোগীদের মুখে বিশাল উৎসাহ এবং তৃপ্তির গল্প পাওয়া গেছে।

তৌফিক হাসান তারিক বলেন—

“এত বড় প্রতিযোগিতায় দৌড়ানো সত্যিই দারুণ অভিজ্ঞতা। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার চাপের মধ্যে এ ধরনের আয়োজন আমাদের মানসিক ও শারীরিকভাবে উজ্জীবিত করে। বেরোবি শিক্ষার্থী পরিষদের প্রতিটি আয়োজনই অনুপ্রেরণামূলক।”

অন্য অংশগ্রহণকারী তালেব ইসলাম বলেন—

“এ ধরনের প্রতিযোগিতা তরুণদের শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি মানসিক সতেজতাও বাড়ায়। আজ প্রতিযোগী হিসেবে অংশ নিতে পেরে আমি অত্যন্ত খুশি। চাই প্রতিবছর এমন আয়োজন হোক। এটি শুধু দৌড় নয়; স্বাস্থ্যবান, আত্মবিশ্বাসী ও প্রাণবন্ত আগামী প্রজন্ম গড়ার এক দৃষ্টান্ত।”

মাঠে উপস্থিত দর্শনার্থীরাও প্রতিযোগিতার ঢেউ অনুভব করেছেন। অনেকেই তাদের সন্তানদের নিয়ে এসেছেন অনুষ্ঠানের পরিবেশ দেখাতে। তাদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের এমন কার্যক্রম সামগ্রিকভাবে সমাজে ইতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে দেয়।

আয়োজনে নিরাপত্তা, সেবা ও ব্যবস্থাপনা ছিল প্রশংসনীয়

দৌড় প্রতিযোগিতা নির্বিঘ্ন করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বেচ্ছাসেবক দল, সংগঠনের সদস্য ও স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতা ছিল উল্লেখযোগ্য। প্রতিযোগিতা শুরুর আগে রেখা চিহ্নিতকরণ, রুট ম্যাপ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও জরুরি মেডিকেল সাপোর্ট প্রস্তুত ছিল।

ব্যবস্থাপনায় যেসব সুবিধা রাখা হয়:

  • প্রতিযোগীদের জন্য সমন্বিত রুট ম্যাপ
  • প্রতিটি অংশগ্রহণকারীকে টি-শার্ট
  • সকালের নাশতার ব্যবস্থা
  • মেডিকেল টিম ও পানির স্টেশন
  • নিরাপত্তার জন্য স্বেচ্ছাসেবক দল
  • ফটো ও ভিডিও কাভারেজ

আয়োজকেরা জানান—প্রথম ৮০ জন বিজয়ীকে মেডেল প্রদান করা হয়। ভবিষ্যতে এমন প্রতিযোগিতায় আরও বেশি পুরস্কার যোগ করার পরিকল্পনাও রয়েছে।

রংপুরে কেন ক্রমেই জনপ্রিয় হচ্ছে দৌড় প্রতিযোগিতা?

রংপুরে গত কয়েক বছরে বিভিন্ন সংগঠন, বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্বাস্থ্যসচেতন যুবসমাজ দৌড় প্রতিযোগিতার আয়োজন বাড়িয়ে তুলেছে। কারণ হিসেবে কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করেন বিশেষজ্ঞরা—

১. শারীরিক সুস্থতার প্রতি তরুণদের আগ্রহ বৃদ্ধি

ধূমপান, স্থূলতা, শারীরিক অলসতা থেকে দূরে থাকতে অধিকাংশ তরুণ এখন ফিটনেসে মনোযোগী।

২. মানসিক চাপ কমানোর কার্যকর উপায় দৌড়

বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা, চাকরির প্রস্তুতি—সব মিলিয়ে মানসিক চাপ বড় সমস্যা। দৌড় তরুণদের মনোশান্তি দেয়।

৩. ক্রীড়া সংস্কৃতি পুনরুজ্জীবিত হচ্ছে

করোনার পরে মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এসেছে। তাই মাঠের কার্যক্রম, ক্রীড়া উৎসব, উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

৪. সম্পাদকীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দৌড় প্রতিযোগিতার বড় সামাজিক বার্তা

সুস্থ তরুণ-সমাজ মানেই দেশ এগিয়ে যাবে। এ কারণে বিশ্ববিদ্যালয় ও সামাজিক সংগঠন দৌড়কে নতুন ধরনের আন্দোলন হিসেবে গ্রহণ করছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংগঠনের উদ্যোগে এত বড় আয়োজন—কী বার্তা দিচ্ছে?

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক, সৃজনশীল এবং ক্রীড়া সংগঠন রয়েছে। তবে এত বড় পরিসরের দৌড় প্রতিযোগিতা আয়োজন করা সত্যিই প্রশংসনীয় উদ্যোগ।

এই আয়োজন কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট করে—

  1. শিক্ষার্থীরা কেবল পড়াশোনায় নয়—সামাজিক দায়িত্ববোধেও সচেতন।
  2. তরুণদের নেতৃত্বদানের দক্ষতা বেড়েছে।
  3. ক্যাম্পাসে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
  4. স্বাস্থ্য ও ফিটনেসকে গুরুত্ব দিয়ে নতুন প্রজন্ম এগোচ্ছে।
  5. বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তিও উজ্জ্বল হচ্ছে।

এ ধরনের আয়োজন একটি বৃহৎ শিক্ষার্থী সমাজকে সংযুক্ত করে, একত্রিত করে এবং সৃজনশীল শক্তিতে পরিণত করে। এর প্রভাব কেবল একটি দিনের নয়—বরং দীর্ঘমেয়াদে তরুণদের মানসিকতা ও নেতৃত্বে ইতিবাচক ছাপ ফেলে।

ভবিষ্যতে আরও বড় আয়োজনে কাজ চলছে

বেরোবি শিক্ষার্থী পরিষদ জানায়—
ভবিষ্যতে তারা নতুন রুট, আরও বড় অংশগ্রহণ, পুরস্কারের সংখ্যা বৃদ্ধি, এবং স্বাস্থ্যসচেতনতা নিয়ে ক্যাম্পেইনসহ আরও নানা উদ্যোগ নিতে চায়।

অনেক শিক্ষার্থীই আশা প্রকাশ করেছেন—এক সময় এই প্রতিযোগিতা কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং রংপুর মেট্রো ম্যারাথন বা উত্তরবঙ্গ যুব ম্যারাথন হিসেবে বিস্তৃত হবে।

দেড় হাজার তরুণের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত বেরোবির দৌড় প্রতিযোগিতা রংপুরের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া আবহে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এই আয়োজন তরুণদের জীবনধারা, চিন্তা, মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক নেতৃত্বে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে—এমনটাই আশা করছেন সংশ্লিষ্ট সবাই।

রংপুরের ইতিহাসে এমন বড় ও সুশৃঙ্খল আয়োজন ভবিষ্যতের বিশ্ববিদ্যালয় কার্যক্রম, যুবসমাজের সক্ষমতা এবং স্বাস্থ্যসচেতনতার নতুন দৃষ্টান্ত হয়ে থাকল।

MAH – 14051 I Signalbd.com

মন্তব্য করুন
Advertisement

Related Articles

Back to top button