খুলনা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের প্রধান গেটের সামনে প্রকাশ্যে দুইজনকে গুলি ও কুপিয়ে হত্যার ঘটনার চার দিন পর অবশেষে সদর থানায় মামলা দায়ের হয়েছে। নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে কেউ মামলা করতে সাহস না পাওয়ায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলাটি করেছে। বুধবার (৩ ডিসেম্বর) সকালে খুলনা সদর থানা পুলিশের পক্ষ থেকে ১২/১৪ জনকে অজ্ঞাত আসামিকে একটি মামলা দায়ের করা হয়। মামলার বাদী সদর থানার সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) আমিনুল ইসলাম। এই ঘটনা আদালত চত্বরের মতো একটি সুরক্ষিত এলাকার নিরাপত্তা এবং খুলনার অপরাধ জগতের ভয়াবহ প্রভাবকে তুলে ধরেছে।
হত্যাকাণ্ডের বিবরণ ও পূর্বের ঘটনা
গত রবিবার (৩০ নভেম্বর) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে খুলনা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের প্রধান গেটের সামনের সড়কে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। প্রকাশ্যে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করা হয় হাসিব হাওলাদার এবং ফজলে রাব্বি রাজনকে।
নিহত হাসিব হাওলাদার এবং ফজলে রাব্বি রাজন অস্ত্র মামলায় হাজিরা দিতে আদালত ভবন থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ১০-১২ জন সন্ত্রাসী তাঁদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে খুলনার অপর শীর্ষ সন্ত্রাসী রনি চৌধুরী বাবু ওরফে গ্রেনেড বাবুর সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে পুলিশ প্রাথমিক তদন্তে নিশ্চিত হয়েছে। এই ধরনের হামলা প্রমাণ করে যে, খুলনার অপরাধ জগতে এখনও কিছু কুখ্যাত সন্ত্রাসী গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে।
পরিবারের মামলা না করার কারণ: ‘বি কোম্পানি’ গ্রুপের আতঙ্ক
হত্যাকাণ্ডের চার দিন পেরিয়ে গেলেও নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে কেউ মামলা করতে আসেনি। এই বিষয়ে খুলনা সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মে. শফিকুল ইসলাম জানান, ‘হত্যাকাণ্ডের তিনদিন পার হলেও পরিবারের পক্ষ থেকে কেউ মামলা করেনি। ফলে আজ আমরাই মামলা করলাম।’
নিহত হাসিব হাওলাদারের ভাই সুমন হাওলাদার বুধবার খুলনা প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘আমরা আল্লাহর কাছে বিচার দিয়েছি। আতঙ্কে মামলা করতে পারছি না। রিপনকে গ্রেফতার করে পুলিশ হয়রানি করছে।’ নিহতদের পরিবার সূত্র জানায়, হামলাকারীরা কুখ্যাত ‘বি কোম্পানি’ গ্রুপের সদস্য হওয়ায় ভয়ের কারণে তারা মামলা করতে সাহস পাচ্ছেন না। এই কুখ্যাত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর প্রভাব ও ভীতি স্থানীয়দের মধ্যে এতটাই গভীর যে, তাঁরা বিচার চাইতে পর্যন্ত পিছপা হচ্ছেন।
পুলিশ বাদী হয়ে মামলা দায়ের ও তদন্তের উদ্যোগ
পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করতে কেউ এগিয়ে না আসায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তব্য পালনের অংশ হিসেবে মামলা দায়ের করেছে। কেএমপির সহকারী কমিশনার (মিডিয়া) তাম রোকোনুজ্জামান বলেন, ‘পরিবারকে মামলার জন্য বারবার অনুরোধ করা হলেও তারা রাজি হয়নি। তাই পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করেছে।’
সদর থানার ওসি মে. শফিকুল ইসলাম জানান, এসআই আমিনুল ইসলাম বাদী হয়ে ১২/১৪ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে হত্যাকাণ্ডের মামলাটি দায়ের করেছেন। পুলিশ বসে থাকতে পারে না, তাই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বিশ্লেষণ করছে এবং খুব শিগগিরই তদন্তের ফল জানা যাবে। এই উদ্যোগ খুলনার অপরাধ দমনে পুলিশের সক্রিয় ভূমিকা নিশ্চিত করে।
সন্দেহভাজন রিপন আটক ও ‘ইহুদি বাহিনী’র সংযোগ
এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে গত সোমবার রাত ১০টার দিকে নগরীর নতুন বাজার চর স্কুল গলি থেকে মো. রিপন ওরফে ইহুদি রিপনকে আটক করা হয়। মঙ্গলবার দুপুরে আদালত তাঁকে কারাগারে প্রেরণ করে। সে নতুন বাজার মাছ গলির বাসিন্দা জলিলের ছেলে।
খুলনা থানার অফিসার ইনচার্জ মে. শফিকুল ইসলাম জানান, আটক রিপন বিলুপ্তি হওয়া ইহুদি বাহিনীর শীর্ষ সন্ত্রাসীর একজন। এই বাহিনীর প্রধান ক্রস ফায়ারে নিহত হওয়ার পর ২০০৩ সালে ইহুদি বাহিনী বিলুপ্ত হয়েছিল। তবে ওই গ্রুপের সদস্যরা অন্য গ্রুপে গিয়ে অপরাধ কর্মকাণ্ড অব্যাহত রেখেছে। আটক রিপনকে নিয়ে নিহতদের ভাই সুমন হাওলাদার সংবাদ সম্মেলনে আপত্তি জানালেও, পুলিশ রিপনের সম্পৃক্ততা নিয়ে তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় শনাক্তকরণ এবং সিসি ফুটেজ বিশ্লেষণের ওপর জোর দিচ্ছে।
আদালত চত্বরের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
খুলনা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের প্রধান গেটের সামনে প্রকাশ্যে গুলি ও কুপিয়ে হত্যার এই ঘটনা আদালত চত্বরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে। আদালত এলাকা সাধারণত কঠোর নিরাপত্তামূলক এলাকা হিসেবে বিবেচিত হয়। সেখানে অস্ত্র নিয়ে সন্ত্রাসী হামলা চালানো কীভাবে সম্ভব হলো, তা নিয়ে জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
আদালত চত্বরে যখন আসামিরা হাজিরা দিতে আসেন, তখন তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। এই হামলার ঘটনা বিচারপ্রার্থী এবং সংশ্লিষ্ট সকলের জন্য নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। ভবিষ্যতে আদালত চত্বরের নিরাপত্তা জোরদার করা এবং সন্ত্রাসী কার্যকলাপ কঠোর হাতে দমন করা প্রশাসনের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
খুলনার অপরাধ জগতে ভয়ের রাজত্ব
খুলনায় আদালত চত্বরে জোড়া খুনের ঘটনায় নিহতদের পরিবারের মামলা করতে না পারার ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, এই অঞ্চলে অপরাধ জগতের ভীতি ও প্রভাব কতটা সুদূরপ্রসারী। কুখ্যাত সন্ত্রাসী গ্রুপের সদস্যদের নাম আসার কারণে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার চাইতে পর্যন্ত সাহস পাচ্ছে না। পুলিশের পক্ষ থেকে মামলা দায়ের এবং রিপনসহ অন্যান্য শনাক্তকৃত আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান এই পরিস্থিতিতে কিছুটা আশার সঞ্চার করেছে। তবে খুলনার অপরাধ জগৎ থেকে ভয়ের রাজত্ব দূর করতে হলে শুধু মামলা নয়, বরং এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর নেটওয়ার্ক ও আর্থিক উৎস পুরোপুরি ভেঙে দেওয়া জরুরি।
এম আর এম – ২৪৮১, Signalbd.com



