এডিস মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু বাংলাদেশে এখনও গুরুতর জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে বিদ্যমান। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে নতুন করে আরও ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ে এডিস মশাবাহিত রোগটিতে আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪৯০ জন নতুন রোগী। বুধবার (৩ ডিসেম্বর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু বিষয়ক নিয়মিত প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে। নতুন মৃত্যু নিয়ে চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৯১ জনে। অন্যদিকে, মোট আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় ৯৭ হাজার ছুঁই ছুঁই করছে। বছরের শেষ মাসেও সংক্রমণ এবং মৃত্যুহার বজায় থাকায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
২৪ ঘণ্টার ডেঙ্গু চিত্র: মৃত্যু ও ভর্তির পরিসংখ্যান
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত (২৪ ঘণ্টায়) ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ৫ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। এই মৃত্যুগুলো দেশের বিভিন্ন বিভাগে ঘটেছে:
- ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন: ২ জন
- ময়মনসিংহ বিভাগ: ২ জন
- ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন: ১ জন
এই পরিসংখ্যান দেখায় যে, ডেঙ্গুর কারণে মৃত্যু কেবল রাজধানীতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং দেশের অন্যান্য বিভাগেও এর প্রভাব রয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪৯০ জন। এই সংখ্যা প্রমাণ করে যে, শীতের আগমন সত্ত্বেও ডেঙ্গুর সংক্রমণ এখনও দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় চাপ সৃষ্টি করছে।
বিভাগ ও সিটি কর্পোরেশন ভিত্তিক আক্রান্তের সংখ্যা
গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ৪৯০ জন রোগীর বিভাগভিত্তিক চিত্র:
| বিভাগ/সিটি কর্পোরেশন | নতুন রোগী সংখ্যা |
| ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন | ১০৬ জন |
| চট্টগ্রাম বিভাগ | ৮৮ জন |
| ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন | ৭৭ জন |
| ঢাকা বিভাগ (সিটি কর্পোরেশনের বাইরে) | ৭৪ জন |
| বরিশাল বিভাগ | ৫৮ জন |
| ময়মনসিংহ বিভাগ | ৩৩ জন |
| খুলনা বিভাগ | ২৮ জন |
| রাজশাহী বিভাগ | ১৮ জন |
| রংপুর বিভাগ | ৫ জন |
| সিলেট বিভাগ | ৩ জন |
এই পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী (১০৬ জন) হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগ এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনও রোগী ভর্তির ক্ষেত্রে উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।
চলতি বছরের সামগ্রিক চিত্র: মোট আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার
চলতি বছরে (১ জানুয়ারি থেকে ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত) ডেঙ্গুর সামগ্রিক পরিসংখ্যান জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তুলে ধরে:
- মোট আক্রান্তের সংখ্যা: ৯৬ হাজার ৬৭ জন (প্রায় ৯৭ হাজার)।
- মোট মৃতের সংখ্যা: ৩৯১ জন।
চলতি বছর মোট মৃত্যুর মধ্যে বিভাগভিত্তিক চিত্র:
- ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন: ১৭৯ জন (সর্বাধিক)।
- ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন: ৬৬ জন।
- বরিশাল বিভাগ: ৪৭ জন।
- চট্টগ্রাম বিভাগ: ৩১ জন।
- ময়মনসিংহ বিভাগ: ২৪ জন।
- রাজশাহী বিভাগ: ২০ জন।
- খুলনা বিভাগ: ১৩ জন।
- ঢাকা বিভাগ: ৯ জন।
- সিলেট বিভাগ: ২ জন।
এই তথ্যে দেখা যায়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এলাকায় মৃত্যুহার সবচেয়ে বেশি, যা এই এলাকার জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকেই তুলে ধরে। অন্যদিকে, চলতি বছর সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে বরিশাল বিভাগে (২০ হাজার ৮১৭ জন) এবং সবচেয়ে কম শনাক্ত হয়েছে সিলেট বিভাগে (৩৮৬ জন)।
ডেঙ্গু সংক্রমণ না কমার কারণ: বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বছরের শেষ সময়েও ডেঙ্গুর প্রকোপ অব্যাহত থাকার প্রধান কারণ হলো এডিস মশার অভিযোজন ক্ষমতা এবং নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা। ডেঙ্গুর মৌসুম পরিবর্তন হওয়ায় এখন প্রায় সারা বছর ধরেই এই রোগটির ঝুঁকি থাকছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সিটি কর্পোরেশনগুলোর উচিত ছিল বর্ষা মৌসুমের আগেই মশা নিধনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। কিন্তু সেই সমন্বিত প্রচেষ্টার অভাবে এখন পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হচ্ছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নির্মাণাধীন ভবনে পানি জমা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এডিস মশার প্রজনন ক্ষেত্র বাড়িয়ে দিচ্ছে। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে সরকারের পাশাপাশি সাধারণ জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিজ নিজ প্রাঙ্গণ পরিষ্কার রাখা জরুরি।
চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর চাপ ও অন্যান্য প্রসঙ্গ
ডেঙ্গু রোগীদের ভিড় সামলাতে হাসপাতালগুলো এখনও চাপের মুখে রয়েছে। চিকিৎসায় নিয়োজিত ডাক্তার ও নার্সরা নিরলসভাবে কাজ করে চললেও রোগীর সংখ্যা তাদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। তবে গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে ৫৭৮ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়ায় রোগীর ব্যবস্থাপনা কিছুটা সহজ হয়েছে।
এদিকে, গত বছরের (২০২৩) ভয়াবহতা স্মরণ করলে দেখা যায়, ওই বছর মোট আক্রান্ত হয়েছিলেন ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন এবং মৃত্যু হয়েছিল ১ হাজার ৭০৫ জনের। যদিও চলতি বছরের পরিস্থিতি গত বছরের তুলনায় কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আছে, তবে ৩৯১ জনের মৃত্যু এবং প্রায় লাখ ছুঁই ছুঁই আক্রান্তের সংখ্যা প্রমাণ করে যে ডেঙ্গু একটি জাতীয় জরুরি জনস্বাস্থ্য সমস্যা।
মৃত্যুহার ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ জরুরি
ডেঙ্গুতে একদিনে আরও ৫ জনের মৃত্যু এবং ৪৯০ জন নতুন রোগীর ভর্তি বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যে ডেঙ্গুর স্থায়ী হুমকিকে নির্দেশ করে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর হার এবং বরিশাল বিভাগে সর্বোচ্চ আক্রান্তের সংখ্যা প্রমাণ করে যে, ডেঙ্গু এখন আর কোনো একক এলাকার সমস্যা নয়। সরকারের এবং সিটি কর্পোরেশনগুলোর উচিত দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ নিয়ে মশা নিধন কার্যক্রমকে সারা বছর ধরে কার্যকর করা এবং ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে জাতীয়ভাবে একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তোলা।
এম আর এম – ২৪৭৮, Signalbd.com



