৮ কুকুরছানাকে বস্তাবন্দি করে হত্যা: গ্রেপ্তার সরকারি কর্মকর্তার স্ত্রী কারাগারে
পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলায় পুকুরের পানিতে ডুবিয়ে আটটি কুকুরছানাকে বস্তাবন্দি করে হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত সরকারি কর্মকর্তার স্ত্রী নিশি রহমান (৩৮)-কে আদালতের নির্দেশে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। বুধবার (৩ ডিসেম্বর) বিকেলে তাঁকে পাবনা আমলী আদালত-২ এ সোপর্দ করা হয়। শুনানি শেষে আদালতের বিচারক তরিকুল ইসলাম অভিযুক্ত নিশি রহমানের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এই নৃশংস ও অমানবিক ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে আগামী রবিবার (৬ ডিসেম্বর)।
গ্রেপ্তার ও আদালতে সোপর্দ
ঈশ্বরদীতে কুকুরছানা হত্যার ঘটনায় মঙ্গলবার (২ ডিসেম্বর) রাতে ঈশ্বরদী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আকলিমা খাতুন বাদী হয়ে নিশি রহমানকে একমাত্র আসামি করে থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পর পুলিশ দ্রুত তৎপরতা শুরু করে।
রাত দেড়টার দিকে ঈশ্বরদী থানা পুলিশ ঈশ্বরদী পৌর সদরের একটি ভাড়া বাসা থেকে অভিযুক্ত নিশি রহমানকে গ্রেপ্তার করে। নিশি রহমান ঈশ্বরদী উপজেলা পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের ক্ষুদ্র কৃষক উন্নয়ন ফাউন্ডেশন কর্মকর্তা হাসানুর রহমান নয়নের স্ত্রী। বুধবার বিকেলে তাঁকে ঈশ্বরদী থানা থেকে পাবনার আমলী আদালত-২ এ সোপর্দ করা হয়। পাবনা আমলী আদালত-২ এর জিআরও রফিকুল ইসলাম আদালতের এই সিদ্ধান্তের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
জামিন নামঞ্জুর ও পরবর্তী শুনানি
পাবনার আমলী আদালত-২ এর বিচারক তরিকুল ইসলাম অভিযুক্ত নিশি রহমানের জামিন নামঞ্জুর করে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন। এই ধরনের অমানবিক অপরাধের ক্ষেত্রে আদালতের কঠোর অবস্থান জনমনে আইনের শাসনের প্রতি আস্থা বাড়াবে।
ঈশ্বরদী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার প্রণব কুমার জানান, ‘ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বাদী হয়ে মামলা করেছেন। মামলায় অভিযুক্ত একমাত্র আসামি নিশি রহমানকে রাতেই গ্রেপ্তার করা হয়। আইনগত প্রক্রিয়া শেষে তাঁকে বিকেলে আদালতে সোপর্দ করা হয়।’ আগামী রবিবার (৬ ডিসেম্বর) এই মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেছেন আদালত।
অভিযুক্তের বক্তব্য: বিরক্তি থেকে ছানাদের অপসারণ
পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্ত নিশি রহমান কুকুরছানাগুলোকে হত্যার বিষয়ে কিছু তথ্য দিয়েছেন। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার প্রণব কুমার জানান, জিজ্ঞাসাবাদে নিশি রহমান দাবি করেছেন, কুকুরের ডাক-চিৎকারে বিরক্ত হয়ে তিনি ছানাগুলোকে বস্তায় ভরে পুকুরপাড়ে রেখেছিলেন।
নিশি রহমানের দাবি, ছানাগুলোকে কে পুকুরে ফেলেছে, তা তিনি জানেন না। এই বক্তব্য প্রমাণ করে যে, কুকুরের ডাক-চিৎকারে বিরক্ত হওয়া থেকেই তিনি ছানাগুলোকে অপসারণের মতো চরম পদক্ষেপ নেন। তবে ছানাগুলোকে বস্তায় ভরা এবং তাদের মৃতদেহ পুকুর থেকে উদ্ধারের ঘটনা তাঁর বক্তব্যকে সমর্থন করে না। পুলিশ এখন ঘটনার পেছনের পূর্ণাঙ্গ সত্য উদঘাটনে আরও নিবিড় তদন্ত করছে।
ঘটনার পূর্বসূত্র ও মা কুকুরের করুণ অবস্থা
ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) বাসভবনের একটি কোণায় ‘টম’ নামের একটি কুকুর দীর্ঘদিন ধরে থাকতো। এক সপ্তাহ আগে টম আটটি বাচ্চা প্রসব করে। গত সোমবার সকাল থেকে মা কুকুরটি তার ছানাগুলো না পেয়ে পাগলপ্রায় অবস্থায় কান্না আর ছুটাছুটি করতে দেখা যায়।
উপজেলা পরিষদের কর্মচারীরা পরে জানতে পারেন, অভিযুক্ত কর্মকর্তা হাসানুর রহমান নয়নের স্ত্রী জীবন্ত আটটি কুকুর ছানাকে বস্তার মধ্যে বেঁধে সম্ভবত রোববার রাতের কোনো এক সময় উপজেলা পরিষদের পুকুরে ফেলে দেন। পরদিন সকালে পুকুর থেকে কুকুর ছানাগুলোর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মা কুকুরটির এই করুণ পরিস্থিতি এবং আর্তনাদ সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক সহানুভূতি সৃষ্টি করেছে।
সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও পদক্ষেপ
এই অমানবিক ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মকর্তা হাসানুর রহমান নয়নকেও প্রশাসনিক শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়েছে। ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান জানিয়েছেন, কুকুরছানা হত্যার ঘটনায় ক্ষুদ্র কৃষক ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা হাসানুর রহমান নয়নকে সোমবার (১ ডিসেম্বর) গেজেটেড কোয়ার্টার ছাড়তে লিখিত নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। ইউএনও’র নির্দেশে তারা মঙ্গলবার (২ ডিসেম্বর) বিকেলে বাসা খালি করে অন্যত্র চলে যান। ইউএনও মো. মনিরুজ্জামান এই ঘটনাকে ‘চরম অমানবিক ও নিষ্ঠুর কাজ’ বলে অভিহিত করেছিলেন।
আইন ও মানবাধিকারের প্রশ্ন: বিচারের প্রয়োজনীয়তা
পশুপ্রেমী এবং পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো এই ঘটনার বিচার দাবিতে সোচ্চার হয়েছে। আইন অনুযায়ী, জীবজন্তুকে এভাবে হত্যা করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই মামলা এবং আদালতের জামিন নামঞ্জুর প্রমাণ করে যে, প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা রোধে দেশের আইনি ব্যবস্থা এখন কার্যকর হচ্ছে।
এই রায়টি সমাজে একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করবে যে, ক্ষমতায় থাকা বা সরকারি পদে অধিষ্ঠিত কারও স্ত্রী হলেও আইন সবার জন্য সমান। এই ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া না হলে, সমাজে মানবিকতার অবক্ষয় আরও বাড়তে পারে। এই মামলাটি দেশের প্রাণী কল্যাণ আইনের প্রয়োগের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে থাকবে।
মানবিকতার অবক্ষয় ও আদালতের রায়
আটটি কুকুরছানাকে বস্তাবন্দি করে হত্যার ঘটনাটি নিশি রহমানের জামিন নামঞ্জুর হওয়ার মধ্য দিয়ে একটি কঠোর বার্তা দিয়েছে। এই ঘটনা একদিকে যেমন মাদকাসক্ত স্বামীর মতো সামাজিক সমস্যার জন্ম দিতে পারে, তেমনি ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা ব্যক্তিদের অমানবিক আচরণকেও তুলে ধরে। আদালতের এই রায় দেশের সাধারণ মানুষ ও পশুপ্রেমী সংগঠনগুলোর মধ্যে ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থা বাড়াবে। আগামী রবিবার মামলার পরবর্তী শুনানিতে এই নৃশংস ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিচার প্রক্রিয়া আরও এগিয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এম আর এম – ২৪৭৪, Signalbd.com



