আঞ্চলিক

চুয়াডাঙ্গা সীমান্তে গুলির পর বাংলাদেশিকে ‘ধরে নিয়ে গেছে’ বিএসএফ

Advertisement

চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার গয়েশপুর সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ)’র গুলিতে শহিদুল ইসলাম (৩৭) নামে এক বাংলাদেশি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। শহীদুলের পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, গুলি করার পর বিএসএফ তাকে ধরে নিয়ে গেছে। এই ঘটনার পর শহিদুলের স্ত্রী নাসরিন আকতার স্বামীর মৃত্যুর খবর পেয়েছেন বলেও দাবি করেছেন, যা এলাকায় শোকের মাতম তৈরি করেছে। শনিবার (২৯ নভেম্বর) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। অন্যদিকে বিএসএফের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, শহিদুল ইসলাম মাদক কারবারি দলের সদস্য ছিলেন।

পরিবারের অভিযোগ: ঘাস কাটতে গিয়েছিলেন শহিদুল

শহিদুল ইসলামের বাড়ি জীবননগর উপজেলার গয়েশপুর গ্রামের উত্তরপাড়ায়। তার স্ত্রী নাসরিন আকতার গণমাধ্যমকে জানান, শনিবার বিকেলে শহিদুল ইসলাম গরুর জন্য ঘাস কাটতে মাধবখালী সীমান্তের দোয়ালের মাঠে গিয়েছিলেন। তিনি অভিযোগ করেন, সেখান থেকে বিএসএফ সদস্যরা শহিদুলকে ধরে নিয়ে গুলি করে।

নাসরিন আকতারের দাবি, তাদের পরিচিতজনদের কাছ থেকে তিনি খবর পেয়েছেন যে, শহিদুল ইসলাম ঘটনাস্থলেই নিহত হয়েছেন এবং তাঁর লাশ সীমান্তে ফেলে রাখা হয়েছে। পরিবারের এমন দাবি স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, ঘাস কাটতে যাওয়া একজন নিরীহ মানুষ কেন বিএসএফের গুলির শিকার হবেন?

বিএসএফের দাবি: শহিদুল মাদক কারবারি

এ ঘটনার পর ঝিনাইদহের মহেশপুর ৫৮ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্ট্যান্ট কর্নেল রফিকুল আলম জানিয়েছেন, বিএসএফের পক্ষ থেকে শহিদুল ইসলামকে মাদক কারবারি বলে দাবি করা হচ্ছে। বিজিবির পক্ষ থেকে দ্রুত বিএসএফের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।

ভারতের পশ্চিম বঙ্গের নদীয়া জেলার ৩২ ব্যাটালিয়ন বিএসএফের কমান্ডেন্ট সুজিত কুমার বিজিবিকে জানান, শহিদুল ইসলামসহ ৬ জনের একটি দল বিকেলে ভারতের অভ্যন্তরে মাদক আনতে গিয়েছিল। এ সময় তারা ভারতের মাটিয়ারী ক্যাম্পের বিএসএফ সদস্যদের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। বিএসএফের দাবি, শহিদুল ইসলাম এ সময় তার ব্যাগে থাকা হাঁসুয়া বের করে বিএসএফ সদস্যদের ওপর চড়াও হলে আত্মরক্ষার্থে বিএসএফ এক রাউন্ড গুলি ছোড়ে।

বিএসএফের তথ্যে বিভ্রান্তি: আহত না নিহত?

বিএসএফের পক্ষ থেকে প্রথমে বিজিবিকে জানানো হয়েছিল, তাদের ছোড়া গুলিতে শহিদুল আহত হয়েছেন এবং তাকে চিকিৎসার জন্য ভারতের কৃষ্ণনগর হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্ট্যান্ট কর্নেল রফিকুল আলম বলেন, ‘শহিদুল গুলিবিদ্ধ হয়েছে বলে বিএসএফ জানিয়েছে। তাকে ভারতীয় হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে, তবে তার মৃত্যুর বিষয়ে কিছু জানায়নি।’

কিন্তু পরবর্তীতে রাতে বিএসএফের পক্ষ থেকে তথ্যের পরিবর্তন আসে। রাত ৮টার সময় বিএসএফ বিজিবিকে আবারও জানায় যে, শহিদুল ইসলাম নিহত হয়েছেন এবং তাঁর মৃতদেহ বর্তমানে ভারতীয় পুলিশের কাছে আছে। বিএসএফের দেওয়া তথ্যে এই অসঙ্গতি বা পরিবর্তন সীমান্ত এলাকায় আরও বেশি জল্পনা ও সন্দেহের জন্ম দিয়েছে।

সীমান্ত এলাকায় মাদক চোরাচালানের পূর্বপটভূমি

জীবননগর উপজেলার গয়েশপুর সীমান্ত এলাকাটি মাদক চোরাচালানের জন্য সংবেদনশীল হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, এই সীমান্ত পথ ব্যবহার করে প্রায়শই মাদক কারবারিরা ভারতে প্রবেশ করে এবং মাদক নিয়ে বাংলাদেশে ফেরে। শহিদুল ইসলাম মাদক কারবারি ছিলেন কি না, তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, স্থানীয়দের একাংশ জানিয়েছে যে শহিদুল ইসলামসহ ৬-৭ জন শনিবার বিকেলে ভারতের অভ্যন্তরে মাদক আনতে গিয়েছিলেন। তারা গয়েশপুর সীমান্তের ৭০ নম্বর মেইন পিলার থেকে প্রায় ২০০ গজ ভারতের অভ্যন্তরে পৌঁছালে বিএসএফের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন।

সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোর বাসিন্দারা প্রায়শই দারিদ্র্য ও কাজের অভাবে এই ধরনের অবৈধ কাজে জড়িয়ে পড়ে। যদিও কোনো ধরনের অপরাধে যুক্ত থাকা আইনত দণ্ডনীয়, কিন্তু এই ধরনের সংঘর্ষে বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যু বা আহতের ঘটনা সীমান্ত এলাকার মানুষের জীবনকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।

সীমান্ত হত্যা ও মানবাধিকারের প্রশ্ন

বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যু বা আহতের ঘটনা নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে এমন ঘটনা ঘটে চলেছে, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো দ্বারা সমালোচিত। প্রতিটি ঘটনার পর বিএসএফ আত্মরক্ষার যুক্তি দেখালেও, কেন নিরস্ত্র বা ছোটখাটো অপরাধে যুক্ত ব্যক্তিকে গুলি করা হয়, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

মানবাধিকার কর্মীরা মনে করেন, সীমান্তে বিএসএফের উচিত ‘জিরো কিলিং’ নীতি কঠোরভাবে মেনে চলা। মাদক বা চোরাচালানের মতো অপরাধের জন্য কাউকে গ্রেপ্তার করে আইনি প্রক্রিয়ায় সোপর্দ করা উচিত, কিন্তু গুলি করে হত্যা করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এই ধরনের ঘটনা দুই বন্ধুপ্রতিম দেশের মধ্যেকার সম্পর্ককেও প্রভাবিত করে।

বিজিবি-বিএসএফের পরবর্তী পদক্ষেপ ও প্রত্যাশা

এই ঘটনার পর দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বিজিবি এই ঘটনায় তীব্র প্রতিবাদ জানাবে এবং শহিদুলের মরদেহ দ্রুত ফেরত দেওয়ার দাবি জানাবে। বিজিবির পক্ষ থেকে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের আহ্বান জানানো হবে।

লেফটেন্ট্যান্ট কর্নেল রফিকুল আলম বলেন, বিজিবি সীমান্তে শান্তি বজায় রাখতে এবং এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে বিএসএফের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রক্ষা করছে। তবে স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সীমান্তে যেন আর কোনো বাংলাদেশি নাগরিককে গুলি করে হত্যা বা আহত করা না হয় এবং সীমান্তরক্ষী বাহিনী যেন মানবধিকার রক্ষায় আরও বেশি সংবেদনশীল হয়। এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে উভয় দেশের পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

এম আর এম – ২৪২০,Signalbd.com

মন্তব্য করুন
Advertisement

Related Articles

Back to top button