চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলায় শ্রমিক সেজে কাজ করার সময় ২২ জন রোহিঙ্গাকে আটক করেছে উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ। শুক্রবার (২৮ নভেম্বর) দিবাগত রাতে উপজেলার ছদাহা ও কেওচিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে যৌথ অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, আটক হওয়া এই রোহিঙ্গারা কক্সবাজারের শরণার্থী ক্যাম্প থেকে পালিয়ে এসে দেশের মূল ভূখণ্ডে বিভিন্ন পেশায় কাজ করছিল। তাদের সকলের ক্যাম্প থেকে পালানোর প্রবণতা নিয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। আটককৃতদের পুলিশের মাধ্যমে পুনরায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে।
অভিযানের বিস্তারিত: ছদাহা ও কেওচিয়ার শ্রমিক এলাকা
সাতকানিয়া উপজেলা প্রশাসন ও থানা পুলিশের সমন্বয়ে গঠিত একটি যৌথ দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এই অভিযান পরিচালনা করে। অভিযান পরিচালনাকারী কর্মকর্তারা জানান, প্রথমে ছদাহা ইউনিয়নে তল্লাশি চালানো হয়। সেখান থেকে নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করা অবস্থায় ১০ জন রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়। এই রোহিঙ্গারা স্থানীয় নির্মাণ প্রকল্পগুলোতে অত্যন্ত কম মজুরিতে কাজ করছিল।
পরবর্তীতে, অভিযানটি কেওচিয়া ইউনিয়নের নয়া খালের মুখ এলাকার একটি ইটভাটা লক্ষ্য করে পরিচালিত হয়। সেখানে কাজ করার সময় আরও ১২ জন রোহিঙ্গাকে আটক করে পুলিশ। সব মিলিয়ে একদিনের অভিযানে মোট ২২ জন রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়। তারা সকলেই স্থানীয় মানুষের সঙ্গে মিশে থাকার চেষ্টা করছিল এবং নিজেদের বাংলাদেশি শ্রমিক হিসেবে পরিচয় দিচ্ছিল।
আটক রোহিঙ্গাদের পেশা ও ছদ্মবেশ
আটক হওয়া ২২ জন রোহিঙ্গার মধ্যে অধিকাংশই ছিল নির্মাণ শ্রমিক এবং ইটভাটার শ্রমিক। কক্সবাজারের শরণার্থী ক্যাম্পের কঠোর বিধিনিষেধ থেকে বেরিয়ে এসে তারা মূলত কাজের সন্ধানে সাতকানিয়ার মতো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছিল। তারা সাধারণত এমন পেশা বেছে নেয় যেখানে পরিচয়পত্র যাচাইয়ের প্রয়োজন কম থাকে। শ্রমিক সেজে তারা সহজেই স্থানীয় জনস্রোতে মিশে যেতে পারছিল।
এই রোহিঙ্গারা খুব কম মজুরিতে কাজ করায় স্থানীয় শ্রমবাজারে অস্বাভাবিক প্রভাব ফেলছে। কম মজুরির কারণে বাংলাদেশি শ্রমিকরা কাজ হারাচ্ছেন বা ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এই প্রবণতা কেবল সাতকানিয়া নয়, বরং কক্সবাজারের বাইরের অন্যান্য অঞ্চলেও দেখা যাচ্ছে, যা দেশের শ্রমবাজার এবং অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
প্রশাসনের বক্তব্য ও পরবর্তী পদক্ষেপ
সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসান গণমাধ্যমকে আটক সম্পর্কে বিস্তারিত জানান। তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের অবস্থানের সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়ার পরই আমরা রাতে অভিযান চালাই। আটক হওয়া রোহিঙ্গারা ক্যাম্প থেকে পালিয়ে এসে অবৈধভাবে বিভিন্ন পেশায় কাজ করছিল।’
ইউএনও আরও নিশ্চিত করেন যে, আটক ২২ জন রোহিঙ্গাকে কোনো প্রকার আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই সরাসরি পুলিশের মাধ্যমে তাদের স্ব স্ব রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এই ধরনের অভিযান নিয়মিতভাবে পরিচালনা করা হবে বলেও তিনি জানান, যাতে রোহিঙ্গারা ক্যাম্পের বাইরে যেতে না পারে এবং স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা বজায় থাকে।
“আটক হওয়া রোহিঙ্গারা ক্যাম্প থেকে পালিয়ে এসে বিভিন্ন পেশায় কাজ করছিলেন। তাদেরকে পুলিশের মাধ্যমে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ফেরত পাঠানো হচ্ছে।” — খোন্দকার মাহমুদুল হাসান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সাতকানিয়া
ক্যাম্প থেকে পালানোর মূল কারণ বিশ্লেষণ
রোহিঙ্গাদের ক্যাম্প থেকে পালিয়ে এসে দেশের অভ্যন্তরে ছড়িয়ে পড়ার মূল কারণ হিসেবে একাধিক বিষয়কে চিহ্নিত করা যায়। প্রথমত, ক্যাম্পের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এবং দীর্ঘসূত্রিতা তাদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করছে। দ্বিতীয়ত, ক্যাম্পে কাজের সুযোগের অভাব এবং বাইরের জগতে অর্থ উপার্জনের লোভ তাদের ঝুঁকি নিতে উৎসাহিত করছে। ক্যাম্পের বাইরে কাজ করে তারা যা উপার্জন করে, তা ক্যাম্পের জীবনের চেয়ে তুলনামূলকভাবে ভালো।
এছাড়াও, কিছু অসাধু চক্র রোহিঙ্গাদের ক্যাম্প থেকে বের করে আনতে এবং তাদের কাজে লাগাতে সহযোগিতা করছে। এই চক্রগুলো মানবপাচার এবং অবৈধ কাজে রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করে ফায়দা লুটছে। এই ধরনের চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে, এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
আইন-শৃঙ্খলা ও সামাজিক প্রভাব
রোহিঙ্গারা ক্যাম্প থেকে পালিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ায় কেবল শ্রমবাজারের সমস্যাই সৃষ্টি হচ্ছে না, এটি দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। রোহিঙ্গাদের অনেকেই সামান্য অপরাধ থেকে শুরু করে মাদক চোরাচালান ও মানবপাচারের মতো গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে বলে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ উঠেছে। সাতকানিয়ায় শ্রমিক সেজে কাজ করতে গিয়ে আটক হওয়া এই ২২ জন যদিও সরাসরি অপরাধে যুক্ত ছিল না, কিন্তু তাদের অবৈধ অনুপ্রবেশ স্থানীয় সমাজে নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলে ধরে।
স্থানীয় বাসিন্দারা প্রায়শই ক্যাম্প থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের কারণে নানা ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার সম্মুখীন হন। এই কারণে স্থানীয় জনগণের মধ্যে রোহিঙ্গাদের উপস্থিতি নিয়ে একধরনের অসন্তোষ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের চারপাশে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ এবং কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও রোহিঙ্গারা নানা কৌশলে ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে পড়ছে। সাতকানিয়ায় ২২ জন রোহিঙ্গার আটক হওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে যে, ক্যাম্পগুলোর নিরাপত্তা ও নজরদারিতে এখনও বেশ কিছু দুর্বলতা রয়ে গেছে।
এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে কেবল অভিযান চালিয়ে তাদের ফেরত পাঠালেই হবে না, বরং ক্যাম্পের নিরাপত্তা জোরদার করার পাশাপাশি, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য ক্যাম্পে নিয়ন্ত্রিত উপায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। এছাড়াও, যেসব অসাধু চক্র রোহিঙ্গাদের পালানোতে সহায়তা করছে, তাদের দ্রুত চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি। এই সমস্যার সমাধান না হলে ভবিষ্যতে দেশের আরও বহু এলাকায় রোহিঙ্গারা ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং তা দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হতে পারে।
এম আর এম – ২৪১৭,Signalbd.com



