রাজশাহীতে পদ্মা নদীর পানি বিপজ্জনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। টানা বর্ষণ ও উজানের ঢলে পানি গত কয়েক সপ্তাহে ক্রমশ বাড়ছে। শহরের নিম্নাঞ্চলগুলো ইতিমধ্যেই প্লাবিত হয়েছে, যার মধ্যে তালাইমারী, শ্রীরামপুর, পঞ্চবটি এবং সীমান্তবর্তী চরখিদিরপুর উল্লেখযোগ্য। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে ঘরবাড়ি ছেড়ে বাঁধের ওপর বা খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের হালনাগাদ তথ্য
রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১০ আগস্ট সকাল ৬টায় পদ্মার পানির উচ্চতা ছিল ১৭.১৩ মিটার, ১১ আগস্ট তা বেড়ে ১৭.৩২ মিটার এবং ১২ আগস্ট ১৭.৪৩ মিটার। বিপৎসীমা ১৮.০৫ মিটার। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় সরকারি কর্তৃপক্ষ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
নিম্নাঞ্চলের পরিস্থিতি
তালাইমারী, কাজলা, পঞ্চবটি, পাঠানপাড়া, লালনশাহ মঞ্চ ও শ্রীরামপুরসহ বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল জলমগ্ন হয়েছে। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা তালাইমারী ও পঞ্চবটিতে। বাসিন্দারা ঘর ছেড়ে বাঁধের ধারে বা আত্মীয়দের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। এছাড়া সাপের উপস্থিতি ও অন্যান্য প্রাণীর ভয়ে অনেকেই আতঙ্কে রয়েছেন।
গোদাগাড়ীর চর আষাড়িয়াদহ, পবার চরখিদিরপুর ও বাঘার চকরাজাপুরের নিম্নাঞ্চলও প্লাবিত হয়েছে। পদ্মার দুই তীরে ভাঙন দেখা দিয়েছে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে চকরাজাপুরে। এখানে অনেক ঘরবাড়ি এবং কবরস্থান নদীতে তলিয়ে গেছে। চরখিদিরপুরের বাসিন্দারা গবাদিপশু ও মালপত্র নিয়ে অন্যত্র চলে গেছেন।
টি–বাঁধ ও আই–বাঁধে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা
পানি বিপৎসীমায় পৌঁছানোর কারণে রাজশাহীর টি–বাঁধ ও আই–বাঁধে জনসাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সোমবার সন্ধ্যা থেকে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং টুরিস্ট পুলিশ মিলে এই এলাকায় প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুর রহমান জানান, ভারতে অতিবৃষ্টি এবং ফারাক্কা ড্যামের অধিকাংশ কপাট খোলা থাকায় পদ্মার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে প্রশাসন এই নিষেধাজ্ঞা আরও জোরদার করবে।
নিরাপত্তা ও জরুরি প্রস্তুতি
পানি বৃদ্ধির কারণে জেলার বিভিন্ন এলাকায় জরুরি ব্যবস্থাপনা শুরু হয়েছে। বিপদগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য রেড ক্রস এবং স্থানীয় প্রশাসন খাদ্য ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করছে। উপজেলা ও থানা পর্যায়ে উদ্ধার দলের প্রস্তুতি রাখা হয়েছে।
স্থানীয়রা ঘরবাড়ি ত্যাগ করে নদী তীরবর্তী উঁচু স্থানগুলোতে আশ্রয় নিচ্ছেন। সরকারি কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলছেন, পানি বৃদ্ধি এখনও থামেনি এবং আগামী কয়েক দিনে আরও বাড়তে পারে। তাই সবাইকে নিরাপদে অবস্থান গ্রহণ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রতি বর্ষায় বর্ষা মৌসুমে পদ্মার পানি বেড়ে যায়। তবে চলতি বছর পানি বৃদ্ধি অস্বাভাবিকভাবে দ্রুত হয়েছে। জুলাই মাস থেকে ধীরে ধীরে পানি বৃদ্ধি পাচ্ছিল, কিন্তু আগস্টের প্রথম সপ্তাহে তা বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। আগের বছরগুলোর তুলনায় এবারের পরিস্থিতি অনেক বেশি উদ্বেগজনক।
প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া
নদীর পানি বৃদ্ধির কারণে সাধারণ জনগণ, কৃষক, ব্যবসায়ী এবং পর্যটকেরা প্রভাবিত হচ্ছেন। চরাঞ্চলের মানুষ নিরাপদ স্থানে স্থানান্তরিত হচ্ছেন। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ক্ষতির আশঙ্কায় তাদের পণ্য সরানোর চেষ্টা করছেন। এছাড়া পর্যটক এবং স্থানীয় মানুষ টুরিস্ট স্পটগুলো পরিহার করছেন।
স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্কের ছড়াছড়ি দেখা দিয়েছে। প্রশাসন এবং নিরাপত্তা বাহিনী নিয়মিত পাহারা দিয়ে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরানোর চেষ্টা করছে।
বিশেষজ্ঞ মতামত
জলবিজ্ঞানী এবং পানি উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভারতীয় উপত্যকা থেকে অতিবৃষ্টি ও ফারাক্কা ড্যামের কপাট খোলার ফলে পদ্মার পানি এই উচ্চতায় পৌঁছেছে। তারা আরও সতর্ক করে বলছেন, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি অব্যাহত রাখা না হলে নিম্নাঞ্চলে আরও ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে।
পরিসংখ্যান ও তুলনা
রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে পদ্মার পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছানো ঘটনাটি প্রায় বারবার ঘটেছে। তবে এবারের পানি বৃদ্ধির হার আগের বছরের তুলনায় অনেক বেশি। পানি বৃদ্ধির পরিমাণ এবং তীব্রতা দেখে বোঝা যায়, নগরীর নিম্নাঞ্চলগুলোতে ক্ষতি আরও বাড়তে পারে।
সংক্ষিপ্তসার
রাজশাহীতে পদ্মার পানি বৃদ্ধি এখনও অব্যাহত। টি–বাঁধ ও আই–বাঁধের প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা জনসাধারণের নিরাপত্তার জন্য জরুরি। স্থানীয় প্রশাসন এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের সতর্ক ব্যবস্থার কারণে বড় ধরণের ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি ভবিষ্যতে কীভাবে মোড় নেবে তা নির্ভর করছে আগাম সতর্কতা এবং স্থানীয় জনগণের প্রতিক্রিয়ার ওপর।
এম আর এম – ০৮৫০, Signalbd.com


