আঞ্চলিক

প্রাথমিক হিসাবে ফেনীতেই বন্যায় ক্ষতি ১৪৬ কোটি টাকা

Advertisement

টানা বর্ষণ আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে ভয়াবহ বন্যায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে ফেনী জেলা। ৮ জুলাই থেকে শুরু হওয়া বন্যায় জেলার পাঁচটি উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিভিন্ন অবকাঠামোয় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর দেওয়া প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ফেনীতে এবারের বন্যায় মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৪৬ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। তবে কর্মকর্তারা বলছেন, চূড়ান্ত তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি; পানি পুরোপুরি নামলে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।

বন্যার প্রভাব: প্লাবিত পাঁচ উপজেলা

বন্যার কবলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পরশুরাম, ফুলগাজী, ছাগলনাইয়া, দাগনভূঞা এবং ফেনী সদর উপজেলা। মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর বাঁধ ভেঙে হু-হু করে পানি ঢুকে পড়ে লোকালয়ে। এতে জেলার ১৩৭টি গ্রাম পানিতে নিমজ্জিত হয়।

বেশ কয়েকটি এলাকায় এখনো পানি পুরোপুরি নামেনি। ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়ার পাঁচটি গ্রামের মানুষ এখনো পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন শত শত বানভাসি মানুষ।

ক্ষতির খাতভিত্তিক বিবরণ

কৃষি খাতে ক্ষয়ক্ষতি: ৩৮ কোটি টাকা

আউশ, আমনের বীজতলা এবং গ্রীষ্মকালীন শাকসবজি পানিতে ডুবে গেছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, ৫,৫৬৪ হেক্টর জমি সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় ২৮ হাজার ৮০০ জন কৃষক এই ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন।

ক্ষতির বিবরণ:

  • আউশ ধান: ৮৪৫ হেক্টর
  • গ্রীষ্মকালীন সবজি: ৫৩৭ হেক্টর
  • আমনের বীজতলা: ৬৮৯ হেক্টর
  • অন্যান্য ফসল (মরিচ, আদা, হলুদ, টমেটো): প্রায় ৩,৫০০ হেক্টর

স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য:
ফুলগাজীর দরবারপুরের কামরুজ্জামান বলেন, “প্রতি বছর বন্যায় ফসল হারাচ্ছি। সরকার যদি স্থায়ী সমাধান না দেয়, আমরা পথে বসব।”
পরশুরামের কৃষক মোস্তাফিজুর রহমান জানান, “৫ বিঘা জমির সবজি এক নিমিষে শেষ। এখন ঋণ শোধই অসম্ভব হয়ে পড়বে।”

মৎস্য খাতে ক্ষতি: ৮.৭১ কোটি টাকা

জেলা মৎস্য বিভাগ জানায়, ২ হাজার ৩৩০টি পুকুর ও মৎস্য খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভেসে গেছে প্রায় ২৭৬ মেট্রিক টন মাছ এবং ১২৮ মেট্রিক টন পোনা মাছ। খামার অবকাঠামোরও ভয়াবহ ক্ষতি হয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার চিত্র:

  • ফুলগাজী, পরশুরাম, ছাগলনাইয়া — সবখানেই চাষিরা দিশেহারা।
  • অনেক মাছচাষি জানিয়েছেন, বছরের সঞ্চিত মূলধন এক নিমিষে ভেসে গেছে।

ফুলগাজীর মাছচাষি আলমগীর বলেন, “পুকুরের মাছ সব চলে গেছে। ক্ষতি প্রায় আড়াই লাখ টাকা। কোনো সহায়তা না পেলে খামার চালানোই সম্ভব হবে না।”

প্রাণিসম্পদ খাতে ক্ষতি: প্রায় ৬৫ লাখ টাকা

বন্যার কারণে:

  • ১০ হাজার ৬০০ মুরগি,
  • ২৩৫টি হাঁস,
  • ৩টি ছাগল,
  • ১টি ভেড়া ও ৪টি গরু মারা গেছে।

এছাড়া পানিতে ভেসে গেছে:

  • ৭ টন পশুখাদ্য,
  • ৩০ টন খড়,
  • ১৬০ টন ঘাস, যার ক্ষতির আর্থিক মূল্য প্রায় ১০ লাখ টাকা

স্থানীয় পোলট্রি খামার মালিক হাসান বলেন, “১,৫০০ মুরগি হারিয়েছি, ক্ষতি সাড়ে চার লাখ টাকা। এসব কষ্ট রাতারাতি শেষ হয়ে গেলো।”

সড়ক ও অবকাঠামোতে ধ্বংস: ক্ষতি ৯০ কোটি টাকা

জেলার তিন উপজেলায় ১২৬টি সড়ক, প্রায় ৩০০ কিলোমিটার রাস্তায় ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কোথাও কোথাও ৫-৬ ফুট পানির তোড়ে রাস্তা ভেঙে গেছে।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের একজন প্রকৌশলী জানান, “যেসব স্থানে গর্ত হয়েছে বা সড়ক কেটে গেছে, তা দ্রুত মেরামত না করলে গ্রামীণ যোগাযোগ ও অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে।”

বাঁধ ভাঙন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের ক্ষতি: ৯ কোটি টাকা

মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর ৪১টি স্থানে বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে।

  • পরশুরামে: ২২টি স্থান
  • ফুলগাজীতে: ১৯টি স্থান

এতে ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রায় ৯ কোটি টাকার অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

চলমান ত্রাণ কার্যক্রম ও প্রশাসনের উদ্যোগ

ফেনীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ইসমাইল হোসেন জানান, “বন্যা-পরবর্তী পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে। এখনো অনেক পরিবার কষ্টে আছে, তাই ত্রাণ কার্যক্রম চলছে।”

ত্রাণ সহায়তার অগ্রগতি:

  • ১১,১৭৪ জন বন্যাদুর্গত মানুষকে সহায়তা
  • বিতরণ করা হয়েছে শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি, চাল ও প্রাথমিক চিকিৎসা সামগ্রী

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের কাছে অতিরিক্ত ৩০ লাখ টাকা ও ৫০০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।

স্থানীয়দের দাবী: টেকসই বাঁধ ও স্থায়ী সমাধান

বহুবারের মতো আবারও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ফেনীবাসী দাবি জানাচ্ছেন টেকসই ও স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের।
স্থানীয়দের বক্তব্য, “প্রতিবছর একই দুর্ভোগের শিকার হচ্ছি। স্থায়ী সমাধান না হলে এই দুর্দশা থেকে মুক্তি নেই।”

সারসংক্ষেপ  

বন্যার প্রাথমিক ক্ষতির হিসাবেই বিপর্যয়ের চিত্র ভয়াবহ। তবে পানি সম্পূর্ণ না নামা পর্যন্ত চূড়ান্ত ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা যাবে না। প্রশাসন থেকে সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হলেও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক, মৎস্যজীবী ও খামারিদের দ্রুত পুনর্বাসন ও আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন। সেইসঙ্গে ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজন কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ও টেকসই বাঁধ নির্মাণ।

এম আর এম – ০৩৫৪, Signalbd.com

মন্তব্য করুন
Advertisement

Related Articles

Back to top button