জাতীয়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজয়ের মাসের বর্ণাঢ্য র‌্যালি

Advertisement

বাংলাদেশের গৌরবদীপ্ত ইতিহাসে ডিসেম্বর শুধু একটি মাস নয়—এ মাসই বাঙালি জাতির মুক্তির জয়ধ্বনি, স্বাধীনতার ঘোষণা, আত্মত্যাগের চূড়ান্ত জ্বালা আর বিজয়ের অনন্য দৃঢ়তার প্রতীক। সেই মহান বিজয়ের মাসকে যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপন করতে প্রতিবছরের মতো এবারও বর্ণাঢ্য বিজয় র‌্যালির আয়োজন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। স্বাধীনতার ইতিহাসের জন্মভূমি হিসেবে পরিচিত এ ক্যাম্পাস এবারও উত্তাল হয়েছে দেশাত্মবোধের সুরে, জাতীয় পতাকার উচ্ছ্বাসে এবং শ্রদ্ধার ফুলে।

২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর সকাল ৯টায় অপরাজেয় বাংলার পাদদেশ থেকে যাত্রা শুরু হয় এ র‌্যালির। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, প্রো-ভাইস চ্যান্সেলরবৃন্দ, বিভাগীয় চেয়ারম্যান, ডিন, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, ডাকসু নেতৃবৃন্দ এবং বিভিন্ন অনুষদের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে ঢাবি ক্যাম্পাস এক উৎসবমুখর পরিবেশে রূপ নেয়।

অপরাজেয় বাংলা—যে প্রতীক আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা, শহীদের আত্মত্যাগ এবং স্বাধীনতার জন্য বাঙালির অদম্য সংকল্পকে ধারণ করে—সেই ভাস্কর্যের সামনে থেকেই শুরু হলো বিজয়ের মাস উদযাপনের আনুষ্ঠানিকতা। সকাল ৮টা ৪৫ মিনিট থেকেই শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা সেখানে জড়ো হতে শুরু করেন। লাল-সবুজের সমাহারে ভরে ওঠে ক্যাম্পাসের প্রতিটি পথ।

র‌্যালিটি অপরাজেয় বাংলা থেকে শুরু হয়ে টিএসসি চত্বর প্রদক্ষিণ করে স্মৃতি চিরন্তন চত্বরে গিয়ে শেষ হয়। র‌্যালির পুরো পথ জুড়ে স্বাধীনতার গান, স্লোগান ও দেশপ্রেমে উজ্জ্বীবিত ছন্দ ক্যাম্পাস পরিবেশকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।

বিশিষ্টদের উপস্থিতি এবং নেতৃত্ব

র‌্যালির নেতৃত্ব দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান। তাঁর নেতৃত্বে র‌্যালিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সব ইউনিট থেকে প্রতিনিধি অংশ নেন।

প্রধান অতিথিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন—

  • প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা
  • প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ
  • কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. এম. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী
  • প্রক্টর অধ্যাপক সাইফুদ্দীন আহমদ
  • ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মুনসী শামস উদ্দিন আহম্মদ
  • ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদ
    এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট-সিন্ডিকেট সদস্য, বিভিন্ন বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক, আবাসিক হলের প্রভোস্ট এবং বিপুল সংখ্যক শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী।

ঢাবির ছাত্রসংগঠন, সংস্কৃতিকর্মী, বিতার্কিক ও বিভিন্ন ক্লাব-সংগঠনের প্রতিনিধিরাও র‌্যালিতে অংশ নেন। ক্যাম্পাসে সৃষ্টি হয় এক সমন্বিত উৎসবমুখর পরিবেশ—যেখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবাই একাত্ম হয়ে জাতির বিজয় উদযাপন করেন।

বিজয়ের মাস: বাঙালির ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ অধ্যায়

মহান মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত লক্ষ্য পূরণ হয়েছিল ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। ঠিক সেই দিন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণ করে এবং জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ।
ডিসেম্বর তাই শুধু দিনপঞ্জিকার একটি মাস নয়—এ মাস বাঙালির সবচেয়ে গৌরবময়, বেদনামাখা এবং অর্জনের প্রতীক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু।

  • এখানেই গড়ে উঠেছিল ছাত্র আন্দোলন।
  • এখান থেকেই ১৯৫২, ১৯৬২, ১৯৬৬ ও ১৯৬৯-এর গণআন্দোলন গতি পেয়েছিল।
  • ১৯৭১-এর গণহত্যার প্রথম শিকার হন ঢাবির শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
  • বুদ্ধিজীবী হত্যাযজ্ঞের অন্যতম কেন্দ্রও ছিল এই বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা।

এসব কারণেই বিজয়ের মাসে ঢাবির আয়োজন শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা, শহীদদের প্রতি সম্মান এবং নতুন প্রজন্মকে ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ শেখানোর এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

র‌্যালির শেষপর্ব: দেশাত্মবোধক গানে উদ্দীপ্ত ক্যাম্পাস

র‌্যালিটি স্মৃতি চিরন্তন চত্বরে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে সংগীত বিভাগের শিক্ষার্থীদের পরিবেশনায় মুক্তিযুদ্ধ ও বিজয় দিবসভিত্তিক দেশাত্মবোধক গান পরিবেশিত হয়।
তাদের কণ্ঠে “আমার সোনার বাংলা”, “মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে”, “এক সাগর রক্তের বিনিময়ে”, “বিজয় নিশান উড়ছে ওরে” প্রভৃতির সুর বাতাস ভরিয়ে তোলে।

গানের সাথে শিক্ষার্থীদের কণ্ঠ মিলিয়ে পুরো স্থানটি এক হৃদয়স্পর্শী দেশপ্রেমিক আবহে রূপ নেয়। উপস্থিত অতিথিরা জানান—ঢাবির এই আয়োজন নতুন প্রজন্মের মনে স্বাধীনতার চেতনাকে জাগিয়ে তুলতে বিশেষ ভূমিকা রেখে যাচ্ছে।

উপাচার্যের বক্তব্য: স্বাধীনতার মূল্যবোধই হবে জাতির পথচলার শক্তি

র‌্যালি শেষে উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান এক সংক্ষিপ্ত বক্তৃতায় বলেন—
“ডিসেম্বর বাঙালির জীবনে এক অনন্ত মাইলফলক। ১৯৭১ সালের এই মাসেই আমরা হাজার বছরের নিপীড়ন, বঞ্চনা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করি।”

তিনি ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবীদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। বলেন—
“বুদ্ধিজীবীদের নির্মম হত্যা আমাদের স্বাধীনতার ভিত আরও দৃঢ় করেছে। তাদের আত্মত্যাগ জাতিকে সত্য, ন্যায় ও আদর্শের পথে চালিত করবে।”

উপাচার্য আরও বলেন—
“প্রয়োজনের মুহূর্তে এ জাতি সবসময়ই ঐক্যবদ্ধ হতে জানে। ধর্ম-বর্ণ-রাজনীতির ভেদাভেদ ভুলে দেশমাতৃকার ডাকেই আমরা সবচেয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠি। বিজয়ের মাস সেই ঐক্যচেতনাকে আরও জাগ্রত করুক।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক ভূমিকা স্মরণ করে তিনি জানান—
“ন্যায়, সত্য, মানবিক মূল্যবোধ ও সমাজিক ন্যায়ের প্রশ্নে ঢাবি কখনোই আপসহীন নয়। ইতিহাসের সব আন্দোলনে এ বিশ্ববিদ্যালয় মানবাধিকারের পক্ষেই দাঁড়িয়েছে। ভবিষ্যতেও সেই ভূমিকা অটুট থাকবে।”

তিনি আরও যোগ করেন—
“বিজয়ের মাসের কর্মসূচি ঢাবিরই নয়—এটি জাতির সম্মিলিত আয়োজন। সমাজে বিভাজন নয়, ঐক্য, শ্রদ্ধা ও দেশপ্রেমই হবে আমাদের পথচলার মূল শক্তি।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় দিবস উদযাপনের অতিরিক্ত আয়োজন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতি বছর বিজয় দিবস উপলক্ষে মাসব্যাপী যেসব কর্মসূচি পালন করে, তার মধ্যে রয়েছে—

  • শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন
  • বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে প্রভাতফেরি
  • স্মারক বক্তৃতা
  • মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক আলোচনা
  • চিত্রকলা ও ফটোগ্রাফি প্রদর্শনী
  • নাটক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা
  • মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা
  • বিতর্ক প্রতিযোগিতা
  • প্রজন্মভিত্তিক গবেষণা উপস্থাপন
  • জাতীয় পতাকা উত্তোলন অনুষ্ঠান

এ বছরও এসব কর্মসূচি আরও বর্ধিত আকারে আয়োজন করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সেমিনার, গবেষণা ও স্মরণীয় বক্তৃতা আয়োজনের প্রস্তুতি নিয়েছে।

ছাত্র-শিক্ষকদের অনুভূতি: বিজয়ের মাস আমাদের অনুপ্রেরণা

র‌্যালিতে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা বলেন—
“ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত পবিত্র স্থান। বিজয়ের মাসে এখানে থাকতে পারা আমাদের জন্য গর্বের।”

শিক্ষকদের মধ্যেও ছিল ভিন্নরকম আবেগ। অনেকেই জানান—ঢাবির ইতিহাসই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। তাই নতুন প্রজন্মকে এসব মূল্যবোধ শেখানো গুরুত্বপূর্ণ।

বিজয়ের মাসে ঢাকা শহরের সামগ্রিক পরিবেশ

প্রতিবছরের মতো এবারও ডিসেম্বর শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঢাকার রাস্তাঘাট, ভবন, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা উত্তোলিত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, শহীদ মিনার, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে চলছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও প্রস্তুতি।

অনেক প্রতিষ্ঠান স্বাধীনতার ইতিহাস, মুক্তিযোদ্ধাদের বর্ণনা, শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে বিশেষ অনুষ্ঠান আয়োজন করছে।

সারা দেশের মুক্তিযুদ্ধকে স্মরণ করার মুহূর্ত

বিজয় র‌্যালিটি শুধু ঢাবিতে সীমাবদ্ধ নয়—দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, জেলা প্রশাসন, সামাজিক সংগঠনও ডিসেম্বর জুড়ে বিজয় দিবস পালনে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে।

রাজধানী ছাড়াও চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, রংপুরসহ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও চলছে আলোচনা সভা, প্রীতির‌্যালি, প্রদর্শনী ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

বিজয় দিবস ২০২৫: জাতির নতুন প্রত্যাশা

২০২৫ সালে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা নতুন দিগন্তে। অর্থনীতি, শিক্ষা, প্রযুক্তি, গবেষণা, স্টার্ট-আপ পরিবেশ, নারী নেতৃত্ব, সাইবার প্রযুক্তি, অবকাঠামো—সব ক্ষেত্রেই চলছে উন্নয়ন।
বিজয়ের মাসের আয়োজন তাই শুধু অতীত স্মরণ নয়; এটি ভবিষ্যতের জন্য নতুন প্রত্যাশা, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রতি নতুন অঙ্গীকারও।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় র‌্যালি কেবল একটি অনুষ্ঠান নয়—এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা, শিকড়, ইতিহাস ও অর্জনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধার প্রতীক।
১৯৭১-এর সেই মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে ঢাবির এই উদ্যোগ এক অবিচ্ছেদ্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

দেশপ্রেম, একতা, মানবিক মূল্যবোধ এবং স্বাধীনতার চেতনাই হোক জাতির অগ্রযাত্রার মূল ভিত্তি—এমনই প্রত্যাশায় শুরু হলো বিজয়ের মাস ২০২৫।

MAH – 14084 I Signalbd.com

মন্তব্য করুন
Advertisement

Related Articles

Back to top button