অর্থনীতি

চীনের পাল্টা শুল্কে চাপে মার্কিন কৃষি, ব্রাজিলসহ লাতিন দেশগুলোর ভাগ্য খুলে যাচ্ছে

চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বাণিজ্য যুদ্ধ নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। গতকাল শুক্রবার, চীন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা সকল পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ৩৪ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। এর আগে মার্চের শুরুতে প্রায় ২১ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন কৃষিপণ্যের ওপর ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হারে শুল্ক আরোপ করেছিল বেইজিং। নতুন এই পাল্টা শুল্ক কার্যত মার্কিন কৃষকদের জন্য বড় ধাক্কা, তবে এই সুযোগ কাজে লাগাতে শুরু করেছে ব্রাজিলসহ লাতিন আমেরিকার কৃষিনির্ভর দেশগুলো।

কেন শুল্ক আরোপ করলো চীন?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে শুল্ক আরোপ করার সিদ্ধান্তই চীনকে এমন পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ৫ এপ্রিল ঘোষণা দেন, সব দেশের ওপর ১০ শতাংশ হারে ভিত্তিমূল্য শুল্ক এবং চীনের মতো নির্দিষ্ট দেশের ওপর অতিরিক্ত ৩৪ শতাংশ হারে শুল্ক আরোপ করা হবে।

এর জবাবে চীনও যুক্তরাষ্ট্রের সব পণ্যের ওপর সমপরিমাণ পাল্টা শুল্ক বসায়। মূলত এর মাধ্যমে বেইজিং চায় যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্য থেকে নিজেদের নির্ভরতা সরিয়ে নিতে এবং বিকল্প উৎস খুঁজে পেতে।

কৃষি খাতে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষতি: শিকাগোতে পতন, আতঙ্ক সয়াবিন বাজারে

শিকাগো বোর্ড অব ট্রেডে (CBOT) গতকাল সয়াবিনের দামে বড় ধস দেখা যায়। সিবিওটির সর্বাধিক কেনাবেচা হওয়া সয়াবিন চুক্তির দাম প্রতি বুশেল ৩৪.৫ সেন্ট কমে দাঁড়ায় ৯.৭৭ ডলারে—যা ২০২৫ সালের মধ্যে সর্বনিম্ন।

শিকাগোভিত্তিক প্রাইস ফিউচার্স গ্রুপের সহসভাপতি জ্যাক স্কোভিল বলেন, “এটা যুক্তরাষ্ট্রের অনেক রপ্তানি ব্যবসার জন্য ক্ষতিকর। আমরা সবাইকে রাগিয়ে দিচ্ছি, সেটাই মূল সমস্যা। যদি আমরা সবার ওপর শুল্ক চাপাই, তাহলে আমাদের বাজার কোথায় থাকবে?”

চীনের নতুন সরবরাহকারী: ব্রাজিলের ভাগ্য খুলছে

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সয়াবিনের ওপর শুল্কের কারণে চীনের আমদানির কেন্দ্র এখন সরে যাচ্ছে ব্রাজিলের দিকে। দক্ষিণ আমেরিকার দেশটি এরইমধ্যে রেকর্ড পরিমাণ সয়াবিন উৎপাদন করেছে এবং দ্বিতীয় প্রান্তিকে চীনের আমদানি রেকর্ড ছুঁতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।

র‍্যাবোব্যাংকের কৃষিপণ্য গবেষণা প্রধান কার্লোস মেরা বলেন, “ব্রাজিল এই পরিস্থিতিতে নিঃসন্দেহে সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হবে। তারা একমাত্র দেশ, যারা মার্কিন সয়াবিনের বিকল্প সরবরাহে সক্ষম।”

আর্জেন্টিনা, প্যারাগুয়ে, অস্ট্রেলিয়াও লড়াইয়ে

ব্রাজিল ছাড়াও আর্জেন্টিনা, প্যারাগুয়ে এবং অস্ট্রেলিয়া এই বাণিজ্য যুদ্ধের পটভূমিতে নিজেদের কৃষিপণ্য রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ পেয়েছে। বিশেষ করে গম এবং ভুট্টা রপ্তানিতে অস্ট্রেলিয়া ও আর্জেন্টিনা লাভবান হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

হেজপয়েন্ট গ্লোবাল মার্কেটস-এর লাতিন আমেরিকা শস্য বিক্রয় প্রধান সোল আর্কিডিয়াকোনো বলেন, “চলমান বাণিজ্য যুদ্ধ, মৌসুমী ফলন এবং উচ্চ চাহিদা দক্ষিণ আমেরিকার কৃষকদের আরও বেশি উৎপাদনে উদ্বুদ্ধ করবে।”

চীনের আরও কড়াকড়ি: সরগম ও পোলট্রি আমদানি বন্ধ

চীন শুধু শুল্ক আরোপেই থেমে থাকেনি। শুক্রবার তারা যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরগম (জোয়ার) আমদানির গুরুত্বপূর্ণ নথি বাতিল করেছে। একইসঙ্গে, মার্কিন প্রতিষ্ঠান আমেরিকান প্রোটিনস, মাউন্টেয়ার ফার্মস এবং ডারলিং ইনগ্রেডিয়েন্টস-এর কাছ থেকে পোলট্রি মাংস ও হাড়গুঁড়া আমদানির অনুমতিপত্র বাতিল করে।

ডেলাওয়ারের কোস্টাল প্রসেসিং-এর পোলট্রি পণ্য আমদানিও সাময়িক স্থগিত করেছে বেইজিং। এই পদক্ষেপগুলোর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের পোলট্রি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাত খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের হুঁশিয়ারি

যুক্তরাষ্ট্র-চীন উত্তেজনার মাঝে ইউরোপীয় ইউনিয়নও পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এক ইউরোপীয় শস্য ব্যবসায়ী জানান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন সম্ভবত মার্কিন সয়াবিনের ওপর শুল্ক আরোপ করতে যাচ্ছে। এর ফলে, মার্কিন কৃষিপণ্য উৎপাদকদের সামনে বাজার সংকোচনের নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে।

পরিসংখ্যানে মার্কিন ক্ষতি

২০২২ সালে চীন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৪২.৮ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য আমদানি করেছিল। কিন্তু ২০২৪ সালে এই পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৯.২৫ বিলিয়ন ডলারে। চীনের এই আমদানি হ্রাসের পেছনে বড় কারণ হলো, ট্রাম্প প্রশাসনের কড়া শুল্কনীতি ও পাল্টা জবাবে চীনের কঠোর বাণিজ্যিক কৌশল।

বিশ্ববাজারে নতুন সমীকরণ

বিশ্বব্যাপী কৃষিপণ্যের বাজার এখন নতুন করে সাজাতে হচ্ছে। মার্কিন কৃষকদের জন্য যেখানে সংকট তৈরি হচ্ছে, সেখানে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ও অস্ট্রেলিয়ার জন্য এটি একটি ‘গোল্ডেন টাইম’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “যুক্তরাষ্ট্র যদি কূটনৈতিকভাবে চীনের সঙ্গে সমঝোতায় না পৌঁছায়, তাহলে ভবিষ্যতে আরও অনেক বাজার হারাতে হতে পারে। তখন ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।”

চীনের ৩৪ শতাংশ পাল্টা শুল্ক যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিখাতের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। শিকাগোতে সয়াবিনের দরপতন থেকে শুরু করে পোলট্রি রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়া পর্যন্ত সব কিছুই মার্কিন কৃষকদের উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে।

অন্যদিকে, দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলো—বিশেষ করে ব্রাজিল—এই সংকটকে সুযোগে পরিণত করে বৈশ্বিক বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে। বাণিজ্য যুদ্ধের এই নতুন মোড় কেবল দুটি দেশের ব্যাপার নয়, এর প্রভাব পড়ছে গোটা কৃষিভিত্তিক বিশ্ব অর্থনীতিতে।

মন্তব্য করুন

Related Articles

Back to top button