ট্রাম্পের পাল্টা শুল্কে কোন দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বে

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও আলোচনায়। এবার বিশ্ববাণিজ্যে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করেছেন পাল্টা শুল্কের (Retaliatory Tariff) ঘোষণা দিয়ে। এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সেইসব ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশগুলো, যারা দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বড় বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে পরিচিত।
বিশ্লেষকদের মতে, যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে পণ্য রপ্তানি করে এবং তাদের অর্থনীতি মার্কিন বাজারের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল, তাদের ওপরই এই শুল্কের প্রভাব সবচেয়ে ভয়াবহভাবে পড়বে।
কোন দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে?
নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদন বলছে, ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন শুল্কনীতিতে যেসব দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তাদের অনেকেই মূলত সস্তা পণ্য উৎপাদনের জন্য পরিচিত। এসব দেশের পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ ঠেকাতে শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।
যেসব দেশে শুল্ক আরোপ হয়েছে (শতকরা হারে):
দেশ | রপ্তানির পরিমাণ (GDP অনুযায়ী) | শুল্কের হার |
---|---|---|
ভিয়েতনাম | ২৯% | ৪৬% |
কম্বোডিয়া | ২৭% | ৪৯% |
নিকারাগুয়া | ২৪% | ১৯% |
গায়ানা | ২৩% | ৩৮% |
তাইওয়ান | ১৫% | ৩২% |
থাইল্যান্ড | ১২% | ৩৭% |
মালয়েশিয়া | ১২% | ২৪% |
জর্ডান | ১২% | ২০% |
দক্ষিণ কোরিয়া | ৭% | ২৬% |
সুইজারল্যান্ড | ৭% | ৩২% |
ভেনেজুয়েলা | ৬% | ১৫% |
শ্রীলঙ্কা | ৪% | ৪৪% |
জাপান | ৪% | ২৪% |
ইসরায়েল | ৪% | ১৭% |
দক্ষিণ আফ্রিকা | ৪% | ৩১% |
কেন এই শুল্ক নীতি?
ট্রাম্পের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বিদেশি পণ্যের দাপটে স্থানীয় উৎপাদকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ কারণে তিনি আমদানি পণ্যের ওপর শুল্ক বসিয়ে স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতে চান। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, বিশ্ব অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খলায় (Global Supply Chain) যে আন্তঃনির্ভরশীলতা তৈরি হয়েছে, তা এই শুল্কের ফলে ব্যাহত হবে, বাড়বে মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থানের সমস্যা।
বিশ্লেষকদের মত কী বলছে?
অর্থনীতিবিদ জয়তী ঘোষ নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন:
“এই শুল্কনীতির ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতি এক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে। বিনিয়োগের প্রবাহ কমে যাবে, উৎপাদন হ্রাস পাবে এবং কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়বে।”
বিশ্লেষকেরা আরও মনে করেন, যেসব দেশের ওপর সরাসরি শুল্ক আরোপ হয়নি, তারাও এ সিদ্ধান্তের প্রভাব এড়াতে পারবে না। কারণ, বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য একসঙ্গে নড়ে যাবে।
বিশ্ববাণিজ্যে বড় রকমের অস্থিরতা?
- চীনা কোম্পানিগুলো যুক্তরাষ্ট্র থেকে মুখ ফিরিয়ে ইউরোপ ও অন্যান্য দেশে ঝুঁকতে পারে।
- ইউরোপের বাজার সস্তা চীনা পণ্যে সয়লাব হওয়ার সম্ভাবনা।
- এ সিদ্ধান্ত বিশ্বজুড়ে নতুন এক বাণিজ্য যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
কারা ‘বেঁচে’ গেছে এই শুল্ক থেকে?
ট্রাম্প এবার মেক্সিকো ও কানাডার পণ্যে নতুন করে কোনো শুল্ক আরোপ করেননি। যদিও এই দুই দেশের পণ্যে ইতোমধ্যে ২৫ শতাংশ শুল্ক রয়েছে।
তবে পর্যবেক্ষকেরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে এই দুটি দেশও নতুন চাপের মুখে পড়তে পারে, কারণ ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিতে স্থিতিশীলতা বা পূর্বাভাস দেওয়ার সুযোগ খুবই সীমিত।
বিশ্ব অর্থনীতির সামনে কী চ্যালেঞ্জ?
- বিনিয়োগ কমবে, কারণ বাজারে অনিশ্চয়তা বেড়েছে।
- ক্রয়ক্ষমতা কমে যেতে পারে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোতে।
- বেকারত্ব বাড়বে শিল্প খাতে, বিশেষত উন্নয়নশীল দেশগুলোর শ্রমনির্ভর খাতে।
- ডলারের আধিপত্য নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে ভবিষ্যতে।
ট্রাম্পের এই শুল্কনীতি হয়তো স্বল্পমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু নির্দিষ্ট খাতকে সুরক্ষা দেবে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি বিশ্ববাণিজ্যে অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা এবং বৈষম্য তৈরি করবে। ক্ষতির মুখে পড়বে সেইসব দেশ, যারা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। আর এর প্রভাব থেকে রেহাই পাবে না যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তারাও।