চলতি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের জন্য নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ। সদ্যবিদায়ী নভেম্বর মাসে দেশে এসেছে ২৮৮ কোটি ৯৫ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স, যা এই অর্থবছরের যেকোনো মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। এই হিসেবে নভেম্বর মাসে প্রতিদিন গড়ে দেশে এসেছে ৯ কোটি ৬৩ লাখ ডলার রেমিট্যান্স। সোমবার (১ ডিসেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এই আশাব্যঞ্জক তথ্য জানা গেছে। রেমিট্যান্সের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে এবং ডলারের বাজারে কিছুটা স্থিতিশীলতা আনতে সহায়তা করবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
রেমিট্যান্সের রেকর্ড ও মাসভিত্তিক হিসাব
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ২৮৮ কোটি ৯৫ লাখ ২০ হাজার মার্কিন ডলার। এর ফলে চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাস (জুলাই-নভেম্বর) রেমিট্যান্সের প্রবাহ তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হয়েছে। দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎসগুলোর মধ্যে রেমিট্যান্সের এই শক্তিশালী অবস্থান অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে সহায়তা করবে।
নভেম্বর মাসের রেমিট্যান্স প্রবাহকে সপ্তাহভিত্তিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:
- ২৩ থেকে ৩০ নভেম্বর: দেশে এসেছে ৭৫ কোটি ৪৫ লাখ ৩০ হাজার ডলার।
- ১৬ থেকে ২২ নভেম্বর: দেশে এসেছে ৬১ কোটি ২২ লাখ ৭০ হাজার ডলার।
- ৯ থেকে ১৫ নভেম্বর: দেশে এসেছে ৭৬ কোটি ৮৪ লাখ ৮০ হাজার ডলার।
- ২ থেকে ৮ নভেম্বর: দেশে এসেছে ৭১ কোটি ১০ লাখ ৭০ হাজার ডলার।
- নভেম্বরের প্রথম দিন (১ নভেম্বর): দেশে এসেছে ৪ কোটি ৩১ লাখ ৮০ হাজার ডলার।
এই তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহেই (৯ থেকে ১৫ নভেম্বর) রেমিট্যান্স প্রবাহ ছিল সবচেয়ে বেশি।
ব্যাংক খাতভিত্তিক রেমিট্যান্স প্রবাহ
নভেম্বর মাসের রেমিট্যান্স প্রবাহে দেশের বেসরকারি ব্যাংকগুলো সিংহভাগ অবদান রেখেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুসারে, নভেম্বর মাসে বিভিন্ন ধরনের ব্যাংকের মাধ্যমে রেমিট্যান্স এসেছে:
- বেসরকারি ব্যাংক: ১৯৯ কোটি ৬৮ লাখ ৭০ হাজার ডলার (সর্বোচ্চ)।
- রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক: ৫৮ কোটি ৭৭ লাখ ৬০ হাজার ডলার।
- বিশেষায়িত ব্যাংক: ২৯ কোটি ৮৯ লাখ ৫০ হাজার ডলার।
- বিদেশি খাতের ব্যাংক: ৫৯ লাখ ৪০ হাজার ডলার।
বেসরকারি ব্যাংকগুলোর দ্রুত সেবা এবং প্রতিযোগিতামূলক হার দেওয়ায় প্রবাসীরা তাদের মাধ্যমেই বেশি অর্থ পাঠাতে স্বচ্ছন্দ বোধ করছেন। রেমিট্যান্স প্রবাহে সরকারি ব্যাংকগুলোর অবদান কমলেও, বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে।
পূর্ববর্তী মাসগুলোর তুলনায় বিশ্লেষণ
নভেম্বরের রেমিট্যান্স প্রবাহ চলতি অর্থবছরের অন্যান্য মাসের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেশি। পূর্ববর্তী মাসগুলোর পরিসংখ্যান তুলে ধরলে এই রেকর্ড আরও স্পষ্ট হয়:
- অক্টোবর: দেশে এসেছিল ২৫৬ কোটি ৩৪ লাখ ৮০ হাজার মার্কিন ডলার।
- সেপ্টেম্বর: দেশে এসেছিল ২৬৮ কোটি ৫৮ লাখ ৮০ হাজার মার্কিন ডলার।
- আগস্ট: দেশে এসেছিল ২৪২ কোটি ১৮ লাখ ৯০ হাজার মার্কিন ডলার।
- জুলাই: দেশে এসেছিল ২৪৭ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার।
দেখা যাচ্ছে, নভেম্বরের রেমিট্যান্স অক্টোবর মাসের তুলনায় প্রায় ৩২ কোটি ডলার বেশি এবং সেপ্টেম্বরের তুলনায় প্রায় ২০ কোটি ডলার বেশি। এই বৃদ্ধি দেশের বৈদেশিক আয়ের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
গত অর্থবছরের রেকর্ড ও রেমিট্যান্স বৃদ্ধির কারণ
গত ২০২৪-২৫ অর্থবছর জুড়ে দেশে প্রবাসীরা পাঠিয়েছিলেন ৩০ দশমিক ৩২ বিলিয়ন বা ৩ হাজার ৩২ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স। এটি দেশের ইতিহাসে কোনো নির্দিষ্ট অর্থবছরে সর্বোচ্চ প্রবাসী আয়ের রেকর্ড। এই রেকর্ড রেমিট্যান্সের ধারা চলতি অর্থবছরেও বজায় রাখার চেষ্টা করছে সরকার।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রেমিট্যান্স বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন:
১. ডলারের বিনিময় হারে সুবিধা: বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠালে সরকার কর্তৃক ঘোষিত প্রণোদনার পাশাপাশি ডলারের উচ্চ বিনিময় হার প্রবাসীদের উৎসাহিত করছে। ২. হুন্ডি প্রতিরোধ: সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর নজরদারির কারণে অবৈধ পথে হুন্ডি প্রবণতা কমে আসছে, ফলে প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠাচ্ছেন। ৩. বিদেশে শ্রমিক প্রেরণ: সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বাংলাদেশ থেকে রেকর্ড সংখ্যক শ্রমিক বিদেশে গেছেন, যা ভবিষ্যতে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও বাড়িয়ে দেবে বলে আশা করা যায়। ৪. উৎসবকেন্দ্রিক প্রবাহ: বছরের শেষ দিকে এবং উৎসবকে কেন্দ্র করে প্রবাসীরা সাধারণত বেশি অর্থ পাঠিয়ে থাকেন।
রেমিট্যান্সের অর্থনৈতিক প্রভাব ও রিজার্ভের উপর চাপ
দেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের এই প্রবাহের গুরুত্ব অপরিসীম। বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস হওয়ায় এটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে সাহায্য করে। বর্তমানে যখন রিজার্ভ কিছুটা চাপের মুখে, তখন রেমিট্যান্সের এই বৃদ্ধি দেশের অর্থনীতির জন্য একটি ইতিবাচক সংকেত।
এছাড়াও, রেমিট্যান্স দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখে। এই অর্থ সরাসরি জনগণের হাতে পৌঁছানোয় ভোগের মাত্রা বাড়ে এবং গ্রামীণ বিনিয়োগ উৎসাহিত হয়। রেমিট্যান্স প্রবাহ শক্তিশালী থাকলে ডলারের বাজারে স্থিতিশীলতা আসে এবং টাকার মান রক্ষা করা সহজ হয়।
অর্থনীতির জন্য স্বস্তির বার্তা
নভেম্বর মাসে অর্থবছরের সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স অর্জন দেশের অর্থনীতির জন্য নিঃসন্দেহে স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে। ২৮৮ কোটি ৯৫ লাখ ডলারের এই রেমিট্যান্স প্রবাহ প্রমাণ করে যে, দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান এখনও অত্যন্ত শক্তিশালী। এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হলে সরকারকে ব্যাংকিং চ্যানেলগুলোতে আরও সুবিধা দেওয়া এবং হুন্ডি চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান অব্যাহত রাখতে হবে। রেমিট্যান্সের এই গতি দেশের ডলার সংকট মোকাবিলায় বড় ভূমিকা রাখবে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করবে।
এম আর এম – ২৪৩৯,Signalbd.com



