অর্থনীতি

এশিয়ার সবচেয়ে মানহীন মুদ্রা এখন ভারতীয় রুপি

Advertisement

চলতি বছর এশিয়ার সবচেয়ে দুর্বল মুদ্রা হিসেবে দাঁড়িয়েছে ভারতের রুপি। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংবাদ সংস্থা ব্লুমবার্গের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২২ সালের পর প্রথমবার রেকর্ড পরিমাণে রুপির মূল্য কমেছে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভারতীয় রুপির এই অবনতি মূলত তিনটি কারণে হয়েছে:

  1. উচ্চ আমেরিকান শুল্ক – বিশেষ করে ভারতীয় পণ্যের ওপর আমেরিকার উচ্চ শুল্ক আরোপ।
  2. বিদেশি বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাহার – দেশটির শেয়ারবাজার থেকে ব্যাপকভাবে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মূলধন তুলে নিচ্ছেন।
  3. ভিত্তিমূলক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ – আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় মুদ্রার ওপর চাপ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তির অনিশ্চয়তা।

ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের কেন্দ্রীয় রিজার্ভ ব্যাংক (RBI) চলতি বছরের জুলাই থেকে রুপির মান স্থিতিশীল রাখার জন্য প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারের সমমূল্যের বিদেশি মুদ্রা বিক্রি করেছে। এছাড়া, মধ্য অক্টোবরেও RBI নতুন করে একই পদক্ষেপ গ্রহণ করে, যাতে রুপির পতন কমানো যায়।

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ২১ নভেম্বর ডলারের বিপরীতে রুপির মূল্য ৮৯.৪৯ এ পৌঁছানোর পর, কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্ভবত আর নতুন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। RBI প্রধানত আমেরিকার সঙ্গে চলমান বাণিজ্য আলোচনা চলাকালীন রিজার্ভ ধরে রাখতে চাইছে।

রুপির পতনের প্রভাব ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ

ভারতীয় মুদ্রা বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক উন্নয়ন হয় এবং দিল্লির ওপর শুল্ক কমানো হয়, তাহলে রুপির মান আবার বাড়তে পারে। তবে তা না হলে, কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বাধ্য হতে হবে আরও শক্তিশালী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে রুপির মূল্য কমতে শুরু করেছিল। মার্চ ও এপ্রিল মাসে মুদ্রার মান কিছুটা বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে মার্চে ডলারের বিপরীতে রুপির মূল্য দাঁড়িয়েছিল ৮৩.৭৫। তখন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আশা করেছিলেন, ভারতের সঙ্গে আমেরিকার বাণিজ্যচুক্তি সহজে সম্পন্ন হবে এবং ভারতীয় পণ্যের ওপর শুল্ক কমানো হবে। এছাড়াও, চীনের বাইরে নতুন শিল্প-কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা অনেক কোম্পানি বিবেচনা করছিল।

কিন্তু জুলাই মাসে পরিস্থিতি বদলে যায়। তখন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন, ভারত রাশিয়া থেকে জ্বালানি ও অস্ত্র কিনলে ভারতীয় পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করা হতে পারে। আগস্টে ট্রাম্প কার্যত ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন। ফলে রুপির মান প্রতি ডলারে ৮৮ পার হয়ে যায়।

সেপ্টেম্বরে আরও অবনতি ঘটে, যখন ট্রাম্প ইউরোপীয় দেশগুলোর জন্য একই ধরনের শুল্ক আরোপের আহ্বান জানান। এই সময়ে ভারতীয় শেয়ারবাজার থেকেও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা তাদের মূলধন তুলে নিতে থাকেন। ২৫ নভেম্বর পর্যন্ত ভারতীয় শেয়ারবাজার থেকে ১৬.৩ বিলিয়ন ডলার মূলধন প্রত্যাহার করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট

এশিয়ার অন্যান্য মুদ্রার তুলনায় রুপির পতন আরও স্পষ্ট। বিশেষত, ভারতীয় রূপির শক্তি হারানো মূলত দুইটি কারণে:

  1. আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চাপ – আমেরিকার শুল্ক আরোপ ও রাশিয়া-ভারত সম্পর্ক।
  2. অর্থনৈতিক নীতি ও বিনিয়োগ প্রত্যাহার – বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অস্থিরতা এবং বাজারে অর্থনীতির চাপ।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারত যদি এই অবনতি ঠেকাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে আরও হস্তক্ষেপ না করে, তবে রুপির মান আরও কমতে পারে।

ভবিষ্যতের প্রভাব

রুপির এই দুর্বল অবস্থা সাধারণ নাগরিক ও ব্যবসায়ীদের ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।

  • মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি: আমদানি করা পণ্যের মূল্য বাড়ছে।
  • রপ্তানি পণ্যের চাহিদা প্রভাবিত হচ্ছে: বিদেশি বাজারে ভারতীয় পণ্যের প্রতিযোগিতা কমছে।
  • শেয়ারবাজার অস্থির: বিদেশি বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাহারের কারণে বাজারে চাপ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রুপির মান বৃদ্ধির জন্য ভারতের জন্য জরুরি হলো:

  • আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনার ত্বরান্বিত সমাধান
  • কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়মিত হস্তক্ষেপ ও রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা।
  • বিদেশি বিনিয়োগের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধির জন্য নীতি উদ্ভাবন

বর্তমানে ভারতের রুপি একটি গুরুত্বপূর্ণ “সন্ধিক্ষণে” রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও নীতি প্রয়োগের ওপরই নির্ভর করছে রুপির ভবিষ্যৎ মান। অর্থনীতিবিদদের মতে, যদি ভারত ও আমেরিকার মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্ক উন্নতি পায় এবং শুল্ক হ্রাস হয়, তবে রুপির মান ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হবে। অন্যথায়, RBIকে আরও শক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে।

অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, এশিয়ার অন্যান্য মুদ্রার তুলনায় ভারতের রুপির দুর্বলতা আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের অর্থনীতির উপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

MAH – 14036 I Signalbd.com

মন্তব্য করুন
Advertisement

Related Articles

Back to top button