অর্থনীতি

কাঁচাপাট রপ্তানি সংকটে বাংলাদেশ: ১৭টি দেশের বাজার হারালো পাটশিল্প

Advertisement

বাংলাদেশের পাটশিল্প একসময় ছিল দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান খাত। কিন্তু গত দুই দশকে বিভিন্ন কারণে এই খাতটি সংকটে পড়েছে। বিশেষ করে, রপ্তানি বাজারে ১৭টি দেশের বাজার হারানোর ফলে পাটশিল্পের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়েছে।

রপ্তানি বাজারের সংকোচন

২০০৪-২০০৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ২৯টি দেশে কাঁচাপাট রপ্তানি করেছিল। কিন্তু ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে এই সংখ্যা কমে ১২টিতে দাঁড়িয়েছে। যেসব দেশগুলোর বাজার হারিয়েছে বাংলাদেশ, সেগুলোর মধ্যে বেলজিয়াম, কিউবা, মিশর, এল-সালভাডর, ইথিওপিয়া, জার্মানি, হল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, ইতালি, রাশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, স্পেন, তানজানিয়া, জায়ার, রোমানিয়া ও ফিলিপাইন উল্লেখযোগ্য।

রপ্তানি কমার কারণসমূহ

১. মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে ওই অঞ্চলের দেশগুলোর অর্থনৈতিক অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছে, ফলে পাটের চাহিদা কমেছে।

২. রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা

সরকারি বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞার কারণে পাট রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ২০০৯-২০১০ সালের পর দুই-তিন দফায় পাট রপ্তানি বন্ধ হয়েছিল, যার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদী হয়েছে।

৩. বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা

ভারতসহ অন্যান্য দেশগুলো পাট উৎপাদনে সক্ষমতা বাড়ানোর ফলে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বাংলাদেশের রপ্তানি কমানোর অন্যতম কারণ।

৪. পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি

ভারতের সঙ্গে সড়কপথে পাট পরিবহন বন্ধ হওয়ায় জলপথে পরিবহন করতে হচ্ছে, যার ফলে খরচ বেড়েছে। এতে ভারতের ব্যবসায়ীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

খুলনা ও নারায়ণগঞ্জের পরিস্থিতি

খুলনার দৌলতপুর ও নারায়ণগঞ্জের পাটশিল্পে মন্দাভাব বিরাজ করছে। জুলাই থেকে মৌসুম শুরু হলেও ব্যাংক রপ্তানিকারকদের ঋণ দিতে নারাজ। এতে পাট ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

রপ্তানি পরিসংখ্যান

২০১০-২০১১ অর্থবছরে বাংলাদেশ ২১ লাখ ১২ হাজার ৪০০ বেল পাট রপ্তানি করেছিল, যার মূল্য ছিল ১ হাজার ৯০৬ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। কিন্তু ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের মে মাস পর্যন্ত ৭ লাখ ৬৭ হাজার ৫৬৯ বেল পাট রপ্তানি হয়েছে, যার মূল্য ১ হাজার ৯৭ কোটি ২৭ লাখ টাকা। এতে পাট রপ্তানির পরিমাণ ও মূল্য উভয়ই কমেছে।

ব্যবসায়ীদের অভিমত

গাজী জুট ইন্টারন্যাশনালের রপ্তানিকারক গাজী শরিফুল ইসলাম বলেন, “পাট উৎপাদনকারী দেশের মধ্যে সবচেয়ে মানসম্মত পাট আমাদের দেশে হয়। এই পাট রপ্তানিতে বিভিন্ন সময়ে বাঁধা আসে। ২০০৯-২০১০ সালের পর দুই-তিন দফায় পাট রপ্তানি বন্ধ হয়। যেসব দেশ বাংলাদেশের পাটে নির্ভরশীল, রপ্তানি বন্ধ হওয়ায় সেসব দেশের মিলগুলো বন্ধ হয়ে যায়। এ কারণে পাটের বাজার কমেছে।”

দৌলতপুর সারতাজ ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের রপ্তানিকারক বদরুল আলম মার্কিন বলেন, “বাজারে চাহিদা কমেছে। বিভিন্ন দেশের মিলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রপ্তানির কমছে। ভারত, পাকিস্তান ও নেপালে পাট রপ্তানি করে থাকি। বর্তমানে এই তিনটি দেশ পাটের সবচেয়ে বড় বাজার।”

বাংলাদেশ জুট অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএ) চেয়ারম্যান ফরহাদ আহমেদ আকন্দ বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের শুরু থেকে রপ্তানি বাঁধাগ্রস্ত হয়। রপ্তানির শুরুর পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে রপ্তানি বন্ধের সরকারি নিষেধাজ্ঞার কারণে বাহিরের দেশের মিলগুলো বন্ধ হয়ে যায়। এজন্য বাজার কিছুটা হারিয়েছি এবং রপ্তানিও কমেছে। বাজার সৃষ্টি করার জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে।”

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

পাটশিল্পের উন্নয়নের জন্য সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ, নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার, পরিবহন ব্যয় কমানো এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা অর্জনের জন্য কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত।

MAH – 12501 ,  Signalbd.com

মন্তব্য করুন
Advertisement

Related Articles

Back to top button