অর্থনীতি

২০২৪-২৫ আমদানি বেড়েছে, মূল্য কমেছে কেন?

Advertisement

২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশে মোট ৬১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে। এটি আগের অর্থবছর ২০২৩-২৪ এর তুলনায় প্রায় ৭ শতাংশ কম। তবুও, পণ্যের পরিমাণ দিক থেকে ১৪.০৫ কোটি টন আমদানি করা হয়েছে, যা আগের বছরের ১৩.৭৬ কোটি টনের তুলনায় ৪ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ, মূল্য ভিত্তিক আমদানি কমলেও পরিমাণগত আমদানি বেড়েছে, যা দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং শিল্প খাতের চাহিদার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

২০২৪-২৫ অর্থবছরের আমদানির বিস্তারিত পর্যালোচনা

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৫০টি শুল্ক স্টেশনে খালাস হওয়া পণ্যের ভিত্তিতে এই পরিসংখ্যান গঠিত। এনবিআর জানিয়েছে, রপ্তানিমুখী শিল্প, দেশীয় শিল্প এবং মূলধনি যন্ত্রপাতিসহ বিভিন্ন ধরনের কাঁচামালের আমদানি হয়েছে। তবে এই হিসাব থেকে স্থানীয় এবং নমুনা আমদানি বাদ দেওয়া হয়েছে, অর্থাৎ প্রকৃত অর্থনৈতিক কার্যক্রমের উপর ভিত্তি করে হিসাব প্রণয়ন করা হয়েছে।

অর্থবছরের শুরুতে ডলার সংকট ও সরকার পরিবর্তন

২০২৪-২৫ অর্থবছরের শুরুতেই ডলারের সংকট দেখা দেয়, যা আমদানি ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব ফেলে। অর্থবছরের মাত্র ৩৬ দিন পরে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। নতুন সরকার ডলার সংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়, যদিও আমদানি এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। ব্যবসায়ীরা জানাচ্ছেন, ঋণপত্র (এলসি) খোলার ক্ষেত্রে মার্জিন বেশী দিতে হচ্ছে। যেমন পুরোনো জাহাজ আমদানিতে এখন ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত মার্জিন দিতে হয়, যেখানে আগের বছর এটি ছিল ১০ থেকে ১৫ শতাংশের মধ্যে।

এটি উদ্যোক্তাদের জন্য একটি বড় বাধা, কারণ অনেকের এই পরিমাণ অর্থ সরবরাহের সক্ষমতা নেই।

কোন পণ্য আমদানি বেড়েছে?

১. বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লা
বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য কয়লার আমদানি সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বৃদ্ধির কারণে এই চাহিদা বেড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কয়লার আমদানির পরিমাণ ছিল পৌনে ২ কোটি টন, যা আগের বছরের তুলনায় ৪৮ লাখ টন বেশি।

২. চাল
ঘাটতির কারণে সরকারি ও বেসরকারি খাতে চাল আমদানির পরিমাণ বেড়ে ১৩ লাখ ৮৯ হাজার টনে উন্নীত হয়েছে, যেখানে পূর্ববর্তী অর্থবছরে চাল আমদানির পরিমাণ ছিল মাত্র এক হাজার টনের কম।

৩. বস্ত্রশিল্পের কাঁচামাল তুলা
বস্ত্রশিল্পে তুলার আমদানি ৮ শতাংশ বেড়ে ১৭ লাখ ৫৮ হাজার টনে পৌঁছেছে।

৪. অন্যান্য পণ্য
ভুট্টা, অপরিশোধিত সয়াবিন তেল, রড তৈরির কাঁচামাল (স্ক্র্যাপ), ডাল, অপরিশোধিত চিনি, এলপিজি গ্যাসের আমদানিও বেড়েছে।

কোন পণ্য আমদানিতে পতন ঘটেছে?

১. সিমেন্টের কাঁচামাল ক্লিংকার
২০২৩-২৪ অর্থবছরে ক্লিংকার আমদানির পরিমাণ ছিল ২ কোটি ৫ লাখ টন, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কমে ১ কোটি ৯০ লাখ টনে নেমেছে।

২. সয়াবিন বীজ ও তেল
সয়াবিন বীজের আমদানি ৭ শতাংশ কমে ১৭ লাখ ৩৫ হাজার টনে নেমেছে। সয়াবিন তেল ও প্রাণিখাদ্য তৈরির কাঁচামালেও পতন হয়েছে।

৩. পুরোনো জাহাজ
লোহা সংগ্রহের জন্য পুরোনো জাহাজ আমদানিও ১৫ শতাংশ কমেছে, যার পরিমাণ সাড়ে আট লাখ টনের আশেপাশে।

৪. মূলধনি যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ
বিনিয়োগের সংকেত বহনকারী মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি কমেছে প্রায় ১৯ শতাংশ। এই ধরণের যন্ত্রপাতির আমদানি কম হওয়া শিল্প ও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

৫. অন্যান্য পণ্য
ডিজেল, অপরিশোধিত জ্বালানি তেল, ইউরিয়া সার, গম, পণ্য পরিবহনের জাহাজ ইত্যাদির আমদানিতেও হ্রাস দেখা গেছে।

মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানিতে পতনের দুশ্চিন্তা

প্রিমিয়ার সিমেন্ট ও সীকম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক জানাচ্ছেন, মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানির এই হ্রাস দেশের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নেতিবাচক সংকেত। যন্ত্রপাতি কমে গেলে উৎপাদন, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান কমে যায়। তাই ব্যাংকের সুদের হার কমিয়ে উদ্যোক্তাদের জন্য নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন। এতে বিনিয়োগ বাড়বে এবং অর্থনীতি শক্তিশালী হবে।

বিশ্লেষণ ও ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা

বাংলাদেশের আমদানি প্যাটার্নের এই পরিবর্তন দেশের অর্থনৈতিক গতিবিধি এবং শিল্পখাতের বর্তমান অবস্থার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে। মূল্য কমে গেলেও পরিমাণ বেড়ে যাওয়া মানে দেশের চাহিদা ও উৎপাদন চক্র চালু রয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লার আমদানি বৃদ্ধিই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

অন্যদিকে, মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানিতে পতন শিল্প বিনিয়োগের জন্য একটি বড় সতর্ক সংকেত। সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়নে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।

সারসংক্ষেপ

  • ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমদানি ৬১ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে, যা ৭% কম।
  • পণ্যের পরিমাণ বেড়ে ১৪.০৫ কোটি টনে উন্নীত হয়েছে, আগের বছরের তুলনায় ৪% বেশি।
  • কয়লা ও চালের আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
  • সিমেন্টের কাঁচামাল, পুরোনো জাহাজ, মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানিতে পতন ঘটেছে।
  • ডলার সংকট ও ঋণপত্র খোলার উচ্চ মার্জিন আমদানি প্রক্রিয়া জটিল করে তুলেছে।
  • মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কম হওয়ায় বিনিয়োগের সংকট তৈরি হচ্ছে, যা অর্থনীতির জন্য দুশ্চিন্তার বিষয়।

বাংলাদেশের অর্থনীতির গতিপথ নির্ধারণে এ তথ্যসমূহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। শিল্পখাত ও বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যে সরকারের যথাযথ পদক্ষেপ অপরিহার্য। আমদানির ধরণ ও পরিমাণ বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যত পরিকল্পনা গঠন করতে হবে, যা দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত জরুরি।

মন্তব্য করুন
Advertisement

Related Articles

Back to top button