চলতি জুলাই মাসের প্রথম সাত দিনেই দেশের বৈদেশিক মুদ্রার আয়ে বড়সড় উল্লম্ফন দেখা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, এই সাত দিনে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন প্রায় ৬৭ কোটি ডলার রেমিট্যান্স। স্থানীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৮ হাজার ১৬৮ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ১২২ টাকা ধরে)। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে দেশে আসছে সাড়ে ৯ কোটির বেশি মার্কিন ডলার।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রেমিট্যান্সের এই ধারাবাহিক উত্থান দেশের অর্থনীতির জন্য এক ইতিবাচক ইঙ্গিত। এতে করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভেও স্বস্তি ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কোথা থেকে এলো এই অর্থ?
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে ৬৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার এসেছে বিভিন্ন প্রবাসী রেমিট্যান্স চ্যানেল থেকে। এই রেমিট্যান্স এসেছে মূলত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো, ইউরোপ, আমেরিকা ও মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন কর্মসংস্থানসমৃদ্ধ অঞ্চল থেকে।
তুলনামূলকভাবে গত বছরের একই সময়ে এই অঙ্ক ছিল ৫৩ কোটি ১০ লাখ ডলার। অর্থাৎ ১৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার বা প্রায় ৬ হাজার ৪১২ কোটি টাকা বেশি এসেছে এবার।
রেমিট্যান্স বাড়ার কারণ কী?
বিভিন্ন বিশ্লেষক ও ব্যাংকিং সংশ্লিষ্টদের মতে, রেমিট্যান্স বাড়ার পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে:
হুন্ডি প্রতিরোধে সরকারের কঠোর নজরদারি
বৈধ চ্যানেলে প্রণোদনার হার বৃদ্ধি (২.৫%)
মধ্যপ্রাচ্যে কর্মসংস্থান বাড়া ও স্থিতিশীলতা
নতুন প্রশাসনের প্রতি প্রবাসীদের আস্থা ফিরে আসা
বিশেষজ্ঞদের মতে, “সরকার বদলের পর দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রবাসীদের মাঝে আস্থা সৃষ্টি করেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে রেমিট্যান্স প্রবাহে।”
পূর্বের মাসগুলোতে রেমিট্যান্সের চিত্র
গত তিন মাসে ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে রেমিট্যান্স প্রবাহ।
জুন ২০২৫: ২৮২ কোটি ডলার
মে ২০২৫: ২৯৭ কোটি ডলার
এপ্রিল ২০২৫: ২৭৫ কোটি ২০ লাখ ডলার
২০২৪-২৫ অর্থবছরের শেষে মোট রেমিট্যান্স দাঁড়ায় ৩০.৩৩ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের ইতিহাসে এক অর্থবছরে সর্বোচ্চ রেকর্ড।
রাজনৈতিক পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক মনস্তত্ত্ব
বিশ্লেষকদের মতে, প্রবাসীদের মনস্তত্ত্বে আস্থার বড় ভূমিকা আছে। শেখ হাসিনা সরকারের শেষ দিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দুর্নীতির অভিযোগে অনেক প্রবাসী অর্থ পাঠানো কমিয়ে দেন। এরপর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতার পরিবর্তন হলে এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নিলে ধীরে ধীরে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়তে থাকে।
“প্রবাসীরা এখন বিশ্বাস করছেন যে তাদের পাঠানো অর্থ সঠিক জায়গায় ব্যবহৃত হবে, তাই বৈধ পথে অর্থ পাঠাতে উৎসাহী হচ্ছেন”— অর্থনীতি বিশ্লেষক ড. আশরাফুজ্জামান খান।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে স্বস্তি
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ গত বছরের বেশিরভাগ সময়ই চাপের মধ্যে ছিল। আমদানি ব্যয়, ঋণ পরিশোধ ও ডলারের সংকট রিজার্ভ কমিয়ে দিয়েছিল। তবে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
রিজার্ভ পুনর্গঠনের মাধ্যমে সরকার তেল, খাদ্য ও ওষুধ আমদানি খাতে বাড়তি স্বস্তি পাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভবিষ্যতের সম্ভাবনা
চলতি মাসের প্রথম সাত দিনের চিত্র ইতিবাচক। যদি এই ধারা অব্যাহত থাকে, তবে জুলাই মাস শেষে রেমিট্যান্স ২৮০–৩০০ কোটি ডলারের ঘরেই পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা।
তবে তাঁরা এক্ষেত্রে সতর্কতা হিসেবে বলেছেন, হুন্ডি চক্র যেন আবার মাথাচাড়া দিয়ে না ওঠে—এ নিয়ে সরকারকে সজাগ থাকতে হবে।
সারসংক্ষেপ
জুলাইয়ের শুরুটা রেমিট্যান্স প্রবাহে সুখবর বয়ে এনেছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, প্রশাসনিক সততা এবং বৈধ চ্যানেলে উৎসাহমূলক প্রণোদনার সমন্বয় যদি এমনভাবে বজায় থাকে, তাহলে আগামী মাসগুলোতেও বাংলাদেশ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে বড় সফলতা পেতে পারে।
এম আর এম – ০২৪২, Signalbd.com



