বাংলাদেশের গর্ব ও সমৃদ্ধির প্রতীক পদ্মা সেতু প্রকল্পকে ঘিরে একদা যে দুর্নীতির অভিযোগ ও ষড়যন্ত্রের আলোচনার অবসান হয়নি, সেই পুরনো কেলেঙ্কারির নেপথ্যে নতুন করে আলো ফেলছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
২০০৮ সালে নির্বাচনী ইশতেহারে পদ্মা নদীর ওপর সেতু নির্মাণের অঙ্গীকার করেছিল ruling আওয়ামী লীগ সরকার। প্রকল্পটি ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের একনেক সভায় অনুমোদিত হয়। তবে এ প্রজেক্টের খরচ ও তদারকি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠে। প্রথম বাজেট ছিল ১০ হাজার ১৬১ কোটি টাকা, পরে তা বেড়ে প্রায় ২০ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। কিন্তু প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ ও অনিয়মের ছায়া আর মুছে যায়নি।
বিশ্বব্যাংকের তদন্তে প্রকাশ পায় মন্ত্রীর নাম
পদ্মা সেতু প্রকল্পে পরামর্শক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি ও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ উঠে ২০১২ সালে, যা নিয়ে বিশ্বব্যাংক একটি গভীর তদন্ত চালায়। তাদের প্রতিবেদনে উঠে আসে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের নাম, যিনি তার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান সাকো ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যমে ঘুষ দাবি ও কমিশন আদায় করতেন। ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ভীতি প্রদর্শনও করতেন বলে তদন্তে জানা যায়।
বিশ্বব্যাংক স্পষ্ট করে বলে, “দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে প্রকল্পের আর্থিক সহায়তা বন্ধ থাকবে।” কিন্তু সরকারের পদক্ষেপ যথাযথ হয়নি, ফলে বিশ্বব্যাংক শেষ পর্যন্ত আর্থিক সাহায্য স্থগিত করে দেয়।
২০১২ সালের এজাহার ও দুদকের মামলা
২০১২ সালের ১৭ ডিসেম্বর বনানী থানায় দুর্নীতি দমন কমিশনের উপপরিচালক আবদুল্লাহ আল জাহিদ এসএনসি-লাভালিন নামের কানাডীয়ান পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দুর্নীতি ও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগে মামলা দায়ের করেন। মামলায় সাতজনকে আসামি করা হয়, যার মধ্যে ছিলেন তৎকালীন সেতু বিভাগের সচিব মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া।
এজাহারে উল্লেখ ছিল, সচিব নিজেই অস্বাভাবিকভাবে কমিটি গঠন করে জাপানি কোম্পানিকে কাজ দিতে চেয়েছিলেন। পরবর্তীতে এসএনসি-লাভালিনকে অগ্রাধিকার দিয়ে গোপনে দরপত্র তথ্য ফাঁস করা হয়েছে। এছাড়া দরপত্র মূল্যায়নে ইচ্ছেমতো নম্বর কেটে অন্যদের বাদ দিয়ে লাভালিনকে সুবিধা দেওয়া হয়।
রমেশ শাহ নামের এক কর্মকর্তা তার গোপন ডায়েরিতে স্পষ্ট উল্লেখ করেছিলেন, কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে কারা কত শতাংশ ঘুষ পাবেন, এবং সেখানে সচিবের নামও রয়েছে।
আদালত শেষ পর্যন্ত ২০১৪ সালে দুদকের প্রতিবেদন গ্রহণ করে সাতজনকে অব্যাহতি দেয়। যদিও দুদক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মোমেন বলেছেন, ‘গায়ের জোরেই’ মামলাটি নিষ্পত্তি করা হয়েছে। এখন মামলাটি পুনরায় তীব্র তদন্তের মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত করা হচ্ছে।
কমিটি গঠন ও দুর্নীতির নেপথ্যে ষড়যন্ত্র
দুদকের অনুসন্ধানে দেখা যায়, পদ্মা সেতুর তদারকি পরামর্শক নিয়োগে কমিটি গঠন প্রক্রিয়ায় নানা অনিয়ম হয়। সচিব মোশাররফ হোসেন নিজেকে কমিটির আহ্বায়ক করে নিয়োগ দেন, যদিও বিশ্বব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী কমিটির সদস্যদের অন্তত ১০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।
কমিটির প্রধান সদস্যদের সাক্ষ্যে উঠে এসেছে, সচিব ও কাজী মো. ফেরদাউস নামের কর্মকর্তার যোগসাজশে জাপানি কোম্পানি ওরিয়েন্টাল কনসালট্যান্ট কোম্পানিকে সুবিধা দিতে ষড়যন্ত্র হয়েছিল। পরে তাদের এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে এসএনসি-লাভালিনের পক্ষে কার্যাদেশ দেওয়ার জন্য ঘুষ লেনদেনের পরিকল্পনা করা হয়।
গোপন ইমেইল, বৈঠক ও প্রভাব বিস্তার
রমেশ শাহর ডায়েরি ও বিভিন্ন কম্পিউটার ইমেইল রেকর্ড পর্যালোচনায় পাওয়া গেছে, উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ও প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন দিক থেকে ভয়ভীতি প্রদর্শনের প্রমাণ। এই কেলেঙ্কারিতে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ব্যক্তি জড়িত ছিলেন।
বিশেষভাবে কানাডার এসএনসি-লাভালিন কোম্পানির কর্মচারী মোহাম্মদ ইসমাইল, রমেশ শাহ এবং অন্যরা পরিকল্পিতভাবে দরপত্র তথ্য ফাঁস করে অবৈধ সুবিধা পেয়েছিলেন।
মন্ত্রীর সংশ্লিষ্টতা ও বিশ্বব্যাংকের আপত্তি
বিশ্বব্যাংকের তদন্তে যোগাযোগমন্ত্রীর নাম উঠে আসলেও সরকার কখনও মন্ত্রীর বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেয়নি। দুদক পরবর্তীতে জানায়, মন্ত্রী দুর্নীতিতে জড়িত নন। তবে তদন্তের তথ্য উল্টো দাবি করে।
বিশ্বব্যাংক তহবিল বন্ধ করলেও বাংলাদেশ সরকার নিজস্ব অর্থায়নে সেতু নির্মাণ সম্পন্ন করে, যা দেশের অর্থনৈতিক ও যোগাযোগ ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে ধরা হয়।
পদ্মা সেতু দুর্নীতি মামলার পুনঃতদন্তের প্রয়োজনীয়তা
দুদকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মোমেন বলেছেন, মামলাটি পুনরায় তদারকির প্রয়োজন রয়েছে। যারা আগে অভিযোগে ছিলেন, তাদের পুনরায় ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে। নতুন তদন্তে কেউ দোষী প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমাদের Zero Tolerance নীতি বজায় থাকবে। পদ্মা সেতু প্রকল্পের দুর্নীতি নিয়ে জনগণের কাছে আমরা দায়িত্বশীল।’
পদ্মা সেতু: দেশের অর্থনৈতিক ও যোগাযোগ ক্ষেত্রে বিপ্লব
বলা হয়, পদ্মা সেতু বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অদূর ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথ সুগম করেছে। এটি দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং জনজীবনে যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে।
তবে প্রকল্পের পেছনের অনিয়ম এবং দুর্নীতির ঘটনা এখনো দেশের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক আলোচনায় টিকে আছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া এ জাতীয় বৃহৎ প্রকল্পের প্রতি জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার কঠিন হবে।
পদ্মা সেতু দুর্নীতি কেলেঙ্কারির মূল তথ্যাবলি এবং অনুসন্ধান
- ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহার থেকে পদ্মা সেতু নির্মাণের অঙ্গীকার
- বিশ্বব্যাংকের তদন্তে মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও ঘুষের অভিযোগ
- ২০১২ সালের বনানী থানায় মামলা, সাতজনকে আসামি করা হয়
- দুর্নীতি তদন্তে গোপন ডায়েরি, ইমেইল, বৈঠকের প্রমাণ মিলেছে
- মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও সরকার ব্যবস্থা নেনি
- ২০১৪ সালে আদালত দুদকের প্রতিবেদন গ্রহণ করে মামলাটি শেষ করার সিদ্ধান্ত নেয়
- ২০২৫ সালে দুদক পুনরায় তদন্ত শুরু করেছে এবং দোষী প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।



