বাংলাদেশের স্বাধীনতার গৌরবময় মাস ডিসেম্বর। বিজয়ের আনন্দ, স্মৃতি ও আবেগের রঙে সারা দেশ যখন নতুন উদ্দীপনায় সেজে ওঠে, তখন সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও শুরু হয় উৎসবের বিশেষ আয়োজন। সেই ধারাবাহিকতায় চ্যানেল আই সদ্য শুরু হওয়া বিজয়ের মাসের প্রথম দিনেই আয়োজন করল দেশের সর্ববৃহৎ ব্যান্ড সংগীত উৎসব—ব্যান্ড ফেস্ট ২০২৫।
১২তম ব্যান্ড ফেস্টটি হয়ে উঠেছে আরও বর্ণময়, আরও আবেগঘন, আরও প্রজন্ম-সংযোগী। কারণ এবছরের আয়োজনে বিশেষভাবে স্মরণ করা হয়েছে বাংলা ব্যান্ড সংগীতের কিংবদন্তি, কিংবদন্তিতুল্য রকস্টার ও ব্যান্ড ফেস্টের প্রথম উদ্যোক্তা—আইয়ুব বাচ্চু। একই সঙ্গে ফিরে এসেছে বাংলাদেশে ব্যান্ড সংগীতের এক স্মারক অধ্যায়—আজম খান প্রতিষ্ঠিত ব্যান্ড ‘উচ্চারণ’, যারা এই উৎসবে মঞ্চে ওঠার পর দর্শকদের উচ্ছ্বাসে পুরো স্টুডিও কেঁপে ওঠে।
বর্ণিল আয়োজন: সকালের প্রথম আলোয় শুরু ব্যান্ড ফেস্ট
চ্যানেল আইয়ের স্টুডিও প্রাঙ্গণে সকাল থেকে শুরু হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। সকাল ১১টা ৩০ মিনিটে ব্যান্ড ফেস্ট ২০২৫-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন চ্যানেল আইয়ের পরিচালক ও বার্তা প্রধান শাইখ সিরাজ এবং ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. আশিষ কুমার চক্রবর্তী।
এছাড়া উপস্থিত ছিলেন ব্যান্ড ফেস্টের প্রকল্প পরিচালক রাজু আলীম এবং পরিচালক অনন্যা রুমা, যাদের সার্বিক সমন্বয়ে অনুষ্ঠানটি আরও স্বচ্ছন্দ, প্রাণবন্ত এবং সুসংগঠিত হয়ে ওঠে।
এবারের ফেস্টের মূল পৃষ্ঠপোষক ইমপ্রেস টেলিফিল্ম লিমিটেড।
১২ ব্যান্ডের দুর্দান্ত অংশগ্রহণ
ব্যান্ড ফেস্ট ২০২৫-এ অংশ নেয় দেশের জনপ্রিয় ও প্রতিশ্রুতিশীল ১২টি ব্যান্ড। তালিকায় রয়েছে—
- উচ্চারণ
- পার্থিব
- স্টারলিং
- শিরোনামহীন
- মেকানিক্স
- নির্ঝর
- মেহরীন
- তরুণ
- সিম্ফনি
- নোভা
- অবসকিউর
- ফিডব্যাক
প্রতিটি ব্যান্ড নিজেদের স্বকীয়তা, মেধা ও সুরের জাদুতে একের পর এক গান পরিবেশন করে দর্শকদের মন জয় করে নেয়।
স্টেজ মাতানো উচ্চারণ: আজম খানকে শ্রদ্ধা, দর্শককে উপহার
এ বছরের ব্যান্ড ফেস্টের সবচেয়ে আলোচিত এবং আবেগের জায়গা ছিল আজম খানের ব্যান্ড ‘উচ্চারণ’-এর ফিরে আসা। বাংলা ব্যান্ড সংগীতের জনক হিসেবে পরিচিত এই সংগীতগুরুর ব্যান্ড মঞ্চে উঠতেই দর্শকদের মধ্যে নস্টালজিয়া ও উচ্ছ্বাসের ঢেউ দেখা যায়।
আজম খানের কণ্ঠে যেসব গান একসময় পুরো দেশকে আন্দোলিত করেছিল, সেসব গানের পুনঃসঞ্চারণে ভক্তরা আবেগ ধরে রাখতে পারেননি।
উচ্চারণ ব্যান্ড এবার নতুন লাইনআপ নিয়ে ফেস্টে অংশ নিয়েছে।
বর্তমান লাইনআপ:
- দুলাল জোহা – ভোকাল ও রিদম গিটার
- পেয়ারু খান – ভোকাল ও পারকেশন
- সেকান্দার আহমেদ খোকা – বেজ গিটার
- পার্থ মজুমদার – লিড গিটার
- প্রেম – কিবোর্ড
- বাপ্পী – ড্রামস
বাংলাদেশের ব্যান্ড অঙ্গনে উচ্চারণ একটি ঐতিহাসিক নাম। মুক্তিযোদ্ধা আজম খানের গড়া এই ব্যান্ড ঐতিহ্যের ধারক। ফেস্টে তাদের পরিবেশিত বিখ্যাত কিছু গান দর্শকদের দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানাতে বাধ্য করে।
আজম খান: বাংলা ব্যান্ড সংগীতের প্রবর্তক
আজম খান শুধু একজন সংগীতশিল্পী নন, তিনি ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা, শিল্পসংস্কৃতির বিদ্রোহী কণ্ঠ এবং নতুন প্রজন্মের আইডল।
মুক্তিযুদ্ধের পরপর বন্ধুবান্ধবকে নিয়ে তৈরি করেন ব্যান্ড ‘উচ্চারণ’, যা বাংলা ব্যান্ড সংগীতের যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটায়।
তার মৃত্যুর পরও উচ্চারণ ব্যান্ড ইতিহাস হয়ে বেঁচে আছে। নতুন প্রজন্ম সেসব গানকে আবার নতুন কণ্ঠে গেয়ে ফিরিয়ে আনছে।
উচ্চারণ ব্যান্ডের সামনে নতুন পরিকল্পনা
ব্যান্ড সূত্র নিশ্চিত করেছে, আগামী বছর উচ্চারণ দেশ-বিদেশে একাধিক কনসার্টে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে।
এছাড়া ডিসেম্বর মাস থেকেই বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের সরাসরি অনুষ্ঠানে তাদের পরিবেশনা প্রচারিত হবে।
নতুন জেনারেশনকে উচ্চারণের গান পরিচিত করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নতুন কনটেন্ট তৈরি করা হবে।
বাংলাদেশি ব্যান্ড সংগীতে আবারও উচ্চারণের পূর্ণাঙ্গ প্রত্যাবর্তন দেখা যেতে পারে।
আইয়ুব বাচ্চুকে শ্রদ্ধা: ব্যান্ড ফেস্টের প্রকৃত নেপথ্য নায়ক
বাংলাদেশের ব্যান্ড ইতিহাসে আইয়ুব বাচ্চুর কর্ম ও অবদান এক অনন্য অধ্যায়।
তিনি ছিলেন ব্যান্ড ফেস্টের প্রথম স্বপ্নদ্রষ্টা, প্রথম উদ্যোক্তা।
ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা ও নিবেদন দিয়ে তিনি চ্যানেল আইকে এই আয়োজন শুরু করতে সাহায্য করেছিলেন।
এ কারণেই তার জীবদ্দশা থেকেই ব্যান্ড ফেস্ট ছিল একটি জনপ্রিয় বার্ষিক আয়োজন।
এবারের ফেস্টেও তার প্রতি বিশেষ সম্মান জানানো হয়।
স্টুডিও জুড়ে বাজে AB–এর গিটার সুর, স্ক্রিনে ভেসে ওঠে তার দৃশ্যাবলি, দর্শকদের চোখে ওঠে আবেগের ছোঁয়া।
এবার পাক্ষিক আনন্দ আলোও ব্যান্ড ফেস্ট উপলক্ষে একটি বিশেষ বুলেটিন প্রকাশ করেছে, যেখানে আইয়ুব বাচ্চু, আজম খান এবং বাংলাদেশি ব্যান্ড আন্দোলনের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে।
বাংলা ব্যান্ড সংগীত: ইতিহাস, সংগ্রাম এবং গৌরব
ফেস্ট উপলক্ষে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন—বাংলাদেশে ব্যান্ড সংগীত শুধু বিনোদন নয়, বরং স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রজন্মের স্বর, প্রতিবাদের ভাষা, স্বাধীন চিন্তার প্রকাশ।
আজম খান, ফিডব্যাক, মাইলস, এলআরবি, নগর বাউল—এই ধারার শিল্পীরা দেশকে দিয়েছেন নতুন সঙ্গীত পরিচয়।
ব্যান্ড ফেস্ট সেই ঐতিহ্যকে শুধু স্মরণ করে না, বরং নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে।
ব্যান্ড ফেস্ট ২০২৫–এ দর্শকদের সাড়া
স্টুডিওতে উপস্থিত দর্শকদের পাশাপাশি অনলাইনে প্রচুর দর্শক অনুষ্ঠানটি সরাসরি দেখেছেন।
সোশ্যাল মিডিয়ায় দর্শক প্রতিক্রিয়া দেখে বোঝা যায়, এবারের ব্যান্ড ফেস্ট গত কয়েক বছরের তুলনায় আরও বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দর্শকদের মন্তব্য—
- “এবার ব্যান্ড ফেস্ট যেন আগের সেই সোনালি দিনগুলো ফিরিয়ে এনেছে।”
- “উচ্চারণের প্রত্যাবর্তন আমার জীবনের সেরা মুহূর্ত।”
- “আইয়ুব বাচ্চুকে ছাড়া ব্যান্ড ফেস্ট ভাবা যায় না।”
- “বাংলাদেশি ব্যান্ড আবার জেগে উঠছে।”
ব্যান্ড ফেস্ট ২০২৫: নতুন দিগন্তের সূচনা
চ্যানেল আইয়ের এই আয়োজন শুধু একটি অনুষ্ঠানের নাম নয়, বরং বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীত শিল্পকে পুনর্জাগরণের পথ দেখাচ্ছে।
এবারের ফেস্টে নতুন ব্যান্ডের অংশগ্রহণ ও পুরোনো কিংবদন্তি ব্যান্ডের পুনরাগমন—অনুষ্ঠানটিকে করেছে আরও সমৃদ্ধ, আরও প্রাণবন্ত।
অনেকেই মনে করছেন, ব্যান্ড ফেস্ট ২০২৫–এই বছর ব্যান্ড সংগীত শিল্পে নতুন এক সোনালি অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
সারসংক্ষেপ
- ডিসেম্বরের প্রথম দিনে ব্যান্ড ফেস্ট ২০২৫ অনুষ্ঠিত
- অংশগ্রহণ করেছে ১২টি ব্যান্ড
- আজম খানের উচ্চারণের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে দর্শকদের উচ্ছ্বাস
- আইয়ুব বাচ্চুকে বিশেষভাবে স্মরণ
- উচ্চারণ ব্যান্ড আগামী বছর দেশ-বিদেশে ট্যুরে যাচ্ছে
- চার দশকের ব্যান্ড সংগীত ইতিহাস নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার অনবদ্য উদ্যোগ
- অনলাইন ও অফলাইনে দর্শকদের ব্যাপক সাড়া
MAH – 14083 I Signalbd.com



